সকলের উপর কথা, কেউ কোনদিন নমিতার কর্তৃত্বের ওপর হস্তক্ষেপ করেছে? বড়োজোর অনিলবাবুর মা কোনোদিন বলেছেন, রোজদিনই ঘটার রান্নাবান্না! পরের পয়সায় হাতধন্যি! একটু বিবেচনা করে কাজ করতে হয় নাতবো!
কোনদিন হয়তো অনিলবাবুর স্ত্রী বলেছেন, এই নমিতাই আমাদের পরকাল খেলো! এরপর আর রাধুনীর রান্না কারুর রুচবেই না! অবিশ্যি রাঁধুনীকে তো আমার হাততোলায় থেকে কাজ করতে হয়, নিজের হাতের বাহাদুরি দেখাবার স্কোপও পায় না।
নমিতা সে স্কোপ পায়। অতএব নমিতা পারে ভাল রান্না রেঁধে হাতের মহিমা দেখাতে। অর্থাৎ নমিতা রান্নাঘর ভাড়ারঘরের সর্বময়ী কর্ত্রী! যদিও আপন স্বভাবের নম্রতায় সে দু’বেলাই জিজ্ঞেস করতো, মামীমা, বলুন কী রান্না হবে?
কিন্তু মামীমা সে-ভার নিতেন না, উদার মহিমায় বলে দিতেন, তোমার যা ইচ্ছে করো বাছা, কী রান্না হবে ভাবতে গেলেই আমার গায়ে জ্বর আসে।
তবে?
এই অখণ্ড অধিকারের মর্যাদার মধ্যেও জীবনের মানে খুঁজে পেল না নমিতা? আর সেই খুঁজে না পাওয়ার খানিকটা ভার আবার চাপিয়ে গেল অনামিকার মাথায়?
অনামিকাই কি পাচ্ছেন সে মানে? মানে–তার নিজের জীবনের মানে?
অতীতের স্মৃতি হাতড়াতে তো জীবন বলতে একটা ভাঙাচোরা অসমান, রং-জৌলুসহীন বস্তুই চোখে পড়ে, তাই বর্তমানের রীতি অনুযায়ী তার কাছে যখন সাক্ষাৎকারীরা এসে সাক্ষাৎকারটা লিপিবদ্ধ করতে চায়, তখন অতীতের স্মৃতিকথা বলতে গিয়ে কোথাও কোনো সম্পদ সম্বল খুঁজে পান না অনামিকা।
অথচ অন্য সকলেরই আছে কিছু-না কিছু। মানে কবি-সাহিত্যিকদের, লেখক-লেখিকাদের। তাঁরা ওদের প্রশ্নে তাই, স্মৃতিচারণের মধ্যে নিমগ্ন হয়ে যান, অথবা স্মৃতিকথার খাতার সিঁড়ি ধরে নেমে যান অনেক গভীরে। যেখানে হাত ডোবালেই মুঠোয় উঠে আসে মুঠোভর্তি মণিমুক্তো।
সেই টলটলে নিটোল মুক্তোগুলি দিয়ে গাঁথা যায় স্মৃতিকথার মালা।
অনামিকার গোপন ভাঁড়ারে মণিমুক্তার বালাই নেই।
তাই কোনো কোনো পত্রিকার বিশেষ ফিচারের তালিকায় যখন অনামিকা দেবীর পালা আসে, তখন প্রশ্নের উত্তর দিতে রীতিমতো বিপদেই পড়ে যান অনামিকা।
হেসে বলেন, আমার মতন জীবন তো বাংলা দেশের হাজার হাজার মেয়ের। তার মধ্যে কেউ সংসার করে, কেউ চাকরি করে, কেউ গান গায়, আমি গল্প লিখি এই পর্যন্ত, এ ছাড়া তোকই বাড়িতে কিছু দেখতে পাচ্ছি না?
ওরা বলে আপনার বড়ো বেশী বিনয়। লেখা মানেই তো তার অন্তরালে অনেক কিছু। কোথা থেকে পেলেন প্রেরণা, উদ্বুদ্ধ হলেন কোন্ যন্ত্রণায়? কার কার প্রভাব পড়েছে আপনার ওপর–?ইত্যাদি ইত্যাদি।
উত্তর দিতে বেশ মুশকিলে পড়তে হয়। এসব কি বলবার কথা না বলার মতো কথা? তবু বকিয়ে মারে।
এই তো সেদিন একটা রোগা নিরীহ চেহারার ছেলে কোন্ এক পত্রিকার তরফ থেকে এনে প্রায় হিমসিম খাইয়ে দিয়েছিল অনামিকা দেবীকে।
বায়না অবশ্য সেই একই, ভাষাও তাই, আমাদের কাগজে তাবৎ সাহিত্যিকের স্মৃতিকথা ছাপা হয়ে গিয়েছে, অথচ আপনারটা এখনো পাইনি।
এটা যে ছেদো কথা তা বুঝতে দেরি হয় না কারোরই। অনামিকার মুখে আসছিল পাওনি নাওনি। কিন্তু মুখে আসা কথাকে মুখের মধ্যে আটকে ফেলতে না পারলে আর সভ্যতা কিসের?
তাই শুধু বললেন, ‘ও।’
ছেলেটি উদাত্ত গলায় বললো, ঠিকানাটা জানা ছিল না কিনা। উঃ, আপনার ঠিকানা যোগাড় করতে কি কম বেগ পেয়েছি! বহু কষ্টে
এবারও অনামিকা বলতে পারতেন, আশ্চর্য তো! অথছ বাজারে কম করেও আমার শ’খানেক বই চালু আছে, অতএব তাদের প্রকাশকও আছে, এবং প্রকাশকের ঘরে অবশ্যই আমার ঠিকানা আছে। তাছাড়া বাজার-প্রচলিত বহু পত্রিকাতেই আমার কলমের আনাগোনা আছে। সেখানেও একটু খোঁজ করলেই ঠিকানাটা হাতে এসে যেতো৷ বেশী খাটতেও হতো না, যেহেতু “টেলিফোন” নামক একটা যন্ত্র মানুষের অনেক খাটুনি বাঁচাবার জন্যে সদাপ্রস্তুত।
কিন্তু বলে লাভ কি?
বেচারী সাজিয়ে-গুছিয়ে একটা জুৎসই কৈফিয়ত খাড়া করে আবেগের মাথায় কথা বলতে এসেছে, ওই আবেগের ওপর বরফজল ঢেলে দিয়ে কি হবে!
তার থেকে খুব আক্ষেপের সুরে বলা ভালো, ইস, তাই তো! তাহলে তো খুব কষ্ট হয়েছে, তোমার।
এবার ওপক্ষের ভদ্রতার পালা, না না, কষ্ট আর কী। শেষ পর্যন্ত যখন দেখা হলো, তখন আবার কষ্টের কথা ওঠে না। এখন বলুন কোন সংখ্যা থেকে শুরু করবেন? সামনের সংখ্যা থেকেই? বিজ্ঞাপন দিয়ে দিচ্ছি–
আরে আরে, কী মুশকিল! কথাটাই শুনি ভাল করে!
বা, বললাম তো আমাদের “জ্যোতির্ময় স্বদেশ’-এর স্মৃতিচারণ সিরিজে
ওটা একটা সিরিজ বুঝি?
হ্যাঁ তাই তো দেখেননি? এ তো প্রায় দু’আড়াই বছর ধরে চলছে। দেশের যত শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের একধার থেকে–মানে একটির পর একটিকে ধরে ধরে–
কথাটা ঠিকভাবে শেষ করতে না পেরেই বোধ হয় ছেলেটি হঠাৎ চুপ করে গেল।
অনামিকার মনে হলো ও বোধ হয় বলতে যাচ্ছিল এক ধার থেকে কোতল করেছি, অথবা একটির পর একটিকে ধরে ধরে হাড়িকাঠে ফেলেছি আর কোপ দিয়েছি। বললো না শুধু সে ভদ্রতার দায়ে। যে দায়ে মুখের আগায় এসে যাওয়া কথাকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আটকে ফেলতে হয়।
তবু অসমাপ্ত কথারই উত্তর দেন অনামিকা, যতো শ্রেষ্ঠদের? কিন্তু তার মধ্যে আমাকে কেন?
এ কী বলছেন! আপনাকে না হলে তো সিরিজ সম্পূর্ণ হয় না! নবীন প্রবীণ মিলিয়ে প্রায় আশিজনের স্মৃতিচারণ হয়ে গেছে–
