কী ধরনের? মনে পড়িয়ে নিয়ে নিচে যাওয়া দরকার, তা নইলে হয়তো লজ্জায় পড়তে হবে। আহত হয়ে বলবে, সে কি? আমার কথা আপনার মনে নেই?
তা মনে পড়ে গেল। স্বামী সাধু হয়ে চলে গেছে, হরিদ্বারে না হৃষিকেশে কে জানে কোথায়! কিন্তু ওর মুখটা মনে পড়ছে না কেন? কেমন দেখতে নমিতার মুখটা? ভাবতে ভাবতে নেমে এসে পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই মনে মনে খুব একটা লজ্জাবোধ করলেন অনামিকা। এতো চেনা মুখটা মনে করতে পারছিলাম না! অথচ এখন একেবারে অতি-পরিচিত লাগছে!
হয়তো ওই লাগাটার কারণ মেয়েটার একান্ত বিশ্বস্ত চেহারাটার জন্যে। ও যেন ওর কোন পরম আত্মীয়ের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। ওর মুখে সেই আশ্রয় প্রাপ্তির ছাপ।
ওই ছাপটাই মনে করালো মুখটা বড় বেশী পরিচিত। কী আশ্চর্য, এইটা মনে আসছিল না!
এরকম আজকাল প্রায়-প্রায় হচ্ছে অনামিকার। নাম মনে পড়ছে তো মুখ মনে পড়ছে। আবার হয়তো মুখ মনে পড়ছে, নামটা কিছুতেই মনে আসছে না! স্মৃতির দরজায় মাথা খুঁড়ে ফেলেও না।
বয়েস হওয়ার এইটাই বোধ করি প্রথম লক্ষণ। অবশ্য সবাইয়ের বয়েস একই নিয়মে বাড়ে না। সনৎকাকার কি কারো মুখ চিনতে দেরি হয়? অথবা তাদের নাম মনে আনতে? কি জানি!
অনামিকাকে দেখেই তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালো নমিতা, এগিয়ে এসে অনামিকা ‘থাক থাক’ বলে পিছিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও পায়ের ধুলো না নিয়ে ছাড়লো না। এবং অনামিকা কিছু বলবার আগেই তাড়াতাড়ি বলে উঠলো, এতো রাত্তিরে এসে খুব বিরক্ত করলাম তো?
এক্ষেত্রে যা বলতে হয় তাই বললেন অনামিকা। বিরক্তির প্রশ্ন ওঠে না সেটাই জানালেন সুন্দরভাবে।
তারপর বললেন, কী খবর?
নমিতা স্বভাবসিদ্ধ মৃদু গলায় বললে, খবর কিছু না, আপনাকে দেখবার ইচ্ছে হচ্ছিল খুব
শুধু আমাকে একবার দেখবার ইচ্ছেয়? অনামিকা হাসলেন, আশ্চর্য তো! তার জন্যে এত কষ্ট করে? কবে এলে কলকাতায়? এখানে এলে কার সঙ্গে?
ও একে একে বললো, আমার একটি ভাইপো পৌঁছে দিয়ে গেছে। এই পাড়ায় তার মাসির বাড়ি, ওখানে ঘুরে আবার এসে নিয়ে যাবে। কলকাতায় এসেছি দিন দশেক। আপনাকে দেখবার জন্যে কষ্ট করে আসার কথা বলছেন? কষ্ট কী? বলুন যে ভাগ্য! আপনাদের মতো মানুষদের চোখে দেখলেও প্রাণে সাহস আসে।
তার মানে নমিতা নামের মেয়েটা প্রাণে সাহস সংগ্রহের জন্যেই এই রাত্তিরে চেষ্টা করে সঙ্গী জুটিয়ে এসে হাজির হয়েছে! তার মানে নমিতার এখন কোনো কারণে সাহসের দরকার হয়েছে।
তবে প্রশ্ন করে বিপন্ন হবার সাহস অনামিকার হলো না। তিনি আলতোভাবে বললেন, জলপাইগুড়ির খবর কী?
খবর ভালই! মামা বেশ ভাল আছেন। বলেই খাপছাড়া ভাবে বলে ওঠে নমিতা, আমি ওখান থেকে চিরকালের মতো চলে এসেছি। আর ফিরবো না।
এমনি একটা কিছু অনুমান করেছিলেন অনামিকা। ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে, যতই মৃদুছলে কথা বলুক, আপাততঃ ও একটি ছন্দপতনের শিকার। সেই যে ওর লক্ষ্মী-বৌয়ের ভূমিকা, সে ভূমিকায় আর বন্দী নেই নমিতা।
তবু প্রশ্নের মধ্যে গেলেন না অনামিকা, সাবধানে বললেন, তাই বুঝি?
হ্যাঁ, আমি মনস্থির করে ফেলেছি। কেন ফিরবো বলুন তো? সেখানে আমার প্রত্যাশার কী আছে?
অনামিকার মনে হলো, ও বদলে গেছে। আবার ভাবলেন, ও বদলে গেছে এ কথা ভাবছি কেন? ও হয়তো এই রকমই ছিল। এক-দুদিনে কি মানুষকে চেনা যায়? আমি ওর জীবনের সব ইতিহাস জানি? হয়তো ও এই ভাবেই একাধিক আশ্রয় থেকে ছিটকে ছিটকে বেরিয়ে এসেছে। হয়তো মূলকেন্দ্র থেকে চ্যুত হলে এমন একটা অবস্থাই ঘটে।
স্বামীর ঘরটা একটা আইনসঙ্গত অধিকারের মাটি, যেখানে দাঁড়িয়ে জীবনযুদ্ধে লড়ে যাওয়া সহজ। ওখানে প্রেম নামক দুর্লভ বস্তুটি নিয়ে মাথা না ঘামালেও কাজ ঠিকই চলে যায়। কিন্তু আর সেই সবই তো অনধিকারের জমি। সেখানে কেবলমাত্র মনোরঞ্জন ক্ষমতার জোরে টিকে থাকতে হয়। অতএব প্রতিপদেই হতাশ হতে হয়। নমিতা হয়তো তেমনি হতাশ হয়েছে।
দেখেছে চেষ্টা করে, কারো মনোরঞ্জন করা যায় না। কোথাও কোনো মন যদি আপনি রঞ্জিত হলে তো হলো, নচেৎ শ্রমই সার।
কিন্তু এসব কথা জিজ্ঞেস করা যায় না, তাই অনামিকা বলেন, কলকাতায় তোমার বাপের বাড়ি, তাই না?
আন্দাজে ঢিল ফেলেন অবশ্য। হয়তো নমিতা ওর পরিচয়লিপি পেশ করেছিল সেই সেদিন রাত্রে, কিন্তু মনে থাকা সম্ভব নয়। অথচ সম্ভব যে নয়, সেকথা অপরকে বোঝানো কঠিন। সে ভাববে, আশ্চর্য, অতো কথা মনে রইল না! তবুও নমিতা এ প্রশ্নে আহত হয়।
সেই আহত সুরেই বলে, বাপের বাড়িতে আবার আমার কে আছে? আপনি তো সবই জানেন। বলেছি তো সবই।
বিপদ!
অনামিকা মনে মনে বলেন, বলেছে তো সবই, কিন্তু আমার কি ছাই মনে আছে? কিন্তু মুখে তো সেকথা বলা যায় না। তাই বলতে হয়, হ্যাঁ, সে তো জানিই। তবে মানে বলছিলাম কি, এখন তো কলকাতাতেই থাকতে হবে?
স্বরটা নিদারুণ নির্লিপ্ত, কিন্তু নমিতা সেই নির্লিপ্ত ভঙ্গীটি ধরতে পরে না; নমিতার বোধ করি মনে হয়, এটা নির্দেশ, তাই নমিতা ঈষৎ উত্তেজিত গলায় বলে, থাকতেই যে হবে তার কোনো মানে নেই। এখন আমি স্বাধীন, এখন আমি যা ইচ্ছে করতে পারি।
তাজ্জব! হঠাৎ এমন অগাধ স্বাধীনতাটি কোন সূত্রে লাভ করে বসলো নমিতা?
তা সূত্রটা নমিতা নিজেই ধরিয়ে দিল। ধরিয়ে দিল তার উত্তেজিত চিত্তের পরস্পর বিরোধী সংলাপ।
