আগে ওই বাড়ি রাত বারোটা অবধি গমগম করতো, গ্রামোফোনের গান শোনা যেতো অনেক রাত অবধি, আলো জ্বলতো ঘরে ঘরে।
এখন? ওই অন্ধকারই তার উত্তর দিচ্ছে। তবে? বিধাতার প্লটে নতুনত্বের নামও নেই। আলো জ্বালা আর আলো নিভানো এই ওঁর প্লট।…
আমি এ বাড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখিনি কতদিন!
তাকিয়ে থাকতে থাকতে যেন হঠাৎ অবাক হয়ে গেলেন অনামিকা। কবে এতো জরাজীর্ণ হয়ে গেল বাড়িটা? হয়ে গেল এমন মলিন বিবর্ণ?
একদিনে হয়নি। আস্তে আস্তেই হয়েছে।
তার মানে দিনের পর দিন, কতো কতেদিন–আর আমি তাকিয়ে দেখিনি, তার মানে—নির্মল নামের একটা অনুভূতিও আস্তে আস্তে ওইরকম বিবর্ণ জরাজীর্ণই হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তবু
এই শিরশিরে বাতাসে রাত্রির আকাশের নিচে চিরপরিচিত অথচ অপরিচিত জায়গায় দাঁড়িয়ে ওই বিবর্ণ জানলাটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অনুভূতিটা আবার যেন আলোয় ভরে গেল…সেই আলোটা ওই জানলায় গিয়ে পড়লো যেন। দেখা গেল খোলা জানলায় ফ্রেমে আঁটা একটা আলোর ছবি।
ঘরের মধ্যে থেকে গ্রামোফোনে গান ভেসে আসছে!…দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ওপারে–
ধরা-ছোঁয়া নেই, তবু যেন কোথাও আছে বক্তব্যের আভাস। যারা লাজুক, যারা ভীরু–তারা পরের কথার মধ্যেই নিজের কথা মিশিয়ে দিয়ে নিবেদন করে। জানে যে ধরবার সে-ই ধরবে, যে ছোঁয়ার সে-ই ছোঁবে, আর কারো সাধ্য নেই ধরতে ছুঁতে।
দেবতারে যাহা দিতে পারি, দিই তাই প্রিয়জনে–, তাই ‘আমার সুরগুলি পায় চরণ, আমি পাই না তোমারে’।
আজকাল আর কেউ অমন বোকার মতো আর বেচারীর মতো ভালবাসে না!
এ যুগ ওই মৃদুতাকে-ওই চারুতাকে ভালবাসাই বলবে না। দেখলে ঠোঁট বাঁকাবে, রাবিশ বলবে, অথবা জোলো, ভাবালুতা বলে হেসে উড়িয়ে দেবে। এ যুগ জানে ভালোবাসা একটা ভোগ্যবস্তু, তাকে লুটে নিতে হয়, ছিঁড়ে আনতে হয়, দখল করতে হয়
হয়তো এরাই ঠিক জেনেছে। অথবা এরাই কিছু জানেনি, সত্যিকারের জানাটা আজও অপেক্ষা করছে কোনো এক ভবিষ্যৎ যুগের আশায়। যদিও শম্পারা ভেবে আত্মপ্রসাদ অনুভব করছে, আমরাই ঠিক জেনেছি।
তবু সেটুকুও তো জুটছে ওদের ভাগ্যে! ওই আত্মপ্রসাদ! ওরা তো ভাবছে, আমরা নিলাম, আমরা পেলাম! সে যুগের ভাগ্যে সেটুকুও জোটেনি।
অথচ সে যুগেও ভাবত-ভালবাসলাম! ভাবতো এর নামই ভালবাসা!..শম্পারা– আশ্চর্য, শম্পা আমাকেও একটা চিঠি দিল না! যদিও আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিলাম, হে ঈশ্বর, আমার অহঙ্কার খর্ব হোক, ওর মা-বাপের কাছেই আগে চিঠি আসুক। তবু যেন কোথায় একটা শূন্যতাবোধ সব সময় সব কিছুতে নিরানন্দ করে রেখেছে।
মনে মনে নিশ্চিত ভেবেছিলাম, ও আমাকে অন্তত জানাবে।
শম্পা যেন নিজের জীবনটাকে বাজি ধরে বাপের সঙ্গে খেলতে বসেছে। শম্পা তেমনি লড়ুইয়ে মেয়ে। কে জানে এ খেলায় কে জিতবে? শম্পা না শম্পার বাবা? বাবার জেতাটা তো পরম দুঃখের। অথচ বাবার হারও দুঃখের।
.
এ বাড়িতে আরো একটি মেয়ে আছে, তাকে নিয়ে তার মা আপন সম্পত্তি ভেবে খেলতে বসেছে। সেটা আরো দুঃখের, বরং বা বলা যায় ভয়াবহও।
ওর মা এই পরিবেশ থেকে–তার নিজের ধারণা অনুযায়ী উঁচুতে উঠতে চায়। অনেক উঁচুতে। যে উঁচুর নাগাল পেতে হলে খুব বড় কিছু একটা বাজি ধরে জুয়ায় বসতে হয়।
‘জীবন’ জিনিসটাই সব চেয়ে বড়ো, আর সব চেয়ে হাতের মুঠোর জিনিস।
কিন্তু ওই হতভাগা মেয়েটার যে নিজের জীবনটা এখন আর চড়া দামে বিকোবে না, তাই দামী বস্তুটা নিয়েছে মুঠোয় চেপে। মেয়েটার বোঝবার ক্ষমতা নেই ওকে নিয়ে কী করা হচ্ছে, ওকে কতোখানি ভাঙানো হচ্ছে।
তা যাদের বোঝার ক্ষমতা আছে তারাই কি কিছু প্রতিকার করতে পারছে? পারে কী?
আশ্চর্য, আমাদের ক্ষমতা কতো সীমিত।
আরো একবার নিজের ক্ষমতার পরিসর মেপে দেখে যেন লজ্জায় মরে গেলেন অনামিকা।
কী অক্ষম আমি।
আমার চোখের সামনে একটা নির্বোধ মেয়ে আর একটা বোধহীন মেয়েকে হাত ধরে কাদায় পিছল গভীর জলের ঘাটে নামতে যাচ্ছে, আমি তাকিয়ে দেখছি। খুব দূরে বসেও দেখছি না, বরং খুব কাছেই গাছের ছায়ায় বসে আছি।
আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবো ওরা পিছলোবে, ওরা ডুবে যাবে।
ওইটাই ওদের নিশ্চিত পরিণতি জেনেও আমি হাঁ হাঁ করে চেঁচিয়ে উঠছি না, ছুটে গিয়ে ওদের হাত চেপে ধরে টেনে আনার চেষ্টা করছি না, আমি শুধু ভয়ানক একটা স্বস্তি বোধ করছি, ভয়ানক একটা নিরুপায়তার যন্ত্রণা অনুভব করছি।
কারণ আমি ধরেই নিয়েছি আমার ভূমিকা দর্শকের।
ধরে নিয়েছি ওরা আমার কথা শুনবে না, আমার নিষেধ-বাণী শুনবে না। তবে কেন মিথ্যে অপমানিত হতে যাওয়া ভেবে কথাটি কইছি না। চেষ্টা করে না দেখেই সেই কল্পিত অপমানটার ভয়ে উদাস দৃষ্টি মেলে বসে বসে ওদের ডুবতে যাওয়া দেখছি।
আমাদের অক্ষমতা হচ্ছে আমাদের অহমিকা। আমাদের নিরুপায় হচ্ছে আমাদের একটা অর্থহীন আত্মসম্মানবোধ। তাই আপন সন্তানকেও হয়তো ভুল পথ থেকে নিবৃত্ত করতে হাত বাড়াই না। অনিষ্টের পথ থেকে টেনে আনতে ছুটি না। এই ভেবে নিথর হয়ে বসে থাকি, যদি আমার কথা না শোনে!
সেই না শোনা মানেই তো খর্ব হবে আমার অহমিকা, ঘা পড়বে অহঙ্কারে।
আমার এই আমিটাকে কী ভালই বাসি আমরা।
কই, আমি কি একদিনও ছোড়দার ঘরে গিয়ে বসে পড়ে প্রশ্ন করতে যাচ্ছি, ছোড়দা, কোনো চিঠি এলো?
