ছেলেটি তর্কের সুরে বলে, না দেখলে লেখা যায়?
কী আশ্চর্য! গল্প-উপন্যাস মানেই তো কাল্পনিক।
এটা বাজে কথা। সমস্ত ভালো ভালো লেখকদের শ্রেষ্ঠ চরিত্রগুলিই লোককে দেখে লেখা। শরৎচন্দ্র বিভূতিভূষণ তারাশঙ্কর বনফুল, দেখুন এদের আপনি যদি বলেন, কিছু না দেখে লিখেছেন–
ওকে দেখে মনে হলো যেন অনামিকা ওকে ঠকাতে চেষ্টা করছেন। অনামিকা হাসলেন।
কথাটা ঠিক তা নয়। বললেন অনামিকা, দেখতে তো হবেই। দেখার জগৎ থেকেই লেখার জগৎ। আমি শুধু এই কথাই বলছি-আমি অন্তত কোন বিশেষ একজনকে দেখে, ঠিক তাকে এঁকে ফেলতে পারি না। অথবা সেটা আমার হাতে আসেই না। অনেক দেখে দেখে একজনকে আঁকি, অনেকের কথা আহরণ করে একজনের মুখে কথা ফোটাই, আমার পদ্ধতি এই! তাই হয়তো অনেকেই ভেবে বসে, “আমায় নিয়ে লেখা।” তোমরাও খুঁজতে বসো–দেখি কাকে নিয়ে লেখা। অনামিকা একটু থামেন, তারপর বলেন, জানি না কোন একজন মানুষকে যথাযথ দেখে গল্প লেখা যায় কিনা? শ্রীকান্ত কি যথাযথ? কিন্তু সে যাক, অন্যের কথা আমি বলতে পারবো না, আমার কথাই আমি বলছি–আমি সবাইকে নিয়েই লিখি, অথবা কাউকে নিয়েই লিখি না।
ছেলেটা উত্তেজিত হয়।
ছেলেটা টেবিলে একটা ঘুষি মেরে বলে, তবে কি আপনি বলতে চান, ওই যে আপনার কী যেন বইটা–হ্যাঁ, একাকী বইটার নায়িকার মধ্যে আপনার নিজের জীবনের ছাপ আদৌ পড়েনি?
অনামিকা ঈষৎ চমকান, অবাক গলায় বলেন, একাকী? ও বইটার নায়িকা তো একজন গায়িকা!
তাতে কি? আপনি না হয় একজন লেখিকা! ওটুকু তো চাপা দেবেনই। তা ছাড়া সব মিলছে, সেখানেও নায়িকা আনম্যারেড, এখানেও আপনি
অনামিকা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান। মৃদু হেসে বলেন, তবে আর ভাবনা কি? আত্মজীবনী তো লিখেই ফেলেছি। ইচ্ছে হলে ওটাই তোমাদের কাগজে ছাপিয়ে দিতে পার।
তাই? মানে ওই ছাপা বইটা?
তাছাড়া আর উপায় কি? একটা লোকের তো একটাই জীবন। অতএব আত্মজীবনীও দু’দশটা হতে পারে না!
এটা আপনি রাগ করে বলছেন। নাছোড়বান্দা ছেলেটি ধৈর্যের সঙ্গে বলে, হতে পারে আপনার অজ্ঞাতসারেই ওই ছাপটা এসে পড়েছে। লেখকদের এমন হয়
হয় এমন? বলছো?
অনামিকা যেন কাঠগড়া থেকে নামার ভঙ্গীতে হাঁফ ফেলে বলেন, তাহলে তো বাচাই গেল!
আপনি ঠাট্টা করছেন?
আরে ঠাট্টা করবো কেন? স্বস্তি পেলাম, তাই। কিন্তু আর তো বসতে পারছি না, একটু কাজ আছে।
কিন্তু ওই ইঙ্গিতটুকুতেই কি কাজ হয়?
পাগল!
শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি না নিয়ে ছাড়বে নাকি সেই সম্পাদক প্রেরিত ছেলেটি?
শেষ পর্যন্ত রফা–কেন স্মৃতিকথা লিখলাম না—
লিখতে হয়েছিল সেটা অনামিকা দেবীকে। জ্যোতির্ময় স্বদেশ-এর সেই স্মৃতিচারণ সিরিজেই ঢুকিয়ে দিয়েছিল তারা লেখাটা।
কিন্তু লেখাটা কি খুব সহজ হয়েছিল অনামিকার কাছে? কেন লিখলাম না?
আশীজন নবীন এবং প্রবীন লেখক-লেখিকা যা করলেন, তা আমি কেন করলাম না, এটা লেখা খুব সোজা নয়।
কিন্তু অনামিকা কোন্ স্মৃতির সমুদ্রে ডুব দেবেন? কোন স্মৃতির সৌরভে ঘ্রাণ সেবেন?
অনামিকা কি তার সেই ঘষা পয়সার মতো শৈশবটাকে তুলে ধরে বলবেন, দেখো দেখো–কী অকিঞ্চিৎকর! এইজন্যেই লিখলাম না!
তা হয় না। তাই কেন লিখলাম না বলতে অনেকটাই লিখতে হয়।
অথচ সত্যিই বা কেন লিখলেন না?
লেখা কি যেতো না? বকুলের জীবনটাকেই কি গুছিয়েগাছিয়ে তুলে ধরা যেতো না?
নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের মতো সহসা প্রবল একটা কিছু ঘটে না যাক, কোথাও কি পাথরের ফাটল বেয়ে ঝর্ণার জল এসে আছড়ে পড়েনি?
পড়েছে বৈকি। উঠেছে তার কলধ্বনি।
হয়ত ওই থেকেই দিব্যি একখানা স্মৃতিচারণ হতে পারতো।
কিন্তু নিজের সম্পর্কে ভারী কুণ্ঠা অনামিকার! নিজের সম্পর্কে মূল্যবোধের বড়ই অভাব। একেবারে অন্তরের অন্তস্থলে সেই বকুল নামের তুচ্ছ মেয়েটাকে ছাড়া আর কাউকেই দেখতে পান না।
নিন্দা-খ্যাতি প্রশংসা-অপ্রশংসার মালায় মোড়া অনামিকা দেবী সেই বকুলটাকে আশ্রয় নিয়ে রেখেছেন মাত্র। আবৃত করে রেখেছেন তার তুচ্ছতাকে।
তাই অনুরোধ উপরোধের ছায়া দেখলেই ঠেকাতে বসেন।
কিন্তু কেন এই নুরোধ-উপবোধ?
কেন ওই আশীজনের পর আরও শীজনের জন্যে ছুটোছুটি?
কোথাও কোনোখানে কি শ্রদ্ধা আছে? আছে, আগ্রহ-ভালবাসা সমীহ?
যদি থাকে, তবে কেনই বা বার বার মনে হয়, ওই সিরিজ আর ফিচার, সাক্ষাৎকার আর সমাচার, স্বাক্ষরসংগ্রহ আর অভিমত-কী মূল্য এসবের? ব্যবসায়িক মূল্য ছাড়া?
এযুগে কোথায় সেই প্রতিভার প্রতি মোহ? জ্যেষ্ঠজনের প্রতি শ্রদ্ধা? পণ্ডিতজনের কথার প্রতি আস্থা?
এ যুগ আত্মপ্রেমী।
ওই যে রোগা-রোগা কালো-কালো ছেলেটা, যে নাকি নাছোড়বান্দার ভূমিকা নিয়ে এতোক্ষণ বকিয়ে গেল, সে কি সত্যিই এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে অনামিকা দেবী নামের লেখিকাটিকে বুঝতে চেষ্টা করেছিল? তার বক্তব্যের মধ্যেকার সুরটি শুনতে চেয়েছিল? অন্তত তাকিয়েছিল কৌতূহলের দৃষ্টিতে?
পাগল না ক্ষ্যাপা।
যা করতে এসেছি তা করে ছাড়বো, এ ছাড়া আর কোন মনোভাবই ছিল না ওর। আর ওদের ওই জ্যোতির্ময় স্বদেশ-এর পৃষ্ঠায় যাদের নাম সাজিয়ে রেখেছে আর রাখতে চাইছে, তাদেরই যে ধন্য করেছে, এমন একটি আত্মসন্তুষ্টি ছিল ওর মধ্যে। ছিল, আছে, থাকবে।
বিশেষ করে মহিলা লেখিকাঁদের ব্যাপারে জাতে তুলছি ভাবটি বিদ্যমান থাকে বৈকি।
