মোহনের দ্রুত কথার ঠাসবুনুনির মাঝখানেও আস্তে একটা পাতলা ছুরি বসায় পারুল, বয়েসটা অনেক বেশী হলেই মানুষ চেনবার ক্ষমতা হয়, এটা আবার তোকে কে বললো মোহন? তা তোর তো অনেকটা বয়েস হয়েছে, আমাকে দেখছিসও জন্মাবধি, কই, চিনে উঠতে পারলি কই?
১৯. নমিতা যে এভাবে দড়ি-ছেঁড়া হয়ে
নমিতা যে এভাবে দড়ি-ছেঁড়া হয়ে চলে যেতে পারে একথা জলপাইগুড়ির ওরা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। যে নমিতার মুখ দিয়ে কথা বেরোতো না, সেহঠাৎ কিনা স্পষ্ট গলায় বলে বসলো আমি চলে যাবো! বলে বসলো এই দাসত্ব-বন্ধন থেকে মুক্তি চাই!
আশ্রয়দাতাদের কাছে এ কথাটা লজ্জারও বটে দুঃখেরও বটে। সর্বোপরি অপমানেরও।
মামীশাশুড়ী ফেটে পড়লেন, মামাশ্বশুর পাথর, আর দিদিশাশুড়ী গাল পাড়তে শুরু করলেন।
ও হতভাগী নেমকহারামের বেটী, যে মামাশ্বশুর অসময়ে তোকে মাথায় করে এনে আশ্রয় দিয়েছিল, তার মুখের ওপর এতো বড়ো কথা? সে তোকে দানবৃত্তি করাতে এনেছিল? ভেতর ভেতরে এতো প্যাঁচ তোর? বলি যাবি কোন চুলোয় যাবার যদি জায়গা আছে তো এসেছিলি কেন কেতেথ্য হয়ে পড়েই বা ছিলি কেন এতোকাল?
অনিলবাবু ক্লান্ত গলায় বললেন, আঃ মা, থামো! বোমার যদি হঠাৎ এখানে অসুবিধে বোধ হয়ে থাকে, আর তার প্রতিকারের উপায় আমাদের হাতে না থাকে, বাধা দেওয়ার কথা ওঠে না।
মামীশাশুড়ী নমিতার ওই দৃঢ় ঘোষণার পর থেকে সমগ্র সংগারের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলেন, আর তার ভিতরটা ডুকরে ডুকরে উঠছিল, এই সমস্ত কাজ তার ঘাড়েই পড়তে বসলো। নমিতা চলে যাবে মানেই তাকেই বিছানা ছেড়ে উঠত হবে ভোর পাঁচটার সময়, উঠেই গরম জল বসাতে হবে বাড়িসুদ্ধ সকলের মুখ ধোবার জন্যে। হা, হাত-মুখ ধোওয়ার জলও গরম না করে উপায় নেই এ সময়টা, কারণ কালটা শীতল। কেমন বুঝে বুঝে মোক্ষম সময়টিতে চালটি চাললো! কিছুদিন থেকেই বেশ বে-ভাব, দেখা যাচ্ছিল, যেন এই সংসারে কাজ করে সেবা-যত্ন করে তেমন কৃতাৰ্থমন্য ভাব আর নেই, যেন না করলেই নয় তাই! তবু করছিল, সেইগুলি তাঁর ওপর এসে পড়লো, অথচ তার শরীব ভাল নয়–বিশেষ করে শীতকালে মোটেই ভাল থাকে না, বেলা আটটার আগে বিনা ছেড়ে উঠলে সয় না। ওই বেড-টি-টুকু গলায় ঢেলে একটু বল পান। আর এরপর? সেই বেড-টি তাকেই বানাতে হবে, আর সবাইয়ের মুখে মুখে ধরতে হবে। হতে পারে যাদের হাতগুলি মশারির মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসবে গরম পেয়ালাটি ধরতে, তারা তারই স্বামী-পুত্র-কন্যা, কিন্তু শরীরের কাছে তো কিছু না।
কিন্তু শুধুই তো ওইখানেই কর্তব্য শেষ নয়, তারপর জলখাবার বানাতে হবে, তারপর আবার চা বানাতে হবে, সাজিয়ে সাজিয়ে টেবিলে ধরতে হবে, তারপর কুটনো, তারপর রান্না, তারপর পরিবেশন, তারপর দেখতে বসা কার কী দরকার : ঠিক স্কুলে যাবার সময়ই জামার বোতাম ছিঁড়ে গেল, কার বইয়ের ব্যাগের স্ট্র্যাপ জং ধরা, কার প্যান্ট ময়লা, কার গেঞ্জি শুকোয়নি, আরো কত কী!… সেই কুরুক্ষেত্র কাণ্ডের পর চান করে এসে আবার শাশুড়ীর নিরামিষ দিকের রান্নাবান্না। বুড়ী গরমকালে যদিও বা এক আধদিন নিজে দুটো ফুটিয়ে নিতে পারেন, শীতকালে কদাপি না। অথচ এই সময়ই যতো খাবার ঘটা–কশি, মটরশুটি, নতুন আলু, পালংশাক, মুলো, বেগুন-আনাজের সমারোহ। বুড়ীর হাতে-পায়ে শক্তি নেই, হজমশক্তিটি বেশ আছে। নিরামিষ ঘরে রোতই ঘটা চলে। তাছাড়া আবার কারও প্রখর দৃষ্টি, মার সম্যক যত্ন হচ্ছে কিনা।
অতএব শাশুড়ীর রাজভোগটি সাজিয়ে দিয়ে আবার পড়তে হবে বিকেলের জলখাবার নিয়ে। নিত্যনতুন খাবার-দাবার করে করে নমিতা দেবী তো মুখগুলি আর মেজাজগুলি লম্বা করে দিয়েছেন। করবেন না কেন, পরের পয়সা, পরের ভাড়ার–দরাজ হাতে খরচ করে করে সবাইয়ের সুয়ো হওয়া! এখন তার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে সরে পড়ার তাল! সাদামাটা জলখাবার, রুটি-মাখন কি লুচি পরোটা আর রুচবে ছেলেমেয়েদের? কে সামলাবে সেই হাপা?
শুধুই কি জলখাবার? রাতে?
একখানি একখানি করে গরম রুটি সেঁকে পাতে দেবার ক্ষমতা তার আছে? না পারলেই বাবু-বিবিদের রুচবে না হয়তো। নমিতা করত এসব। তবুও তো তম্বি-গাম্বির কামাই ছিল না। এসব বদ অভ্যেস নমিতাই করিয়েছে। তার মানে নীরবে নিঃশব্দে মামাশ্বশুরের ভাঁড়ার ফর্সা করেছে, আর মামীশাশুড়ীর ভবিষ্যৎ ফর্সা করেছে! এসব পরিকল্পিত শত্রুতা ছাড়া আর কি?
নমিতাকে দেখে তাই বিষ উঠছে তার।
আর হঠাৎ কেমন ভয়-ভাঙা হয়ে বসে আছে দেখো! বসে আছে শোবার ঘরের ভেতর, তাড়াহুড়ো করে বিকেলের জলখাবারের দিকে এগিয়ে আসছে না!
কেন? কিসের জন্যে?
অসময়ে যে আশ্রয় দেয়, তার বুঝি আশ্রিতের ওপর কোনো জোর থাকে না? যাক দিকি, কেমন যায়?
স্বামীর ওই গা-ছাড়া কথায় তাই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন ভদ্রমহিলা, রুক্ষ গলায় বলে উঠলেন, কেন? বাধা দেওয়ার কথা ওঠে না কেন? হঠাৎ ‘যাবো’ বললেই যাওয়া হবে? হোটেলে বাস করছিস নাকি? তাই এক কথায় আমার এখানে পোষাচ্ছে না বলে চলে যাবো? তুমি বলে দাও, এ সময় তোমার যাওয়া হতে পারে না।
অনিলবাবু মৃদু মানুষ, মৃদু গলাতেই বলেন, অকারণ মাথা গরম কোরো না মৃণাল, বাধা দেবার আমি কে?
তুমি কেউ না?
জোর করবার উপযুক্ত কেউ না!
