কিন্তু কে কবে এসেছে নিঃশ্বাস নিতে? কে কবে আসে? নূতন নূতন বেলায় বকুলের তো আসতে পা ওঠেইনি। মনে হয়েছে মা বুঝি কোথায় বসে করুণ চোখে তাকিয়ে বলবেন, সেই হলো, শুধু আমারই ভোগে হলো না! তোরা বেশ– হ্যাঁ, এই ধরনের অনুভূতিই তখন দরজার চৌকাঠের কাছে এলেই বকুলকে হঠাৎ দাঁড় করিয়ে দিতো। অথচ তখন বকুলের মাঝে মাঝে দেয়াল ফেঁড়ে নিঃশ্বাস নেবার দরকার ছিল।
দরকার ছিল আপন চিত্তের, দরকার ছিল একটা লাজুক মানুষের আবেদনের। সুযোগ পেলেই যে বলতে, অমন চমৎকার অলিন্দ হলো তোমাদের, একটু দাঁড়াতে পারো না?
তবু পারতো না বকুল।
দরজাটা খুললেই আকাশের তারার দিকে চোখ পড়ে যেতো। কেমন একটা অপরাধ-বোধ এসে যেতো।
তারপর?
তারপর তো বকুল অনামিকা হয়ে গেল। অনামিকার আর বাতাসের ওই একমুঠো দাক্ষিণ্য নেবার অবকাশ রইল কই?
কিন্তু অবকাশ কারই বা আছে এ বাড়িতে? দরকারই বা কই? ছুটতে ছুটতে নামা ওঠা, এই তো! জানে সিঁড়ির দরকার ওইটুকুই।
হয়তো এমনিই হয়। বাতাসের যার বড়ো প্রয়োজন সে পায় না, যে সেটা অনায়াসে পায় সে তার প্রয়োজন বোধ করে না। তবু আজ সাময়িক একটা কারণ প্রয়োজন বোধ করলেন অনামিকা আর যেন কৃতার্থ হয়ে গেলেন।
ভাবতে লাগলেন, নমিতা যদি আমার গল্পের নায়িকা হতো, কোন্ পরিণতি দিতাম আমি ওকে?
নিশ্চয়ই ওকে সন্ন্যাসী সাজিয়ে দেবতাত্মা হিমালয়ের শান্তিময় কোলে বসিয়ে নিশ্চিন্তের নিঃশ্বাস ফেলতাম না!…তাহলে আবার কি ওকে সংসার-আশ্রয়ের নিশ্চিন্ত ছায়ায় ফিরিয়ে দিতাম? সেই উত্তরবঙ্গের একটি সমৃদ্ধ পরিবারের মধ্যে?
না না, ছি!
তবে?
তবে কি নিতান্তই বাজারচলতি সমাধানে ওকে নার্স করে ছেড়ে দিতাম? আর একদিন ওর সেই মিথ্যা সন্ন্যাসী স্বামীটাকে ব্যাধিগ্রস্ত করে ওর করতলে সমর্পণ করতাম?
দূর দূর! তবে কি ওকে ডানা ভেঙে স্রেফ ফেলেই দিতাম পথে-প্রান্তরে?
একটু চুপ করে ভাবলেন, তারপর প্রায় নিজের মনকেই বললেন, হয়তো গল্পের নমিতাকে শেষ পর্যন্ত তাই-ই করতাম। হয়তো বা তার মধ্যেই কিছু নতুনত্ব আনবার চেষ্টা করতাম।
কিন্তু ওই চোখে-দেখা-সত্যি-মেয়েটার জন্যে আমি সে পরিণতি ভাবতেই পারছি না। ওর সেই স্বামীটাকে জব্দ করার জন্যেও না–তাকে মুখের মত জবাব দেবার জন্যেও না। আচ্ছা প্রগতিশীল মন কাকে বলে? সে মন কি নিতান্ত প্রিয়জনের জন্যে, নিকটজনের জন্যে তেমন দুঃসাহসিক প্রগতির পথ দেখাতে পারে? যে পথে অকল্যাণ, যে পথে গ্লানি?
তেমন প্রগতিশীল হওয়া আমার কর্ম নয়, ভাবলেন অনামিকা। তবে কী হবে ওর। মানে–কী করবে ও? ওর মধ্যে এখন একটা সর্বনাশা আগুন জ্বলছে, মনে হচ্ছে সে আগুন ওকে ছাড়া আর কাকে দগ্ধ করবে?
তারপর খুব হালকা এবং নেহাৎ সংসারী একটা কথা মনে এলো, এ সংসারটা যদি আমার হতো, হয়তো ওকে কিছুদিন আমার কাছে থাকতে বলতে পারতাম। তা আমিই তো বলতে গেলে আশ্রিত। নেহাৎ বাবার উইলে কী একটা আছে তাই–
তারপর মনে মনেই হেসে উঠলেন, তা তাতেই বা কি লাভ হতো নমিতার? সেই তো পরিচয় হতে পরাশ্রিত! আর ও নির্ঘাত ওর নিজস্ব স্বভাবে আমার মনোরঞ্জন করতে বসতো!.না, ওটা সমাধানের কোনো পথই নয়। ওর সত্যিকার দরকার ভালবাসার। করুণার নয়, দয়ার নয়, মমতার নয়, শুধু গৌরবময় ভালবাসার। এছাড়া আর বাঁচার উপায় নেই ওর। কিন্তু সে-বস্তু কে এনে ওর হাতে তুলে দেবে?
একমাত্র সুপথ হতে পারে, যদি ওর স্বামী মিথ্যা সন্ন্যাসের খোলস খুলে ফেলে ওর কাছে এসে দাঁড়ায়–
ভাবতে গিয়ে মনটা কেন কে জানে কেমন বিরূপ হয়ে গেল। মনে হলো, ভারী জোলো আর বিবর্ণ একটা ভাবনা ভাবছি। নাঃ, সত্যি বিধাতা হবাঁর সাধ্য দ্বিতীয় বিধাতার নেই।
কিন্তু বিধাতারই বা প্লটের বাহাদুরি কোথায়?
নতুনত্বের নামও তো দেখি না। সবই তো অমনি জোলো-জোলো।…
পাশের বাড়িটার দিকে তাকালেন, বাড়িটা এখন এই দশটা সাড়ে-দশটা রাত্রেই গভীর অন্ধকারে আচ্ছন্ন।..ওরই কোণের একটা ঘরে দীনহীন একটু গৃহসজ্জার মধ্যে নির্মলের বৌ হয়তো ঘুমে নিমগ্ন হয়ে পড়ে আছে, হয়তো বা অনিদ্রার শিকার হয়ে পড়ে পড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। ওকে দেখলে এখন আর মনেও হয় না একদা ও পরমা সুন্দরী ছিল।…
বৌদিদের আলাপ-আলোচনার মাঝে মাঝে কানে আসে ওর ছেলের বৌটি নাকি মেয়ে সুবিধের নয়, কেমন করে যেন ওকে কোণঠাসা করে ফেলে নিজে সর্বগ্রাসী হয়ে বসেছে… বাড়িতে আর কেই বা আছে? নির্মলের জেঠি একটা ভাইপোকে পুষেছিলেন, ইদানীং সেই ই নাকি বাড়ির অর্ধাংশ দখল করে আছে। আর তাদের সঙ্গেই নাকি নির্মলের ওই ছেলের বৌয়ের খুব হৃদ্যতা। কী পুরনো প্লট!
