হঠাৎ ওর স্মৃতিচারণ শব্দটা গোচারণের মত লাগলো অনামিকার। হয়তো ওই ‘আশি’ শব্দটার প্রতিক্রিয়াতেই।
অনামিকার পুলকিত হবারই কথা।
বাংলা দেশে যে এতোগুলি শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক আছেন এ খবরটি পুলকেরই বৈকি। তবে বোঝা গেল না হলেন কিনা পুলকিত। বরং যেন বিপন্নভাবেই বললেন, তবে আর কি, হয়েই তো গেছে অনেক
তা বললে তো চলবে না, আপনারটা চাই।
কিন্তু আমি ত মোটেই নিজেকে আপনাদের ওই শ্রেষ্ঠ-টেষ্ঠ ভাবি না।
আপনি না ভাবুন দেশ ভাবে। ছেলেটির কণ্ঠ উদ্দীপ্ত, আর দেশ জানতে চায় কেমন করে বিকশিত হলো এই প্রতিভা। শৈশব বাল্য যৌবন সব কিছুর মধ্যে দিয়ে কী ভাবে
কিন্তু আমি তো কিছুই দেখতে পাই না, অনামিকার গলায় হতাশা, রেলগাড়িতে চড়ে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ফেলে-আসা-পথটা দেখলে যেমন একজোড়া রেললাইন ছাড়া আর কিছুই বিশেষ চোখে পড়ে না, আমারও প্রায় তাই। একটা বাঁধা লাইনের ওপর দিয়ে চলে আসা। একদা জন্মেছি, একদিন না একদিন মরবোই নিশ্চিত, এই দুটো জংশন স্টেশনের মাঝখানেই ওই পথটি। মাঝখানের স্টেশনে স্টেশনে কখনো কখনো থেমেছি, জিবরাচ্ছি, কখনো ছুটছি।
আপনাদের সঙ্গে কথায় কে পারবে? কথাতেই তো মাত করছেন। কিন্তু আমি ওসব কথায় ভুলছি না। আমি এডিটরকে কথা দিয়ে এসেছি–বিজ্ঞাপন দিন আপনি, আমি ওঁর সঙ্গে সব ব্যবস্থা ঠিক করে ফেলছি।
তুমি তো আমার ঠিকানাই জানতে না, প্রত্যক্ষ দেখোওনি কখনো, এরকম কথা দিলে যে?
ছেলেটি একটি অলৌকিক হাসি হাসলো। তারপর বললো, নিজের ওপর আস্থা থাকা দরকার। যাক, কবে দিচ্ছেন বলুন?
কবে কি? আদৌ তো দিচ্ছি না।
সে বললে ছাড়ছে কে? গোড়ায় অমন সব ইয়ে–মানে সকলেই ঠিক সেই কথাই বলেন,
আমার স্মৃতির মধ্যে আর লেখবার মতো কি আছে? সাধারণ ঘরের ছেলে ইত্যাদি প্রভৃতি যতো ধানাইপানাই আর কি। তারপর? দেখছেন তো এক-একখানি? সকলের মধ্যেই কোনো একদিন-না-একদিন “নিঝরের স্বপ্নভঙ্গ”ঘটেছে, তারই ইতিহাস
আমার বাপু ওসব কিছুই ঘটেনি-টটেনি।
তাই কি হয়? ও তো হতেই হবে। আপনার বিনয় খুব বেশি, তাই চাপছেন। কিন্তু আমাদের আপনি হঠাতে পারবেন না। লেখাটা ধরে ফেলুন।
কী মুশকিল! সত্যিই বলছি, লেখবার মতো কিছুই নেই। মধ্যবিত্ত বাঙালীর ঘরের মেয়ে, সাত-আটটি ভাইবোনের মধ্যে একজন, খেতে-পরতে পেয়েছি, যেখানে জন্মেছি সেখানেই আছি, আশা করছি সেখানেই মরবো, ব্যস এই তো। এর মধ্যে লেখবার কী আছে?
বাঃ, হয়ে গেল ব্যস? মাঝখানের এই বিপুল সাহিত্যকৃতি?
দেখো সেটাও একটা কী বলবো ঘটনাচক্র মাত্র। একদা শখ হলো, লিখবো! লিখলাম, ছাপা হলো। আর তখন দিনকাল ভালো ছিলো, মেয়েদের লেখা-টেখা সম্পাদকরা ক্ষমাঘেন্না করে ছাপতেনও, আবার চাইতেনও। সেই চাওয়ার সূত্রেই আবার নবীন উৎসাহে লেখা, আবার হয়ে গেলো ছাপা, আবার–মানে আর কি, যা বললাম, ঘটনাচক্রের পুনরাবৃত্তি থেকেই তোমাদের গিয়ে ওই বিপুল কৃতি না কি বললে-সেটাই ঘটে গেছে।
তার মানে বলতে চান কোনো প্রেরণা না পেয়েই আপনি–
বলতে চাই কি, বলছিই তো। পাঠক-পাঠিকা এবং সম্পাদক আর প্রকাশক, এরাই মিলেমিশে আমাকে লেখিকা করে তুলেছেন। এছাড়া আর তো কই
ঠিক আছে, ওটা যখন আপনি এড়িয়ে যেতেই চাইছেন, তখন আপনার জীবনের বিশেষ বিশেষ কিছু স্মৃতির কথাই লিখুন। জীবন-সংগ্রামের কঠিন অভিজ্ঞতা, অথবা।
কিন্তু গোড়াতেই যে বললাম “বিশেষ” বলে কিছুই নেই। জীবন-সংগ্রামই বা কোথা? জীবনে কোনদিন পার্টস-হোটলে খাইনি, কোনদিন গামছা ফেরি করে বেড়াইনি, কোনোদিন বাড়িওয়ালার তাড়নায় ফুটপাথে এসে দাঁড়াইনি, রাজনীতি করিনি, জেলে যাইনি, এমন কি গ্রামবাংলার অফুরন্ত প্রাণপ্রাচুর্যের মধ্যে হুটোপাটি করে বেড়াবার সুযোগও ঘটেনি। শহর কলকাতার চার দেওয়ালের মধ্যে জীবন কাটছে, বিশেষ স্মৃতি কোথায়?
ছেলেটা তবুও দমে না। বলে ওঠে, নেই, সৃষ্টি করুন! কলমের যাদুতে কী না হয়!
বানিয়ে বানিয়ে লিখবো? হেসে ফেলেন অনামিকা।
ছেলেটা হাসে না বরং মুখটা গোমড়াই করে বলে, বানিয়ে কেন, আপন অনুভূতির রঙে রাঙিয়ে তুচ্ছ ঘটনাকেই সেই রঙ্গিন আলোয় আলোকিত করে–মানে সবাই যে-কর্মটি করেছেন। ছেলেটা হঠাৎ মুখটা একটু বাকায়, রাংকে সোনা বললেই সোনা! যে যা লিখেছেন, তার কতটুকু সত্যি আর কতটুকু কথার খেলা, সে তো আর আমাদের জানতে বাকি নেই—
অনামিকা হঠাৎ একটু শক্ত গলায় বলে ওঠেন, তাই যখন নেই, তবে আর ওতে দরকার কি?
বাঃ, আমি কি বলছি সকলেই বানিয়ে লিখছেন? বলছি-আপনাদের কলমের গুণে সাধারণ ঘটনাও অসাধারণ হয়ে ওঠে, সাধারণ জীবনও সাধারণোত্তর মনে হয়।
আমার লেখার মধ্যে মেন গুণ থাকবে এ বিশ্বাস আমার নেই বাপু! অনুভূতির রঙ্গে রাঙানো-টাঙানো–নাঃ, ও আমার দ্বারা হবে না।
তার মানে দেবেন না, তাই বলুন?
দেব না বলছি না তো, বলছি পেরে উঠবো না।
তার মানেই তাই। কিন্তু আমাকে আপনি ফেরাতে পারবেন না। আমার তাহলে মুখ থাকবে না। যাহোক কিছু না নিয়ে হাড়িবো না। আপনার শ্রেষ্ঠ বইগুলির নায়ক নায়িকার চরিত্র কাকে দেখে লেখা সেটাই অন্ততঃ লিখুন, ওই ‘আত্মকথা’র সিরিজে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে।
বলার মধ্যে বেশ একটু আত্মস্থ ভাব ফুটে ওঠে ওর।
অনামিকা আবার হেসে ফেলেন, কিন্তু কাউকে দেখে লিখেছি, এটাই বা বললো কে?
