অথচ পারুলও আসতে পারতো। আশ্চর্য, পারুলের একবারও মা-বাপের স্মৃতি-সম্বলিত বাড়িটার কথা মনে পড়ে না?
চন্দনের আবার মুহুর্মুহু দোক্তা খাওয়ার অভ্যাস, সেই বিজাতীয় গন্ধটা থেকে নিজেকে খানিক তফাতে সরিয়ে এনে বকুল বলে, তা এক সময়ে তো মানুষ তাই বেড়াত মেজদি, আর লোকে সেটাকেই “সত্যযুগ” বলে।
অনাছিষ্টি কথা বলিসনে বকুল, দেখছি তোর মতিগতি একেবারে বেহেড হয়ে গেছে। ছোটবৌ দুঃখ করে যা বললো, তা দেখছি সত্যি!
বকুল চমকালো না। চুপ করে থাকলো। ছোটবৌ দুঃখ করে কী বলেছে সেটা সে অনুমান করতে পারছে।
চন্দন কৌটো খুলে পান বার করে মুখে দিয়ে বললো, তা তোরও বাপু উচিত নয় সোমত্ত মেয়েটাকে এভাবে আস্কারা দেওয়া! লেখিকা হয়ে নাম করেছিস বলে কি মাথা কিনেছিস? কত বড় বংশ আমাদের, সেটা ভেবে দেখবি না?
বকুলের ইচ্ছে হয় না আর এর সঙ্গে তর্ক করে, তবু কথার উত্তর না দেওয়াটা অসৌজন্য এই ভেবে শান্ত গলায় বলে, বড় বংশ কাকে বলে বল তো মেজদি?
মেজদি একটু থতমত খেয়ে বলে, কাকে বলে, সেটা আমি তোকে বোঝাবো? এ বংশে আগে কখনো এদিক-ওদিক হয়েছে?
সেইটেই বড় বংশের সার্টিফিকেট মেজদি?
মেজদি তা বলে হারেন না, তাই বলে ওঠেন, তা আমরা সেটাকেই বড় বলি। সব বংশেই কি আর রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ জন্মায়?
তা বটে। বলে একটু হাসে বকুল।
চন্দন উঠে গিয়ে ছাতের কোণে পানের পিক ফেলে এসে বলে, ছোট বৌটার প্রাণে জ্বালাও তো কম নয়। একেই তো ছেলেটা লেখাপড়া শেষ করেও বিলেতে বসে আছে, ভগবান জানেন কী মতলবে, তার ওপর মেয়ে এই কীর্তি করলো
প্রসূন তো বিলেতে চাকরি করছে
তুই থাম বকুল! বিলেতে চাকরি করছে। বিলেতে আর চাকরির উপযুক্ত লোক নেই, তাই একটা বাঙালীর ছেলেকে ধরে চাকরি দিয়েছে! ও সব ভুজুং শোনবার পাত্রী চন্দন নয়। মেম ফেম বিয়ে করেছেন কিনা বাছাধন কে জানে!
বকুল আর একবার নিঃশ্বাস ফেললো। এই ভদ্রমহিলা বকুলের সহোদরা!
চন্দন আবার বলে ওঠে, অবিশ্যি দোষ ছেলে-মেয়েকে দেব না, বাপ-মাকেই দেব। যেমন গড়েছ তেমনি হয়েছে। তুমি গড়তে পারলে শিব পাবে, না পারলে বাঁদর পাবে।
বকুল মৃদু হেসে বলে, তাই কি ঠিক মেজদি? আমাদের মা-বাপ তো তোমাকেও গড়েছেন, আবার আমাকেও–।
মেজদি ভুরু কুঁচকে বলেন, কী বলছিস?
অন্য কিছু না। তোমার বড়দির কত শিক্ষাদীক্ষা, শাস্ত্রজ্ঞান, সে তুলনায় সেজদি আর আমি তো যা-তা! অথচ একই মায়ের
চন্দন এই অভিমতটি পরিপাক করে বলে, আমাদের শিক্ষা-দীক্ষা সবই বাবা শ্বশুরবাড়ির। এ সংসার থেকে তো কবেই দূর হয়ে গেছি। নেহাৎ নাড়ির টান, তাই মানুর মেয়েটার বেরিয়ে যাওয়ার খবর শুনে
বকুল শান্ত গলায় বলে, মেজদি, তোমার মেয়েদের খবর বলো
চট করে নিজের জগতে চলে যায় চন্দন। একে একে তার পাঁচ মেয়ের নিখুঁত জীবনী আওড়াতে বসে।
ক্লান্ত বকুলের মাথার মধ্যে কিছুই ঢোকে না। কিন্তু বকুলকে কে উদ্ধার করবে?
.
তা তেমন কাতর প্রার্থনা বুঝি ভগবান কানে শোনেন।
নইলে রাত সাড়ে নটায় একটি ভদ্রমহিলা দেখা করতে আসেন অনামিকা দেবীর সঙ্গে?
ছোট চাকরটার মুখস্থ হয়ে গেছে ভাষাটা, সে সিঁড়ির আধখানা পর্যন্ত উঠেই গলা তুলে ডাক দেয়, পিসিমা, একটি ভদ্রমহিলা দেখা করতে এসেছে আপনার সঙ্গে।
ভদ্রমহিলা! এই রাত্তির সাড়ে নটায়?
বকুল অবাক একটু হয়, তবে এমন ব্যাপার একেবারেই অপূর্ব অঘটন নয়। রাত দশটার পরেও এসে হানা দেয় এমন লোক আছে।
বকুল তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে বলে, জিজ্ঞেস করে আয় তো কোথা থেকে আসছেন?
জিজ্ঞেস করেছি। জানি তো নইলে আবার ছুটতে হতো। বলল, বল গে জলপাইগুড়ির নমিতা, তাহলেই বুঝতে পারবেন।
ছেলেটা চৌকস। সিনেমা-থিয়েটারের ভৃত্যের ভূমিকাভিনেতাদের মতো উজবুক অদ্ভুত নয়।
এ ছোঁকরা পায়জামা প্যান্ট ভিন্ন পরে না, রোজ সাবানকাঁচা ভিন্ন জামা গেঞ্জি ছুঁতে পারে না এবং পাউরুটি ব্যতীত হাতেগড়া রুটি জলখাবার খেতে পারে না। সপ্তাহে একবার করে সিনেমা যাওয়া ওর বাঁধা এবং বাঙালীর ছেলে হলেও বাংলা নাটকের থেকে হিন্দীকে প্রাধান্য দেয় বেশী। বাবুটাবুদের সামনেই সেই হিন্দী ছবির গানের কলি গুনগুনাতেও কিছুমাত্র লজ্জাবোধ করে না এবং পুজোর সময় ওকে ধুতি দিলে ধুতি পরতে পারি না, পায়ে জড়িয়ে যায় বলে ফেরত দিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না।
এহেন চাকরকে দিয়ে বাইরের কাজ করানোর অসুবিধে নেই।
তাছাড়া পিসিমার কাজের ব্যাপারে ছেলেটা পরম উৎসাহী, অনামিকার কাছে অনেক লোকজনই তো আসে, ছেলেটা তাদের জন্যে চায়ের জল চাপাতে একপায়ে খাড়া।
বকুল হাত নেড়ে বলে, আচ্ছা তুই যা, আমি যাচ্ছি।
.
জলপাইগুড়ির নমিতা! নামটা খুব স্পষ্ট মনে পড়ছে, তার কথাগুলোও। কিন্তু চেহারাটা? সেটা স্পষ্ট নয়, যেন ঝাঁপসা-ঝাঁপসা। ভাবতে ভাবতে নেমে এল।
মেজদি খুব বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো, বাবা, এই রাতদুপুরে আবার কে এলো? মরণ! তাই বলেছিল ওরা, বাড়ি তো নয় হাটবাজার, রাতদিন লোক! দেখালি বটে বাবা খুব!
শেষটা কানে যায় না বকুলের, নেমে গেছে ততক্ষণে।
জলপাইগুড়ির নমিতা!
সেই মাঝরাত্তিরে এসে আস্তে আস্তে কথা বলা, বিষণ্ণ-বিষম মেয়েটা। একদিনের দেখাতেই জীবনের কাহিনী বলতে বসেছিল। অবশ্য অনামিকার ভাগ্যে তেমন অভিজ্ঞতা অনেক আছে, অদেখা মানুষ টেলিফোনে ডেকেও আপন জীবনের দুঃখের কাহিনী শোনাতে বসে, কিন্তু এই বৌটির দুঃখ যেন একটু অন্য ধরনের।
