অথচ মাঝে মাঝে সন্দেহ হচ্ছে, কি জানি হয়তো এসেছে, হয়তো গ্রাহ্য করে অথবা মান খুইয়ে বলতে আসছে না আমায়!..
এই, ‘মান’ জিনিসটা কী কঠিন পাথরের মতোই না ঘিরে রেখেছে আমাদের। ওর থেকে বেরিয়ে পড়বার দরজা আমাদের নেই। অথচ আশ্চর্য, কী তুচ্ছ কারণেই না জিনিসটা খোওয়া যায়।
ও যেন একটা ভারী দামী রত্ন, তাই খোওয়া যাবার ভয়ে সদা সন্ত্রস্ত হয়ে থাকি। ও যেন আমার প্রভু, তাই ওর দাসত্ব করি।
আচ্ছা ওকে আমার অধীন করে রাখা যায় না? আমিই প্রভুত্ব করলাম ওর ওপর? অথবা যদি মনে করি কিছুতেই খোওয়া যেতে দেব না ওকে, দেখি কার সাধ্য নেয়? সযত্নে পাহারা দিয়ে নয়, অযত্নে রেখে দিয়ে যদি রক্ষা করি ওকে?
নাঃ, যতো সব এলোমেলো চিন্তা। আসলে আমি আমার সেই মেজদির ঘুমের জন্যে অপেক্ষা করছি। বয়েস হয়েছে, রেলগাড়িতে এসেছেন, সারাদিন কথা বলেছেন, আর কতোক্ষণ পারবেন ঘুমের সঙ্গে লড়াই করতে? নিশ্চয় এতোক্ষণ ঘুমিয়ে পড়েছেন।
অলকা আর অপূর্বর সঙ্গে এই কঘণ্টাতেই মেজদির যেন বেশ হৃদ্যতা হয়ে গেছে। একত্রিত পরিবারে এই কৌতুক নাটকের অভিনয়টি সর্বদাই হতে দেখা যায়। বহিরাগত অতিথিরা অর্থাৎ কিনা এসে পড়া.আত্মীয়েরা হঠাৎ কেমন করেই যেন ওই একের মধ্যেই একাধিকের সন্ধান পেয়ে যান। আর কেমন করেই যেন কোনো একটি বিশেষ দলভুক্ত হয়ে যান। অবশ্য বাইরে ঠাটটা সর্বজীবে সমভাবে থাকে, কিন্তু আস্তে আস্তে দলভেদটা প্রকট হয়ে ওঠে, এবং নোনাধরা যে দেওয়ালটা তবুও ছাদটাকে ধরে রাখার কাজে সাহায্য করছিল, সেটা ধসে পড়ে ছাদটাকে নামিয়ে দেয়।
হতো অবশ্যই এগুলো, কালক্রমে হতো, আত্মীয় অতিথি সেটুকু ত্বরাণ্বিত করে দেন। হ্যাঁ, এ নাটক হামেশাই হচ্ছে ঘরে ঘরে!
কিন্তু দুই দলকেই বা ওঁরা চট করে চিনে ফেলেন কী করে?
সেটাই আশ্চর্য রহস্য! অবশ্য সেই খুঁটিটাই ধরা নিয়ম। নৌকো বাঁধতে হলে বড়ো গাছেই বাধতে হয়। আর কে না জানে শিষ্টের থেকে দুষ্টই শক্তিতে বড়ো।
মেজদি কেমন করেই যেন ওই বড়ো গাছটাকে চিনে ফেললেন, আর নৌকোটি বাঁধলেন। কিন্তু উনি তো থাকতে আসেননি।
আসেননি সত্যি, তবে এখন যে ওঁর একটা অবিবাহিতা মেয়ে আছে, সেটাকে কলকাতার আবহাওয়ায় রাখতে চান, সেটা বোঝা গেছে ওঁর তখনকার কথায়।
যখন খেতে বলা হয়েছিল, এবং অনামিকা আটপৌরে শাড়িটা আটপৌরে ধরনে জড়িয়ে নিয়ে বকুল হয়ে গিয়ে বসেছিলেন সে আসরে, তখন মেজদি আমিষের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে বড় ভাজের পাশে খেতে বসে ইচ্ছেটা ব্যক্ত করেছিলেন, কলকাতার হালচাল তো দেখলে গা জ্বলে যায়, তবু এখনকার ছেলেদের তো ওই পছন্দ, মেয়েটাকে এখেনে চালান করে দেবো, বলবো, নে কতো হালচাল শিখতে পারিস শেখ।
বলা নিষ্প্রয়োজন, শ্ৰোত্রীবর্গ কেউই এ ইচ্ছেয় উৎসাহ প্রকাশ করেনি, এবং মেজদিও সঙ্গে সঙ্গেই সেটা বুঝে ফেলে বলেছিলেন, অবিশ্যি কন্যে আমার থাকতে চাইবে কিনা সন্দেহ। “মা” ভিন্ন আর কিছুতে দরকার নেই তার। কোলের তো!…তবে আমিই বলি, পরের ঘরে যেতে হবে না? তা হারামজাদি হেসেই মরে, বলে, “যাবোই না”।
বকুলকে মাথা নিচু করে যেতেই হয় সেখানে। এদিকে ছোড়দার বউও থাকেন, থাকে বড়দার বিয়ে-টিয়ে হয়ে যাওয়া সংসারী মেয়ে হেনা। অপূর্বর নিজের বোন সে, কিন্তু বাপের বাড়ি এলে এদিকেই খায়। বলে, বাবা, অলকার ওখানে কে খাবে? বাসন-মাজা ঝিতে রাধে, চাকর বাসি কাপড়ে জল-বাটনা করে!
বকুল হাসে মনে মনে। ভাবে, তোমার মহা বিশ্বে কিছু হারায় নাকো কভু– না, কোন কালেই হারিয়ে যায়।
হেনা যখনই আসে বেশ কিছুদিন থাকে, কারণ ওর স্বামী অফিসের কাজে ট্যুরে যায়, আর সেটাই ওর পিত্রালেয় আসার সময়। এসেই বলে, চলে এলাম! বরবিহন শ্বশুরবাড়ি-ছ্যাঁ, যেন নুনবিহীন পান্তা!
হেনার ছেলে-মেয়ে নেই, তাই হেনার স্বাধীনতাটা এত বেশী। চন্দ্র-সূর্যের গতির নিয়মেই হেনা তার নিজের ভাই-বৌয়ের থেকে খুড়ো-খুড়ীকেই ভজে বেশী। মা? তিনি তো এখন নখদন্তবিহীন, তাকে বড়জোর একটু করুণা করা চলে। তার কাছে তো আশ্রয় নেই।
বড়দার আরও মেয়ে-টেয়ে আছে। তারা বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে আর আসে না। যেমন আসা ছেড়ে দিয়েছিল চাপা আর চন্দন, সুবর্ণলতা মারা গেলে। বলেছিল, আর কোথায় যাবো?
কিন্তু পারুল?
ভাবনাগুলো যেন পারার মতো, কিছুতেই হাতে ধরে রাখা যায় না, গড়িয়ে পড়ে যায়, যেখানে-সেখানে ছিটকে পড়ে, শুধু যেখানেই পড়ুক ঝকঝকে চোখে তাকায়।
পারুলের কথা মনে হতেই পারুল যেন সামনে দাঁড়িয়ে হেসে উঠলো।
যেন বললো, কই রে বকুল, তোর সময় আর তাহলে হলো না? অথচ বলেছিলি-যাবো সেজদি তোর কাছে! বকুলকে আস্ত করে খুঁজে দেখবো তোর সঙ্গে একসঙ্গে। আমার কাছে কেবলই ভাঙাচোরা টুকরো।
বলেছিল বকুল। কিন্তু সেই আস্তটা খুঁজে দেখতে যাবার সময় সত্যিই হয়ে উঠলো না আজ পর্যন্ত।
কেন?
খাতাপত্তরের জঞ্জাল সরিয়ে তুলতে পারি না বলে? পাহাড়ের ওপর আবার পাহাড় জমে ওঠে বলে? আর সেইগুলোর গতি করবো বলে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে বসামাত্র ফাংশানবাজেরা বাজপাখির মতো এসে ছোঁ মেরে নিয়ে যায় বলে?… তার মধ্যিখান থেকেও ফাঁক বার করে নেবার চেষ্টার সময় দর্শনার্থী আর বিনামূল্যে লেখা প্রার্থীর ভিড় এসে জোটে বলে?
