তবু ওই ভালবাসা-চাওয়া মেয়েটার জন্যে করুণা এলো, মেয়েটার জন্যে মমতা অনুভব করলেন।
এতোটুকু বাসার কাঙাল একটা ছোট্ট পাখিকে দেখলে যেমন লাগে। ওই বাসাটার আশায় পাখিটা ঝড়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে।
বললেন, পৃথিবীটা এই রকমই নমিতা।
এই রকমই? নমিতা উত্তেজিত হলো, আপনি বলছেন কি? পৃথিবীতে ভালোবাসা নেই? মমতা নেই? হৃদয় নেই? নেই যদি তো আপনি আমায় এতো ভালোবাসলেন কেন? আপনি তো আমার কেউ নন?
অনামিকা যেন হঠাৎ একটা হাতুড়ির ঘা খেলেন। অনামিকা মরমে মরে গেলেন। এই নিতান্ত নির্বোধ মেয়েটার এই সরল বিশ্বাসের সামনে নিজেকে যেন একান্ত ক্ষুদ্র মনে হলো।
ভালোবাসা! কোথায় সেই ঐশ্বর্য?
শম্পার জন্যে যে উদ্বেগ, শম্পার জন্যে যে প্রার্থনা, শম্পার জন্যে যে অগাধ ভালোবাসা তার শতাংশের একাংশও কি এই মেয়েটার জন্যে সঞ্চিত ছিল অনামিকার?
অনামিকা তো ওকে ভুলেই গিয়েছিলেন।
অথচ ও ভেবে বসে আছে অনামিকা ওকে ভালবাসেন!
ইস্, সত্যিই যদি তা হতো?
অনামিকার যেন নিজের কাছেই নিজের মাথা কাটা যাচ্ছে।
আমাদের চিত্ত কতো দীন! আমাদের প্রকৃতিতে কতো ছলনা!
আমাদের ব্যবহারের মধ্যে কতো অসত্য!
কই, অনামিকা কি স্পষ্ট করে ওর মুখের ওপর বলতে পারলেন, ভালবাসা? কই? সে জিনিসটা তো তোমার জন্যে আছে বলে মনে হচ্ছে না? দেখতে তো পাচ্ছি না? যা আছে তা তো কেবলমাত্র একটু করুণামিশ্রিত মমতা
না, বলতে পারলেন না।
সেই মিথ্যার মোহ দিয়ে গড়া কটি মিষ্টি কথাই বললেন, তুমি যে আমায় খুব ভালোবাসো। ভালোবাসাই ভালোবাসাকে ডেকে আনে।
ছাই আনে! দেখলাম তো পৃথিবীকে!
অনামিকার মনে হলো অভিমানটা যখন মানুষের ছোট সংসারের পরিধি ছাপিয়ে সমগ্র পৃথিবীর ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ে, তখন তার স্বাভাবিক সুস্থতা ফিরিয়ে আনা শক্ত।
তবু কিছু তো বলতেই হবে, তাই বলেন, আচ্ছা নিজে নিজে কিছুও একটা তো ভাববে?
সেই তো! নমিতা মাথা তুলে বলে, আমি ওর মতো সন্নিসি হয়ে যাবো? ওর কাছে চলে যাবো? কিছুদিন থেকে এই ভাবনাটাই পেয়ে বসেছে। সে জীবনে কতো মান-সম্মান গৌরব! আর এই পরের আশ্রিত জীবনে কী আছে? মান নেই, সম্মান নেই, গৌরব নেই
অনামিকার সত্যিই খুব দুঃখ হয়।
অনামিকা হৃদয়ঙ্গম করেন ব্যথাটা কোথায়।
তবু আস্তে বলেন, ওঁর কাছে চলে যাবো বললেই তো যাওয়া যায় না। ওঁর মতামত জানা দরকার, সেখানে থাকা সম্ভব কিনা জানা দরকার।
আপনিও এ কথা বলছেন? নমিতা যেন হঠাৎ আহত হয়ে অভিমানে ফুঁসে ওঠে, সেই আমার জলপাইগুড়ির আত্মীয়দের মতো? থাকা কেন সম্ভব হবে না? আমি তো ওঁর সঙ্গে ঘরসংসার পাতিয়ে সংসার করতে চাইছি না। তাছাড়া মতের কথা ওঠে কেন? আমি কি ওঁর বিবাহিতা স্ত্রী নই? আমার কি একটা অধিকার নেই?
ওর এই সদ্যজাগ্রত অধিকারবোধের চেতনা ও স্বাধীনতার চেতনাই যে ওকে বিপর্যস্ত করছে, তাতে সন্দেহ নেই। ওর এই অস্থির-চাঞ্চল্যের মাটিতে উপদেশের বীজ ছড়ানো বৃথা, তবু অনামিকা বলেন, জীবনকে আরো কতো ভাবে গড়ে তোলা যেতে পারে!
কিছু পারে না। আমার মতো মেয়েদের কিছু হয় না। আমি কি সাহিত্যিক হতে পারবো যে লোকের কাছে বড়ো মুখ করে দাঁড়াতে পারবো? আমি কি বড় গায়িকা হতে পারবো? আমার কি অনেক টাকা আছে যে দান-ধ্যান করে নাম কিনতে পারবো? আমার পক্ষে বড়ো হবার তো ওই একটাই পথ দেখতে পাচ্ছি, ভগবানকে ডেকে ডেকে অধ্যাত্মজগতের অনেক উঁচুতে উঠে যেতে পারি।
অনামিকা ওর আবেগ-আবেগ মুখটার দিকে তাকান। অনামিকা নিঃশব্দে একটু হতাশ নিঃশ্বাস ফেলেন। বড় বার ক্ষমতা না থাকলেও যে সেটা হতে চায় তাকে বাঁচানো কঠিন।
অথচ এদিকে রাত বেড়ে যাচ্ছে, ছোট চাকরটা বার দুই ঘুরে গেছে দরজার কাছে, কারণ এই বসবার ঘরটিই তার রাত্রের শয়নমন্দির।
কত কম ক্ষমতা আমাদের! নিঃশ্বাস ফেলে ভাবলেন অনামিকা, কার জন্যে কতোটুকু করতে পারি?
আমরা হয়তো লোকের রোগের সেবা করতে পারি, অভাবে সাহায্য করতে পারি, সংসারে চলার পথের পাথর-কঁকর সরিয়ে দিতে পারি, পায়ের কাটা তুলে দিতে পারি, কিন্তু কারো জীবনে যদি বিশৃঙ্খলা এসে যায়? যদি কারো মন তার নিজের শুভবুদ্ধির আয়ত্তের বাইরে চলে যায়?
কিছু করতে পারার নেই। হয়তো কিছুটা শুকনো উপদেশ বিতরণ করে মনকে চোখ ঠারতে পারি। ভাবতে পারি, অনেক তো বললাম! না,শুনলে কী করবো?
তাছাড়া প্রত্যক্ষভাবেই বা কতোটুকু করার ক্ষমতা আছে আমার? ভাবলেন অনামিকা, আমি কি ওকে সঙ্গে করে ওর সেই পলাতক স্বামীটার কাছে পৌঁছে দেওয়ার সাহায্যটুকুই করতে পারি? পারি না। মাত্র ওকে আর্থিক সাহায্য করতে পারি। খুব সন্তর্পণে বললেন, তা তুমি কি তার–মানে তোমার স্বামীর ঠিকানা জানো?
জানি।
চিঠিপত্র দাও?
নমিতার দুই চোখ দিয়ে হঠাৎ জল গড়িয়ে পড়ে, আগে আগে অনেক দিয়েছি, জবাব দেয় না। একবার মামাকে একটা পোস্টকার্ড লিখে পাঠালো, ওখান থেকে যে কোনো চিঠিপত্র আসে এ আমি পছন্দ করি না। ব্যাস, সেই অবধি
অনামিকা সেই অশ্রুলাঞ্ছিত মুখটার দিকে তাকিয়ে দেখেন, অনামিকার নিজেকেই যেন অপরাধী মনে হয়। যেন এই মেয়েটার দুঃখের কারণের মধ্যে তারও কিছু অংশ আছে। সারাজীবন ধরে তিনি যা কিছু লিখেছেন, তার অধিকাংশই মেয়েদের চিন্তার মুক্তির কথা ভেবে। কিন্তু মুক্তির পথটা কোথায় তা দেখিয়ে দিতে পারেননি।
