না থাকবেই বা কেন, যুগযুগান্তরের সংস্কার কি যাবার?
ছেলেটা চলে যাবার পর অনামিকা টেবিলের ধারে এসে বসলেন। বেশ কিছুদিন থেকে একটা উপন্যাসের প্লট মনের মধ্যে আনাগোনা করছে, তার গোড়া বাধা স্বরূপ সেদিন পাতা দুই লিখে রেখেছিলেন, সেটাই উল্টে দেখতে ইচ্ছে হলো। আজ মনে হচ্ছে কোথাও যাবার নেই, লেখাটা খানিকটা এগিয়ে ফেলা যেতে পারে।
খাতাটা টেনে নিয়ে চোখ বুলালেন…- যে জীবনের কোথাও কোনো প্রত্যাশা নেই, নেই কোনো আলো, আশা, রং, সে জীবনটাকেও বাঁচিয়ে রাখার জন্যে কেন এই আপ্রাণ প্রয়াস? পৃথিবীতে আরো কিছুদিন টিকে থাকার জন্যে কেন এই ঝুলোঝুলি?…ডাক্তার চলে যাবার পর বিছানার ধারের জানলা দিয়ে পড়ন্ত বিকেলের আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রৌঢ় শিবেশ্বর খাস্তগীর একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেললেন, তবে কি মানুষের সব চেয়ে বড়ো প্রেমাস্পদ এই পৃথিবীটাই? সবখানের সব আশ্রয় ভেঙে গুড়ো হয়ে গেলেও, জীবনের সব আকর্ষণ ধূসর হয়ে গেলেও, এই পৃথিবীটাই তার অনন্ত আকর্ষণের পসরা সাজিয়ে নিয়ে বলে, কেউ না থাকুক, আমি তো আছি! আর তুমিও আছ। আমি আর তুমি এইটুকুই কি কম? এইটুকুই তো সব। তুমি আর আমির মধ্যেই তো সমস্ত সম্পূর্ণতা, সব কিছু স্বাদ।
হয়তো তাই। তা নইলে আমিই বা কেন এখনো ডাক্তার ডাকছি, ওষুধ খাচ্ছি, সাবধানতার সব বিধি পালন করছি? সে কি শুধু আমার অনেক পয়সা আছে বলে? এই অপরিমিত পয়সা থাকলে কি আমি বাঁচবার চেষ্টায়–
আর লেখা হয়নি। টেলিফোনটা ডেকে উঠলো। যেমন সব সময় ডাকে–চিন্তার গভীর থেকে চুলের মুঠি ধরে টেনে এনে খোলা উঠোনে আছাড় মারতে।
তবু খুব শান্ত গলায় প্রশ্ন করতে হয়, আপনি কে বলছেন? হ্যাঁ, আমি অনামিকা দেবী কথা বলছি। কী বললেন? নাম? মেয়ের? ইস! ছি ছি, একদম ভুলে গেছি। নানা কাজে এমন মুশকিল হয়– লজ্জায় কুণ্ঠায় যেন মরে যেতে হয়, আপনি যদি দয়া করে কাল সকালে একবার–কালই নামকরণ উৎসব? ও হো! তারিখটা ডায়েরিতে লিখে রাখতে বলেছিলেন? হা, সত্যি এখন সবই মনে পড়ছে। মানে লিখে রেখেওছি, খুলে দেখা হয়নি। আচ্ছা আপনি বরং আজই সন্ধ্যের দিকে আর একবার কষ্ট করে নয়তো আপনার ফোন নাম্বারটাই…বাড়ি থেকে বলছেন না? আচ্ছা তাহলে আপনিই–
টেলিফোনটা নামিয়ে রেখে একটা হতাশ নিঃশ্বাস ফেললেন। যেন প্রতিশ্রুতি দিয়ে মহাজনের ঋণশোধ করে উঠতে পারেননি। অন্ততঃ কণ্ঠে সেই কুণ্ঠা। না ফুটিয়ে উপায়ও নেই। সৌজন্যের উপরই তো জগৎ।
ভুলে সত্যিই গিয়েছিলেন, এখন মনে পড়লো, ভদ্রলোক তার নবজাতা কন্যার নামকরণের জন্য আবেদন জানিয়ে আবেগ-মুগ্ধ-কন্ঠে বলেছিলেন, আর সেই সঙ্গে আশীর্বাদ করবেন, যেন আপনার মতো হতে পারে।
এহেন কথা ভুলে গেলেন অনামিকা?
খারাপ, খুব খারাপ! অথচ সত্যিই লিখে রেখেছিলেন। ভাগ্যিস রেখেছিলেন। খুলে দেখলেন, আরো অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া রয়েছে। শুধু অদেখা ভদ্রলোকের মেয়ের নামকরণই নয়, পাড়ার ছেলেদের হাতে-লেখা পত্রিকার নামকরণ করে দিতে হবে!…তাছাড়া পাড়ার সরস্বতী পুজোর স্মারক পত্রিকার জন্য শুভেচ্ছা, সবুজ সমারোহ ক্লাবের রজত জয়ন্তী স্মারক পত্রিকার জন্য ছোট গল্প, ভারতীয় চর্মশিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্মীবৃন্দের রিক্রিয়েশান ক্লাবের বার্ষিক উৎসবের স্মারক পত্রিকার জন্য চর্মশিল্পের উপর যাহোক একটু লেখা, নিভাননী বালিকা বিদ্যালয়ের চল্লিশ বৎসর পূর্তি উপলক্ষে একটি সময়োপযোগী প্রবন্ধ …প্রধানা শিক্ষিকার চেহারাটি মনে পড়ে গেল অনামিকার, গোল গোল কালো-কালো চেহারা, কালো চোখ দুটিও পরিপাটি গোল, সেই চোখ দুটি বিস্ফারিত করে চাপা গলায় বলেছিলেন ভদ্রমহিলা, আপনি বলছেন ছেলেগুলোকে নিয়েই যতো গণ্ডগোল, মেয়ে-স্কুলে তবু শান্তি আছে? ভুল-ভুল অনামিকা দেবী, এটি আপনার সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। প্রাইমারি সেকশন বাদ দিলে, সাড়ে চারশো মেয়ে নিয়ে ঘর করছি, বলবো কি আপনাকে, যেন সাড়ে চারশোটি ফণা তোলা কেউটে! কথা বলতে যাও কি একেবারে ফোঁস! কীভাবে যে নিজের মানটুকু বাঁচিয়ে কোনোমতে স্কুল চালিয়ে চলেছি, তা আমিই জানি।…এর মধ্যে থেকেই আবার সবই করতে হচ্ছে। মেয়েদের আবার এই চল্লিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে কিছু ঘটা-পটা হোক। মানে নাচ গান অভিনয় কমিক, অথচ আজকাল মেয়ে-স্কুলে ফাংশান করা যে কি দারুণ প্রবলেম! মেয়েরা জানে সবই, বুঝেও বুঝবে না। গেলবারের, মানে এই গত পুজোর সময় মেয়েরা একটা সোস্যাল করলো, জানতে পেরে পাড়ার ছেলেদের সে কি হামলা! বলে কিনা আমাদের দেখতে দিতে হবে।…বুঝুন অবস্থা! ওরা তো আর দুষ্ট ছেলে নেই, পুরো গুণ্ডা হয়ে উঠেছে, বুঝিয়ে তো পারা যায় না। শেষে ওদের দলপতিকে আড়ালে ডেকে হাত জোড় করে বলতে হলো, বাবা, তোমাদের কথা রাখলে কি মেয়েদের গার্জেনরা আমাদের স্কুল আস্ত রাখবেন? হয়তো আইন-আদালত হবে, হয়তো এতোদিনের স্কুলটাই উঠে যাবে। এদিকে ভালো বলতে তো এই একটাই মেয়ে-স্কুল? তোমাদেরই বোনেরা ভাইঝি-ভাগ্নীরা পড়তে আসে..ইত্যাদি অনেক বলায় কী ভাগ্য যে বুঝলল। কথাও দিলো ঠিক আছে…কিন্তু বলুন, বারে বারে কি এ রিস্ক নেওয়া উচিত? মেয়েরা শুনবে না। আপনাকে বলবো কি, মনে হয় বেশীর ভাগ মেয়েই যেন চায় যে, বেশ হামলা-টামলা হোক, হৈচৈ কাণ্ড বাধুক একটা, ওই ৩ ছেলেগুলোর সঙ্গে মুখোমুখি একটা দহরম-মহরম হোক! এ কি সর্বনাশা বুদ্ধি বলুন? তাই বলছি, মেয়েদের যাতে একটা শুভবুদ্ধি জাগ্রত হয়, সেই মতো একটি সুন্দর করে লেখা প্রবন্ধ আমাদের সুভেনীরের জন্যে দিতে হবে আপনাকে।
