কিন্তু কেউ কি পারে সেটা?
কোনো কবি, কোনো সাহিত্যিক? কোনো সমাজসেবী?
সামগ্রিকভাবে কিছু করবার ক্ষমতা এদের নেই।
এবার ভেবেছি কোনো খবর না দিয়ে সোজা চলে যাবে। দেখি কেমন করে তাড়িয়ে দেয়।
অনামিকা চিন্তিত হন।
বলেন, সেটা কী ঠিক হবে? বলছো তো আশ্রম, সেখানে নিশ্চয়ই অন্য সাধুটাধু আছেন, তারা যদি
নমিতা প্রায় ছিটকে উঠে বলে, আপনার কাছে আমি নতুন কিছু শুনতে এসেছিলাম। অথচ আপনি আমার সব আত্মীয়দের মতোই কথা বলছেন।
লজ্জিত হন বৈকি অনামিকা।
কিন্তু কী নতুন কথা বলবেন তিনি এই হঠাৎ পাগলা-হয়ে-যাওয়া মেয়েটাকে? পৃথিবীটাকে তো তিনি ওর মতো অতো কম দিন দেখছেন না?
আস্তে অপরাধীর গলায় বলেন, আমিও তোমার আত্মীয় নমিতা। তাই তোমাকে নতুন কথা হলে বিভ্রান্ত করতে পারবো না। তবে সত্যিই যদি তুমি যাও, নিশ্চয়ই তোমার সঙ্গে কোনো ছেলে-টেলেকে নিতে হবে। অনেক তো খরচা হবে–কিছু যদি রাগ না করো তো বলি
নমিতা থামিয়ে দেয়।
নমিতা এবার নম্র গলায় বলে, আপনার ভালবাসা মনে থাকবে। কিন্তু খুব দরকার পড়লেও টাকার সাহায্য আমি আপনার কাছে নেব না। আমার গায়ে তো এখনো সামান্য সোনা-টোনা আছে।
কিন্তু নমিতা, অনামিকা থামলেন।
এখনই ওকে হতাশার কথা শোনানো উচিত হবে? অথচ নিশ্চিত বুঝতে পারছেন, ফিরে নমিতাকে আসতেই হবে।
সাবধানে বলেন, কিন্তু নমিতা, ধরো যদি তোমার সেখানে ভাল না লাগে, ধরো যদি ঠিকমতো সুবিধে না হয়–
বলুন না, ধরো যদি তাড়িয়ে দেয়–হঠাৎ বেখাপ্পা ভাবে হেসে ওঠে নমিতা। বলে, তাহলে তখন আবার আপনার কাছে আসবো। শুনবো জীবনকে আর কোন্ দিক থেকে গড়া যায় যা আমার সাধ্যের মধ্যে।
ছোট চাকরটা অভ্যাসমতো একসময় এক কাপ চা ও দুটো সন্দেশ রেখে গিয়েছিল, নমিতা তাতে হাতও দেয়নি। অনামিকা কয়েকবারই উসখুস করেছেন, এখন বললেন, চা-টা যে ঠাণ্ডা হয়ে গেল নমিতা!
নমিতা অদ্ভুত একটু হেসে বললো, তাই দেখছি। ঠিক আমার জীবনটার মতো, তাই না? ভরা ছিল, গরম ছিল, কেউ খেলো না। এখন কি আর-পেয়ালাটা হঠাৎ তুলে নিলো,
ঠাণ্ডা চা-টা ঢক্ করে এক চুমুকে খেয়ে নিয়ে বললো, তবু খেয়েই ফেললাম, নষ্ট হওয়ার থেকে ভাল হলো, তাই না?
অনামিকা অবাক হলেন। এ ধরনের কথা ওর মুখে যেন অপ্রত্যাশিত। অনামিকা চিন্তিত হলেন।
মানসিক ব্যাধির পূর্বলক্ষণ নয় তো?
পেয়ালাটা নামিয়ে রেখে নমিতা এবার ঘড়ির দিকে তাকালো, একটু চঞ্চল হলো। বললো, দেখছেন তো আমার ভাইপোর কাণ্ড! এখনো এলো না! মাসির কাছে খেয়ে-দেয়ে আসছে বোধ হয়-পরনির্ভরতার এই জ্বালা!
ওর সহজ গলার কথা শুনে স্বস্তি পান অনামিকা, তিনিও সহজভাবে বলেন, তা আজকাল তো আর বাপু মেয়েরা এতো পরনির্ভর নেই, নিজেরাই তো একা একা চলা-ফেরা করে!
নমিতা উঠে দাঁড়িয়ে বলে, তা জানি। কিন্তু এযাবৎ তো পায়ে শেকল বাঁধা ছিল। অভ্যাস ভে নেই। রাস্তা-টাস্তা কিছুই চিনি না। এইবার থেকে উঠে পড়ে লেগে চিনতে হবে। একটু হেসে বললে, শিকলিটা তো কেটেছি মনের জোর করে। এগিয়ে এসে নিচু হয়ে আবার প্রণাম
অনামিকা দু’পা পিছিয়ে গিয়ে বলেন, কী হলো?
ওই যে আসছে আমায় নিতে। খুব জ্বালাতন করে গেলাম আপনাকে। হয়তো আবারও আসবো।
বেরিয়ে গেল দরজার বাইরে। অনামিকা তাকিয়ে থাকলেন ওই হঠাৎ-শিকলি-কাটা পাখিটার গতির দিকে। ও কি সত্যিই আকাশে উড়তে পারবে? নাকি অনভ্যস্ত ডানায় উড়তে গিয়ে ঝটপটিয়ে মাটিতে পড়ে ডানা ভাঙবে?
এই মেয়েটাকে আমি কোন পথ দেখাতে পারতাম? অনামিকা নিচে থেকে উঠে এসে সিঁড়ির জানলা-কাটা দরজা থেকে বেরনো দু-ফুট বাই চার-যুট ক্ষুদে ব্যালকনিটায় এসে দাঁড়িয়ে পড়ে ভাবলেন, ও যদি আমার গল্পের নায়িকা হত, ওর জন্যে কোন্ পরিণতি নির্ধারণ করতাম আমি?
হঠাৎ এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া এসে গায়ে লাগলো, আর হঠাৎই মনে এলো, বেশ বহু বহুকাল এখানটায় এসে দাঁড়াননি। এটা যে ছিল তাই মনে পড়তে না কখনো। আজ মনে পড়লো- নিজের ঘরে ‘মেজদি’র উপস্থিতি স্মরণ করে। ঠিক এই মুহূর্তে সেই অতি-সংসারী মানুষটার কাছাকাছি গিয়ে পড়তে ইচ্ছে হলো না। যে মানুষটা নিকট আত্মীয়ত্বের দাবিতে নিতান্ত অন্তরঙ্গ সূরে কথা বলতে চায়, অথচ যার কাছে বলতে চায় সে অনুভব করে কতো যোজন ব্যবধান তাদের মধ্যে। সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতি তারা।
এই যোজন ব্যবধান নিয়েই তো আত্মীয়ের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা। সব ক্ষেত্রে না থোক বহু ক্ষেত্রেই।
অনবরত বিদ্যুৎপাখার হাওয়া খাওয়ায় অভ্যস্ত শরীরকে এই বেশী রাত্রির উড়ো-উড়ো হাওয়াটা যেন আচ্ছন্ন করে তুলছে।
এই ক্ষুদে বারান্দাটুকুর পরিকল্পনা ছিল বকুলের মা সুবর্ণলতার! বাড়ি হয়ে পর্যন্তই এই জানলা ফুটিয়ে দরজা করে বারান্দার কথা বলে চলেছিলেন তিনি। বলতেন–টানা উঠতে নামতে মাঝে মাঝে এক নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা থাকা দরকার।
তখন বকুলের বাবা রেগে রেগে বলতেন, কী এমন বেণীমাধবের ধজার সিঁড়ি যে মাকে মাঝে নিঃশ্বাস ফেলতে হবে। এতো এতো নিঃশ্বাস নেবারই যে দরকারটা কী বুঝি না। দেয়াল ফেড়ে বেরিয়ে গিয়ে নিঃশ্বাস নিতে হবে। আশ্চর্য!
অথচ সুবর্ণলতা মারা যাবার কিছুদিন পরে হঠাৎ বাবা মিস্ত্রী ডেকে, বেশ কিছু খরচা করে জানলা কাটিয়ে দরজা করে এই ক্ষুদ্র স্কুল-বারান্দা দুটো করিয়ে ফেললেন ওপর নীচে দুটো সিঁড়িতে।
