ওঃ! তাহলে এতদিন এতকাল গলায় বেঁধে বইলে কেন শুনি? মৃণাল চিৎকার করে বলেন, কেউ যদি নও তুমি, তবে এযাবৎ ভাত-কাপড় দিয়ে পুষলে নে? আনতে গিয়েছিলে কেন?
চেঁচামেচি করে লাভ কী মৃণাল, ওই কেন-গুলোর উত্তর যদিও নিজেই ভালোই জান। নীপু রীতা খোকা বীরা সবাই তখন ছোট, তোমার শরীর খারাপ, মা পড়লেন অসুখে, সে সময় বিজুর সন্ন্যাসী হয়ে চলে যাওয়া, আমাদের কাছে ভগবানের আশীর্বাদের মতই লাগেনি কি?
মৃণালিনী চাপা তীব্র গলায় বলেন, ওঃ! তার মানে উপকার শুধু আমাদেরই হয়েছিল, ওর কিছু না?
তা কেন! উপকার পরস্পরেরই হয়েছিল, কিন্তু উনি যদি এখন এই জীবনে ক্লান্ত হয়ে ওঠেন, বলার কী আছে বল?
চমৎকার! কিছুই নেই? বয়সের মেয়ে, তেজ করে একা চলে গিয়ে কোথায় থাকবে, কী করবে, সেটা দেখবার দায়িত্ব নেই তোমার? তুমি ওর একটা গুরুজন নয়?
অনিলবাবু মৃদু হেসে বলেন, গুরুজনের ততোক্ষণই গুরুদায়িত্ব মৃণাল, লঘুজন যতক্ষণ গুরু-লঘু জ্ঞানটুকু রাখে। তারা যদি সে জ্ঞানটার উপদেশ মানতে না চায়, তখন আর কোন্ দায়িত্ব? নাবালিকা তো নয়?
আমার মনে হচ্ছে ভিজে বেড়ালের খোলসের মধ্যে থেকে তলে তলে কারুর সঙ্গে প্রেম ট্রেম চালিয়ে
আঃ মৃণাল থামো।
বেশ থামছি। তবে এটা জেনো, আমাকে থামিয়ে দিলেও পাড়ার লোককে থামাতে পারবে না।
এর সঙ্গে পাড়ার লোকের সম্পর্ক কী?
আছে বৈকি সম্পর্ক। পাড়ার লোকের সঙ্গে সব কিছুই সম্পর্ক থাকে। তারা ভাবতে বসবে না, হঠাৎ এমন চলে যাওয়া, ভেতরে নিশ্চয় কিছু ব্যাপার আছে।
ভাবতে বসলে নাচার!
তোমার আর কি! “নাচার” বললেই হয়ে গেল! দুষলে লোকে আমাকেই দূষবে। বলবে, মামীশাশুড়ী মাগী দুর্ব্যবহার করি তাড়িয়েছে।
বললে গায়ে ফোস্কা পড়ে না।
যাদের গায়ে কচ্ছপের খোলস, তাদের পড়ে না, মানুষের চামড়া থাকলে পড়ে।
তাহলে ফোস্কার জ্বালা সইতেই হবে।
হবে! তবু তুমি ওকে বারণ করবে না? একটা সৎ-পরামর্শও দেব না?
ঠিক আছে, দেব। বলেছিলেন অনিলবাবু। এবং নমিতাকে ডেকে বলেছিলেন, আমি বলছিলাম বৌমা, ফট করে চলে না গিয়ে, বরং বিজুকে একটা চিঠি লিখে বিস্তারিত জানিয়ে–
বিস্তারিত লেখবার তো কিছু নেই মামাবাবু।
না, মানে এই তুমি যে আর এখানে থাকতে ইচ্ছুক নও, সেটা জানতে পারলে হয়তো
কিছুই করবে না। নমিতা কষ্টে চোখের জল চেপে বলে, করবার ইচ্ছে থাকলে চিঠি পর্যন্ত লিখতে বারণ করতেন না।
অনিলবাবু মাথা নীচু করেই বলেছিলেন, তা বটে। কিন্তু তোমার এখানে কী কী অসুবিধে হচ্ছে, সেটা যদি একটু বলতে, চেষ্টা করে দেখতাম, তার কিছু প্রতিকার–
এসময় নমিতার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল।
নমিতাও মাথা নীচু করে বলেছিল, অসুবিধে কিছু নেই মামাবাবু, এখানে যে সুবিধেয় ছিলাম, তা নিজের বাড়িতেও থাকিনি কোনোদিন। কিন্তু, একটু থেমে বলেছিল, আসলে এখন শুধু এই প্রশ্নটাই স্থির হতে দিচ্ছে না, এই জীবনটার কোনো অর্থ আছে কিনা!
মামাশ্বশুরের সঙ্গে না-হা ছাড়া কোনো কথা কখনো বলেনি নমিতা, তাই বলে ফেলে যেন থরথর করছিল, তবু বলেছিল।
অনিলবাবু একটু হেসেছিলেন। বলেছিলেন, সে প্রশ্ন করতে বসলে, আমাদের কারো জীবনেরই কি কোনো অর্থ খুঁজে পাওয়া যাবে বৌমা? কিন্তু থাক, আমি তোমায় বাধা দেব না, দ্যাখো যদি অপর কোথাও শান্তি পাও!
অনিলের মা বেজার গলায় বলেছিলেন, নাতবৌ তোর সঙ্গে অতো কি কথা কইছিল রে?
অতো আর কি! এই যাওয়ার কথা!
নিলো তোর পরামর্শ? কু-মতলব ছাড়লো?
আমি তো কোনো পরামর্শ দিতে যাইনি মা, আমরা যে তাকে যেতে বাধা দেব না, সেই কথাটাই জানিয়ে দিলাম।
বা বা! ভ্যালাবে মোর বুদ্ধিমত্ত ছেলে! এই অসময়ে দেশে লোকজনের আকাল, অমন একটা করিৎকর্মা মেয়েকে এক কথায় ছেড়ে দেয় মানুষে?
আমরা ওঁকে ঝি রাখিনি মা! বলে চলে এসেছিলেন অনিলবাবু।
আর তখনই হঠাৎ ওঁর মনে হয়েছিল, কেন নমিতা তার জীবনের অর্থ খুঁজে পাচ্ছে না।
বাড়ির প্রতিটি ছেলে মেয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ-রাগ করে করে নমিতাকে বিধেছিল, আর তাতেই হয়তো নমিতার মনের মধ্যে যেটুকু দ্বিধা আসছিল, সেটুকু মুছে যাচ্ছিল।
শুধু নীপু বলেছিল, যাক, বৌদি তাহলে সত্যিই চলে যাবে? আমাদের স্রেফ মৃণালিনী দেবীর হাতে ফেলে দিয়ে?
তখনই চোখে জল এসেছিল নমিতার। তবু চলে গিয়েছিল নমিতা।
কে জানে জীবনের কোন অর্থ খুঁজে পেতে।
অথচ কত নিশ্চিন্তেই থাকতে পেতো নমিতা, যদি সে জীবনের মানে খুজতে না বেরতো।
জলপাইগুড়ি শহরে অনিলৰাবুর যথেষ্ট মান-সম্মান আছে, সেই বাড়িরই একজন হয়েই তো ছিল নমিতা। কোথাও কারো নেমন্তন্ন হলে অনিলবাবুর স্ত্রী-কন্যার সঙ্গে সমপর্যায়ভূক্ত হয়েই তো যেতে পেতো, দৃষ্টিকটু হবার ভয়ে নিজের বা মেয়ের শাড়ি-গহনা দিয়েই সাজিয়ে নিয়ে যেতেন তাকে মামীশাশুড়ী। আর পাঁচজনের কাছে, এটি আমাদের একটি বৌমা বলে পরিচয়ও দিতেন।
এইখানেই কি অনেকটা দাম পাওয়া গেল না। অনেকটা মান?
তাছাড়া নিজের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নমিতার খাওয়াদাওয়ারও তারতম্য করেননি কোনোদিন ভদ্রমহিলা, যদি কিছু তারতম্য ঘটে থাকে তো সে নমিতা নিজেই ঘটিয়েছে। পোড়াটা, কাচা, ভাঙাটা সে নিজের ভাগেই রেখেছে বরাবর। তা সে যাক, অন্যদিকে তাকিয়ে দেখো, নিরাশ্রয় হয়ে যাওয়া নমিতা কতোবড়া নির্ভরতার একটি আশ্রয় পেয়েছিল, চিরদিনই বজায় থাকতো এ আশ্রয়। তাছাড়া এ বাড়িতে কেউ কোনদিন ‘দুর ছাই’ করেছে তাকে, বলুক দিকি কেউ?
