যখন ইচ্ছে হবে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলি–এ তো বড়ো মুশকিল, দেশসুদ্ধ সবাই তোমরা পত্রিকা প্রকাশ করবে? আর আমরা হবো সেই যূপকাষ্ঠের বলি?
তখন খুব মধুর করে হেসে বলতে হবে, কি করবো, বল বাপু? সময় তো মোটে নেই, কতো কাগজ বেরোচ্ছে প্রতিদিন!
সমুদ্রে বালির বাঁধ-এর মতো সেই কথার বাঁধ ভেসে যাবে ওদের কথার তোড়ে বলে?
এইগুলোই সব থেকে বড়ো দরকারী?
এই দরকারগুলোর স্তূপের ওপরে সেজদি বসে বসে মিটি মিটি হাসবে, আর তারপর মুখ ফিরিয়ে নেবে, আর তারও পরে আস্তে আস্তে বুড়ো হয়ে যাবে, বদলে যাবে! হয়তো সেই চেনা সেদিকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না কোনদিন, হয়তো মরেই যাবে কোনোদিন, আর বকুল বসে বসে টেবিলে জমানো স্তূপ সাফ করবে! কোনোদিনই সাফ হবে না, আবার জমে উঠবে জেনেও।
এর খাজ থেকে একবার পালিয়ে যাওয়া যায় না?
হঠাৎ গিয়ে বলে ওঠা যায় না, দেখ তত চেয়ে আমারে তুমি চিনিতে পারে কিনা?
অফিসের কাজেই পশ্চিম থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসতে হয়েছিল মোহনকে, তবু মোহন এমনভাবে এসে দাঁড়ালো, দেখে মনে হতে পারে শুধু মাকে ওই প্রশ্নটাই করতে এসেছিল মোহন, এই মাত্র যে প্রশ্নের উত্তরটা দিলো পারুল হেসে উঠে, ওমা, তা তাড়িয়ে দেব নাকি? এসেছে পিসির কাছে দুদশদিন থাকবে বলে-
মোহন রাগটা লুকোবার চেষ্টা না করেই বলে, একা থাকলে দু’দশদিন কেন, দু’দশ মাসই থাকতে পারতো, আপত্তির কিছুই ছিল না, কিন্তু আর একটা যা শুনলাম
কী শুনলি আর একটা? প্রশ্ন করলো পারুল।
মোহন মনে মনে ঠোঁট কামড়ালো।
মনে মনেই চেঁচিয়ে উঠলো, মা, তোমার এই ন্যাকামিটি আর গেল না কোনোদিন? সেই ছেলেবেলা থেকে এই বুড়ো-বেলা পর্যন্ত দেখছি–তুমি ঠিক শরৎবাবুর নভেলের নায়িকার প্যাটার্ন নিয়ে কথা বলবে! আমরা অতশত বুঝি না। গেরস্ত লোক গেরস্ত ধরনে কথা কইবো, উত্তর পাবো, মিটে গেল ল্যাঠা, তা নয়।…কেন বুঝতে পারছে না তুমি, কী শুনছি আর একটা? ঠিকই বুঝতে পারছো, তবু আমার মুখ দিয়েই বলিয়ে নিতে চাও। সাধে কি আর ছেলের বৌরা এত বিমুখ, আমি তোমার নিজের ছেলে, তবু যেন আমাকে অপদস্থ করার মধ্যেই তোমার আনন্দ।
বলছিল মনের মুখ দিয়ে চেঁচিয়ে, কিন্তু বাইরে সেও পারুলের ছেলে। আত্মস্থ অচঞ্চল।
যা শুনলাম, সেটা তুমি বুঝতে পারনি তা নয়। আমি বলতে চাইছি–একটা কুলিকামিন ধরনের বাজে লোককে নিয়ে নাকি সে এসে উঠেছে তোমার কাছে। এবং সেটা নাকি রোগগ্রস্ত?
রোগগ্রস্ত? না তো, পারুল বিস্ময়ের গলায় বলে, তোমাকে যে খবর দিয়েছে, সে তো দেখছি ভালো করে খবর-টবর না নিয়েই
আমায় কেউ কোনো খবর-বৈর দেয়নি! বলে বসে মোহন।
পারুলের কি মনে পড়ে না, মোহন রেলের রাস্তায় অনেকটা দূর থেকে এসেছে, ওর তেষ্টা পেয়ে থাকতে পারে, খিদে পেয়ে থাকতে পারে। আর তার পর মনে পড়ে না মোহন তার নিজের পেটের ছেলে! পারুল মোহনের মা!
মনে পড়েই না হয়তো।
যাদের মন অন্য এক ধাতু দিয়ে গড়া, তাদের হয়তো ওই সব ছোটখাটো কথাগুলো মনে পড়ে না। তারা শুধু খাঁটি বাস্তবটা দেখতে পায়।
সেই বাস্তব দৃষ্টিতে পারুল মোহনকে পারুলের ‘অপরাধের বিচারক’ ছাড়া আর কোন দৃষ্টিতেই দেখতে পাচ্ছে না, অতএব পারুল নিজ পক্ষে উত্তর মজুত রাখতেই তৎপর থাকছে। আর এও স্থিরনিশ্চিত যে, অনধিকারে যদি কেউ বিচারক সেজে জেরা করতে আসে, পারুল তাকে রেহাই-টেহাই দেবে না। ছেলে বলেও না।
তাই পারুল ছেলেটার ক্লান্ত মুখটার দিকে না তাকিয়েই খুব হালকা একটু হাসির সঙ্গে বলে, কেউ খবর-টবর দেয়নি? ওমা, তাই নাকি? তুই তাহলে বুঝি আজকাল হাতটাত গুনতে শিখেছিস? কার বই পড়ছিস? কিরোর?
কথাটা বলে ফেলে অপ্রতিভ হয়ে গিয়েছিল মোহন একথা সত্যি, তাই বলে এইভাবে অপদস্থ করা? মোহন গম্ভীর হয়। মোহনের ক্লিষ্ট মুখ আরক্ত হয়ে ওঠে, তীব্রতা পরিহার করে গম্ভীর সুরেই বলে সে, আমি বেশীক্ষণ সময় হাতে নিয়ে আসিনি মা! সোজা আর সহজ ভাবে কথা বললে তাড়াতাড়ি হয়ে যায়।
ওঃ তাই বুঝি!
পারুল চট করে নিজেকেও প্রায় সোজা দাঁড় করিয়ে বলে, তবে তুই-ই চটপট করে বল তোর কী জানবার আছে? কী উদ্দেশ্যে হঠাৎ এসেছিস? এক নম্বর দুনম্বর করে বল–উত্তরটা চটপট হয়ে যাবে।
উঃ অসহ্য! বললো মোহনের মনের মুখ।
তবু বাইরের মুখটা সহ্যের ভানে রইলো, আমি জানতে চাই তোমার ওই ভাইঝির সঙ্গে আর একটা লোক আছে কিনা?
আছে। যান্ত্রিক উত্তর পারুলের। মোহনের মনের মুখ আবার চেঁচাতে শুরু করে, ওঃ, সাধে কি আর ভাবি বাবা সাতসকালে মরে বেঁচেছেন!…
লোকটা কে, তার সন্ধান নিয়েছিলে?
দরকার বোধ করিনি।
ওঃ দরকার বোধ করনি? তোমার সাতজন্মে না দেখা এক ভাইঝি এসে তোমার বাড়িতে উঠলো একটা বাজে লোক নিয়ে, তুমি তার পরিচয়টা জানবারও দরকার বোধ করলে না?
আমার ভাইঝি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে, এটাই যথেষ্ট পরিচয় বলে মনে করেছি—
চমৎকার? তোমার ভাইঝি যদি একটা রাস্তার কুলি-মজুরকে নিয়ে আসে—
সেটাও মেনে নিতে হবে। সেই কুলিটাকেই যখন সে ভাবী স্বামী বলে ঠিক করে রেখেছে।
অতএব তাকে বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে জামাই আদরে রাখতে আপত্তি নেই, কেমন? তোমার ওই ভাইঝির বয়েস নিশ্চয়ই এমন বেশী হয়নি যে, মানুষ চিনতে পেরে উঠবে। লোকটা জেলপালানো আসামী কিনা–
