বকুল চোখ তুলে একটু হেসেছিল। যে হাসিটা কথা হলে এই দাঁড়াতো, সেটা আবার বলছো?
আর সেই সময়ই হঠাৎ খেয়াল হয়েছিল বকুলের, যেন যুগযুগান্তর পরে ছোড়দা তাকে ‘তুই’ করে কথা বললো।
বকুলের একান্ত বাসনা হতে থাকে কালই যেন খবর আসে শম্পার, আর সেটা যেন ওর মা-বাপের কাছেই আসে। বকুলের গর্ব খর্ব হোক, সেটাই প্রার্থনা। সে প্রার্থনা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যেন মাথা তুলতে পারবে না বকুল।
কিন্তু তারপর কতগুলো দিন কেটে গেল, কারুর গর্বই বজায় রইল না, খবর এলো না শম্পার। না পিসির কাছে, না মা-বাপের কাছে।
তবু কি ওরা সবাই ভাবতে বসবে, রাগের মাথায় বেরিয়ে যেতে গিয়ে কোনো দুর্ঘটনার মুখে পড়েছে শম্পা? কিন্তু তাই বা ভাবতে পারছে কই? তেমন খবর কি চাপা থাকে? তেমন খবর চাপা থাকে না নিশ্চয়ই।
কোনো খবরই চাপা থাকে না। বিশেষ করে দুঃসংবাদের।
দুঃসংবাদের একটা দুরন্ত গতিবেগ আছে, সে বাতাসের আগে ছোটে। নইলে শম্পার এই হারিয়ে যাবার খবরটা শম্পাদের সমস্ত আত্মীয়জনের কাছে পৌঁছয় কি করে?
পৌঁছয় বৈকি, নইলে হঠাৎই বা কেন এদের বাড়িতে এতো আত্মীয়-বন্ধুর পদধূলি পড়তে থাকে? আর কেনই বা তারা অনেক গল্পগাছা করে উঠে যাবার প্রাক্কালে হঠাৎ সচকিত হয়ে প্রশ্ন করেন, শম্পাকে দেখলাম না যে!
শম্পার আরো ভাই বিলেতে আছে, বাড়িতে আরো মেয়েটেয়ে আছে সেজ কর্তার দিকে, সকলের কথা তো মনে পড়ে না সকলের।
গোঁজামিল দেওয়া একটা উত্তরে তারা সন্তুষ্ট হন না, শুধু সন্তোষভাব দেখান। কিন্তু মুখের চেহারা অন্য কথা বলে।
তথাপি ওই প্রশ্নটা যে নিরুদ্দেশ রাজার উদ্দেশ করিয়ে ছাড়বে, রাণাঘাট থেকে এ বাড়ির কর্তার বহুদিন নিরুদ্দিষ্ট মেজো মেয়ে সেই প্রশ্নটা বহন করে আনবে, এতোটা কেউ আশা কারেনি। আশা করবার মতো নয় বলেই করেনি।
তাই বিদেশ থেকে বোন এসেছে শুনে আশায় আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিল বকুলের বুক।
বকুলের চোখের সামনে পারুলের ঝকঝকে চেহারাটা ভেসে উঠেছিল।
কিন্তু
কিন্তু তার বদলে?
তার বদলে চির-অব্যবহৃত ‘মেজদি’ শব্দটার পোশাক-আঁটা অজ্ঞাত অপরিচিত মানুষটা বকুলের ঘরে এসে বকুলের মুখের কাছাকাছি মুখ এনে ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন করে, হারে, মানুর মেয়েটা নাকি কোন একটা ছোটলোকের সঙ্গে বেরিয়ে গেছে?
বকুল চমকে উঠলো।
তার ভিতরের রুচি নামক শব্দটাই যেন সিঁটিয়ে উঠলো এ প্রশ্নে। আর সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ মনে হলো বকুলের, ইনি আমার সেজদিরও সহোদরা বোন। ইনি আমাদের মায়ের গর্ভজাত।
আশ্চর্য বৈকি!
ভাবলে কী অদ্ভুত আশ্চর্য লাগে! একই মানুষের মধ্যেই সৃষ্ট হয় কতো বর্ণ-বৈচিত্র্য, কতো জাতি-বৈচিত্র্য! মেজদি আর সেজদি কি এক জাতের?
বড়দি আর আমি? অথবা সবই পরিবেশের কারসাজি?
ওই ভাবনাটার মাঝখানেই মেজদি আবার প্রশ্ন করে উঠলো, কথাটা তাহলে সত্যি? বাবার বংশে তাহলে সব রকমই হলো?
বকুল মুখটা একটু সরিয়ে নিয়ে একটু কঠিন হেসে বললো, শুধু আমাদের বাবার বংশে কেন মেজদি, আজকের দিনে সকলের বংশেই সব রকম হচ্ছে!
হচ্ছে? সবাইয়েরই হচ্ছে?
হচ্ছে বৈকি। আর সেটা তো হতেই হবে। কালবদল হবে না? যুগবদল হবে না? সমাজের রীতিনীতি আচার-আচরণ সব অনড় হয়ে থাকবে? মানুষ চিরকাল এক ছাঁচেই থেকে যাবে?
এ ধরনের কথা বড় একটা বলে না বকুল। বললো শুধু মানুষটা তার একান্ত অন্তরঙ্গ হয়ে একান্তে তার ভাই-ভাইবৌ-ভাইঝির সমালোচনা করতে বসেছে দেখে।
বকুলের এই তিনতলার ঘরটাতেই বিছানা বিছানো হয়েছে চন্দনের জন্যে, আর অপ্রতিবাদেই সেটা মেনে নিতে হয়েছে বকুলকে। তাই প্রথম থেকেই বকুল আত্মরক্ষায় সচেতন হতে চাইছে।
যুগ যে বদল হয়, কাল যে বদল হয়, এটা স্পষ্ট করে বলে নিজেকে মুক্ত রাখতে চাইছে। ওই সমালোচনার জাল থেকে।
মেজদি বলে ওঠে, তা তুই তো ও কথা বলবিই! তুই তো আবার নভেল লিখিস! ওই নাটক নভেল আর সিনেমা এই থেকেই তো দেশ ধ্বংস হতে চলেছে!
কে বললে তোমায় এ কথাটা?
বলবে আবার কে? চন্দন গভীর আত্মস্থ গলায় বলে, চোখ নেই দুটা? দেখতে পাচ্ছি না? কী ছিল সমাজ, আর কী হয়ে উঠেছে?
খারাপ হয়ে উঠেছে কিছু?
খারাপ নয়? চন্দন গালে হাত দেয়, আজকাল যা হচ্ছে তা খারাপ নয়, ভালো হচ্ছে? এই যে মেয়েগুলো হুট হুট করে পৃথিবী পয়লট্ট করছে, এটা ভালো? এই তো আমার সেজমেয়ের ননদটা, বিয়ে হলো আর বরের সঙ্গে আমেরিকা চলে গেল, এটাকে তুই খুব ভালো বলিস?
বকুল হেসে ফেলে, খারাপই বা কী? নিজের বরের সঙ্গেই তো?
বাবা বাবা, তোর সঙ্গে কথা কওয়া ঝকমারি! তুইও অতি আধুনিক হয়ে গিয়েছিস! বর হলেই অমনি তাকে ট্যাকে পুরতে হবে? দুদিন সবুর কর! যেখানে বিয়ে হলো তাদের সঙ্গে একটু চেনাজানা কর! তা নয়, জগতে শুধু বরটি আর বৌটি। যেন জীবজন্তু, পাখী-পক্ষী। ত্রিভুবনে আর কেউ নেই, শুধু উনিটি আর আমিটি। তাও তো সেই জুটিটিও ভাঙছে, যখন ইচ্ছে তখন আর একটার সঙ্গে জোড় বেঁধে ভাঙা সংসার জুড়ে নিয়ে দিব্যি আবার সংসার করছে। তবে আর এতকাল ধরে পৃথিবীতে এতো বেদ পুরাণ শাত্তর পালা গড়া হলো কেন? এই রকম চললে মানুষ এরপর হয়তো গাছের ফল পাতা খাবে আর উলঙ্গ হয়ে বেড়াবে যা দেখছি!
বকুল এঁর মতবাদে চমৎকৃত হয়, আবার শঙ্কিতও হয়, এঁকে নিয়ে সারা রাত্তিরটা কাটাতে হবে বকুলকে! হয়তো মাত্র একটা রাত্তিরই নয়, একাধিক রাত্তির!
