হঠাৎ একদিন চোখটা খুলে গেল, বুঝলেন? হঠাৎ নিজেকে নিজে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে এইভাবে দাসীর মত পড়ে আছিস কেন তুই? উত্তর পেলাম, “শুধু দুটো ভাতের জন্যে।” ঘেন্না ধরে গেল নিজের ওপর।
অনামিকা শান্ত গলায় বলেন, শুধু ভাতের জন্যে কেন বলছো নমিতা? তার থেকে অনেক বড়ো কথা ‘আশ্রয়’। আশ্রয়, নিরাপত্তা, সামাজিক পরিচয়–এইগুলোর কাছেই মানুষ নিরুপায়।
কিন্তু নমিতা এ যুক্তিতে বিচলিত হলো না। কারণ নমিতার হঠাৎ চোখ খুলে গেছে।
দৃষ্টিহীনের হঠাৎ দৃষ্টি খুলে যাওয়া বড় ভয়ানক, সেই সদ্য-খোলা দৃষ্টিতে সে যখন নিজের অতীতকে দেখতে বসে, এবং সেই দেখার মধ্যে আপন অন্ধত্বের শোচনীয় দুর্বলতাটি আবিষ্কার করে, তখন লজ্জায় ধিক্কারে মরীয়া হয়ে ওঠে। আর তখন সেই দুর্বলতার ত্রুটি পূরণের চেষ্টায় কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে ওঠে।
আমাকে সবাই ঠকিয়ে খেয়েছে, বুঝলেন, আমাকে সবাই ভাঙিয়ে খেয়েছে। আমি যে একটা রক্তমাংসের মানুষ, আমারও যে সুখ-দুঃখ বোধ আছে, শ্রান্তি-ক্লান্তি আছে, ভাল-লাগা ভাল-না-লাগা আছে সেকথা কোনোদিন কারুর খেয়ালে আসেনি।
খেয়ালে যে নমিতার নিজেরও আসেনি, এ কথা এখন ওকে বোঝায় কে?
লক্ষ্মী-বৌ নাম কেনার জন্যে, অসহায়ের পরম আশ্রয়টিকে শক্ত রাখবার জন্যে, নমিতা নিজেকে পাথরের মতো করে রেখেছিল, কাজেই নমিতার পরিবেশটাও ভুলে গিয়েছিল নমিতা রক্তমাংসের মানুষ।
কিন্তু ওর এই উত্তেজিত অবস্থায় বলা যায় না সেকথা বলা যায় না, নমিতা একবার পাথরের দেবী বনে বসলে আবার রক্তমাংসের মাটিতে নেমে আসা বড় কঠিন! তুমিই তোমার মুক্তির প্রতিবন্ধক হবে! অথবা হয়তো তুমি তোমার এই নবলব্ধ স্বাধীনতাটুকুকে অপব্যবহার করে নাম-পরিচয়হীন অন্ধকারে হারিয়ে যাবে!
কিন্তু এসব তো অনুমান মাত্র, এসব তো বলবার কথা নয়। অথচ বলবার কথা আছেই বা কী? একজনের জীবনের সমস্যার সমাধান কি অপর একজন করে দিতে পারে?
অথচ নমিতা চাইতে এসেছে সেই সমাধান। কেবলমাত্র দেখবার ইচ্ছেয় ছুটে চলে আসার যে মধুর ভাষ্যটি নমিতা উপহার দিয়েছে অনামিকাকে, সেটার মধ্যে যে অনেকখানিটাই ফাঁকি, তা নমিতা নিজেই টের পায়নি।
নমিতা তাই সেই কথা বলার পর সহজেই বলতে পারছে, আপনি বলে দিন এখন আমার কোন পথে যাওয়া উচিত? এই প্রশ্ন করবার জন্যেই এতো কষ্ট করে আসা।
অনামিকা আস্তে বলেন, একজনের কর্তব্য কি আর একজন নির্ণয় করে দিতে পারে নমিতা?
আপনারা নিশ্চয়ই পারেন! নমিতা আবেগের গলায় বলে, আপনারা কবিরা, সাহিত্যিকরাই তো আমাদের পথপ্রদর্শক।
সেটা অজ্ঞাতসারে এসে যেতে পারে, অনামিকা মৃদু হাসেন, প্রত্যক্ষ ভাবে গাইড সেজে কিছু বলা বড় মুশকিল। তোমার নিজের তো অবশ্যই কোনো একটা পথ সম্পর্কে পরিকল্পনা আছে।
নমিতা একটু চুপ করে থেকে একটা হতাশ-হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে বলে, বিশেষ করে একটা কোনো কিছু ভাবতে পারছি না আমি। অনেক পথ অনেক দিকে চলে যাচ্ছে। শুনলে হয়তো আপনি হাসবেন, হঠাৎ-হঠাৎ কী মনে হচ্ছে জানেন, একটা গরীব লোক হঠাৎ লটারীতে অনেক টাকা পেয়ে গেলে তার যেমন অবস্থা হয়, কী করবে ভেবে পায় না, আমার যেন তাই হয়েছে। আমার এই জীবনটা যেন এই প্রথম আমার হাতে এসেছে, ভেবে পাচ্ছি না সেটাকে নিয়ে কী করবো?
অনামিকা আবার হাসলেন, তোমার উপমাটি কিন্তু এর নমিতা, আমার ইচ্ছে করছে কোথাও লাগিয়ে দিতে। কিন্তু বুড়ো মানুষের পরামর্শ যদি শোন তো বলি, লটারীতে পেয়ে যাওয়া টাকাটা কী ভাবে খরচ করবো ভেবে দিশেহারা হবার আগে সর্বপ্রথম কর্তব্য হচ্ছে টাকাটা ব্যাঙ্কে রাখা। তারপর ভেবেচিন্তে ধীরেসুস্থে–
নমিতা ক্লান্ত গলায় বলে, কিন্তু ধীরেসুস্থে কিছু করার আমার সময় কোথায়? একজন পিসতুতো দাদার বাড়িতে এসে উঠেছি, কদিন আর সেখানে থাকা চলে বলুন? এখান থেকে চলে যেতেই হবে। কিন্তু কোন্ দিকে যাবো?
অনামিকা কোমল করে বলেন, মনে কিছু কোরো না নমিতা, জিজ্ঞেস করছি জলপাইগুড়িতে থাকাটা কি সত্যিই আর সম্ভব হলো না?
নমিতা চোখ তুলে তাকায়।
নমিতা বোধ করি একটু হাসেও, তারপর বলে, অসম্ভবের কিছু ছিল না। যেমন ভাবে ছিলাম, ঠিক সেই ভাবেই থেকে গেলে মৃত্যুকাল অবধিই থাকতে পারতাম। আমায় তো কেউ তাড়িয়ে দেয়নি। আর নতুন কোনো মতের মতান্তরের ঘটনাও ঘটেনি। এতোদিন জীবনের খাতাখানার দিনের পাতাগুলো উল্টেই চলেছি, দিন থেকে রাত্তির, রাত্তির থেকে দিন–খাতার পাতা হঠাৎ কোনও জায়গায় ফুরিয়ে যেত হয়তো। কিন্তু একসময় একটা হিসেবনিকেশ তো করতেই হবে। সেইটা করতে বসেই হঠাৎ চোখে পড়ে গেল শুধু বাজে খরচের পাহাড় উঠেছে জমে।
নাঃ, তোমার বাপু সাহিত্যিক হওয়াই উচিত ছিল। অনামিকা বলেন, যা সব সুন্দর উপমা দিতে পারে। কিন্তু আমি বলছিলাম কি, হয়তো ওই বাজে খরচের অঙ্কটা সবটাই ঠিক নয়। হয়তো ওর মধ্যেও কিছু কাজের খরচ হয়েছে।
কিছু না, কিছু না। আপনি জানেন না, এতোদিনের প্রাণপাত সেবার পুরস্কারে একটুকু ভালোবাসা পাইনি। শুধু স্বার্থ, তার জন্যেই একটু মিষ্টি বুলি। বলুন যেখানে একটুখানিও ভালবাসা নেই, সেখানে মানুষ চিরকাল থাকতে পারে?
অনামিকা মনে মনে হাসলেন।
অনামিকার মনে হলো, চোখটা তোমার হঠাৎই খুলেছে বটে। আর অন্ধত্বটা বড় বেশী ছিল বলেই ওই খোলা চোখে মধ্যদিনের রৌদ্রটা এতো অসহ্য লাগছে।
