অথবা একেবারে অব্যক্তও নয়। যখন জানা গেল বাপের নাকের সামনে দিয়ে সেই যে চটি পায়ে দিয়ে আচ্ছা তোমার আদেশ মনে রাখবো বলে বেরিয়ে গেল শম্পা, সেটাই তার শেষ যাওয়া–তখন তো বকুলকে নিয়েই পড়েছিল তার ছোড়দা ছোটবৌদি। এমন কি ভাইপো অপূর্ব এবং তস্য স্ত্রী-কন্যা পর্যন্ত।
নিজেই যখন খুব চিন্তিত বকুল, মেয়েটা কোথায় যেতে পারে ভেবে (কারণ বকুলের তো ওই যাত্রাকালীন ইতিহাসটা জানা ছিল না), তখন যে-ছোড়দা জীবনে কখনো তিনতলার এই ঘরটার ছায়াও মাড়ায় না সে একেবারে সস্ত্রীক উঠে এসে বলে উঠল, শ্রীমতী অনামিকা দেবীর মূল্যবান সময় একটু নষ্ট করতে এলাম!
অনামিকা দেবী!
বকুল একবার ছোড়দার মুখের দিকে তাকালো, তার মুখে এলো হঠাৎ পাগলামি শুরু করলে কেন? কিন্তু তা সে করলো না, সঙ্গে সঙ্গে অনামিকা দেবীই হয়ে গেল সে। স্রেফ বাইরের লোকের সঙ্গে কথা বলার মতো শান্ত ভঙ্গীতে বললো, বোস, কী বলবে বল।
নতুন করে বলার কিছু নেই, বললো পিছনে দাঁড়ানো অপূর্ব। ইতিপূর্বে অপূর্বকে কোনোদিন তার ছোট কাকার এমন কাছাকাছি দেখেছেন কিনা মনে করতে পারলেন না গাম্ভীর্যময়ী অনামিকা দেবী! সেই গাম্ভীর্যের অন্তরালে এক টুকরো ব্যঙ্গ হাসি খেলে গেল–ওঃ, পারিবারিক মানমর্যাদার প্রশ্ন যে! এ বাড়িতে যেটা বরাবর বাড়ির পুরুষদের মৈত্রীবন্ধনে বেঁধেছে। বাবার সঙ্গে বড়দার কোনোদিনই হৃদ্যতার বালাই ছিল না, কিন্তু বকুলের নির্মলদের বাড়িতে যাওয়া-আসার ব্যাপার নিয়ে পিতাপুত্রে রীতিমত একদল হয়েছিলেন।
অনামিকা অপুর্বর এই উত্তেজিত মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন শুধু, কিছু বললেন না। অপূর্ব বললো বাকি কথাটা–শম্পার ব্যাপার নিয়েই কথা হচ্ছে। তার ঠিকানাটা তো জানা দরকার।
অনামিকা খুব স্থিরভাবে বললেন, সেই ঠিকানাটা আমার খাতায় লেখা আছে, এইটাই কি তোমাদের ধারণা?
এবার ছোড়দা উত্তর দিলেন, সে ধারণাটা খুব অস্বাভাবিক নয় নিশ্চয়ই?
আমার তো খুবই অস্বাভাবিক ঠেকছে।
এটা হচ্ছে তোমার এড়িয়ে যাওয়া কথা বকুল, তোমার কাছেই ছিল তার সব কথা, সব গল্প।
এ কথাটা বললেন ছোট বৗদি।
অনামিকা দেবীর ভঙ্গীতেই মৃদু হাসলো বকুল, তোমাদের তো দেখছি ত্রিশক্তি সম্মেলন, একা কী পেরে উঠবো? তবে এটা তোমাদের বোধ হয় ভুলে যাবার কথা নয়, শম্পা কোনো পূর্বপরিকল্পিত ব্যবস্থায় বাক্সবিছানা বেঁধে নিয়ে চলে যায়নি। কথা বলতে বলতে জেদের মাথায় চলে গেছে, আমি অন্ততঃ যা শুনেছি তোমাদের কাছে। অতএব আমার পক্ষে ওর ঠিকানা জানার প্রশ্নই ওঠা অদ্ভুত বৈকি। ব্যবস্থা করে যদি যেতো, হয়তো আমায় জানিয়ে। যেতো।
হয়তো কেন নিশ্চয়ই, সব পরামর্শই তো তোমার সঙ্গে– ছোটবৌদি পুঞ্জীভূত ঝাল উদ্গীরণ করে বলেছিলেন, মা মুখ্যু, সেকেলে গাঁইয়া, পিসী বিদুষী, আধুনিকা, সভ্য–কাজেই মার চেয়ে পিসীর মানসম্মান বেশী হবে এটাই তো স্বাভাবিক। তবে এটাও বলবো–তুমি যদি সত্যিই ওর হিতৈষী হতে, তা হলে ওকে ওর ইষ্ট-অনিষ্ট বোঝাতে। তা তুমি করোনি, শুধু আহ্লাদ দিয়ে দিয়ে নিজের দলে টেনেছে।
দলে! অনামিকার মুখটা হঠাৎ খুব বেশী লাল দেখায়, তবু কথা তিনি খুব নিরুত্তেজ গলাতেই বলেন, আমার যে বিশেষ কোনো দল আছে, তা তো আমার নিজেরই জানা ছিল না ছোটবৌদি! তবে দল থাকলে দলে টানার চেষ্টা থাকাটাও স্বাভাবিক।
এটা ঝগড়া করবার সময় নয়, ছোড়দা গম্ভীর গলায় বলে উঠেছিলেন, একটা পারিবারিক সুনাম-দুর্নামের প্রশ্ন নিয়ে কথা হচ্ছে। তোমার যদি জানা থাকে বকুল তবে সেটা বলে ফেলাই উচিত, সে বারণ করলেও।
কিন্তু আমার উত্তর তো আগেই শুনে নিয়েছ ছোড়দা। ঠিকানা ঠিকঠাক করে যদি কোথাও যেতো শম্পা, তাহলে হয়তো আমাকেই দিয়ে যেত ঠিকানাটা কিন্তু ঘটনাটা তো তা নয়!
কিন্তু মা-বাপকে বাদ দিয়ে তোমাকেই বা দিতো কেন?
অনামিকা হেসে ফেলেছিলেন, এ ‘কেন’র উত্তর আমার জানা নেই ছোড়দা। মেয়েটা কাছে থাকলে তাকেই করা চলতো প্রশ্নটা।
প্রশ্রয় দিলেই সে সুয়ো হয়, ছোটবৌদি তীব্র গলায় বলেন, কাঁদের সঙ্গে মিশতো সে, সে খবর তো জানা আছে তোমার, সেইগুলোই না হয় বলো।
যাদের সঙ্গে মিশত, তাদের আকৃতি-প্রকৃতির পরিচয় সে মাঝে মাঝে আমায় দিতে আসতো। কিন্তু ঠিকানা? কই মনে তো পড়ছে না!
তা হলে তুমি বলতে চাও জলজ্যান্ত মেয়েটা কর্পূরের মতোন উপে যাবে, আর সেটাই মেনে নিতে হবে?
হঠাৎ ছোটবৌদির চোখ থেকে একঝলক জল গড়িয়ে পড়েছিল।
অনামিকা সেই দিকে তাকিয়ে দেখে আস্তে বকুলের কাঠামোয় ফিরে এসেছিলে, নম্রকোমল গলায় বলেছিলেন, আমি এই অদ্ভুতটা চাই, তা কেন ভাবছো ছোটবৌদি? সত্যিই বলছি আমি তোমাদের মতোই অন্ধকারে আছি।
সে কথা বলে তুমি নিশ্চিন্দি হয়ে উপন্যাস লিখতে বসতে পারো বকুল, আমরা পারি না।
ছোটবৌদির গলায় কাঠিন্য, কিন্তু চোখে এখনো জল। বকুলকে অতএব নম্র আর কোমলই থাকতে হয়। বলতেই হয়, সে তো সত্যি কথাই বৌদি। মা-বাপের মনপ্রাণের সঙ্গে আর কার তুলনা!
ছোড়দাও এবার কোমল হয়েছিলেন, বলেছিলেন, না, সে কথা হচ্ছে না, তুইও ওকে মা বাপের থেকে কম ভালবাসিস না, বরং বেশীই। আর সেইজন্যেই তোকে ব্যস্ত করতে আসা। মনে হচ্ছে খবরটবর যদি কিছু দেয় সেই উদ্ধত অহঙ্কারী নিষ্ঠুর মেয়েটা, তোর কাছেই দেবে। যদি দেয় সঙ্গে সঙ্গে জানাস।
