সেই দুর্মূল্য সময় থেকে কিছুটা বাজে খরচ করে, এবং রেলগাড়ি ভাড়া খরচ করে চন্দন হঠাৎ ভাইয়ের বাড়ি এলো কেন, এটা দুর্বোধ্য। মেয়েদের বিয়েতে ডাকে একটা নেমন্তন্ন পর পাঠানো ছাড়া আর তো কোন যোগাযোগই রাখে না। এরাও অবশ্য নয়। পত্রোত্তরে কিছু মনিঅর্ডার, ব্যস!
এসে দাঁড়িয়েই বিস্ময় আনন্দ এবং কৌতূহলের প্রশ্ন শিকেয় তুলে রেখে দিন আগে ট্যাক্সি থেকে নামানো জিনিসপত্রগুলো নিয়েই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে।
বাড়ির সবাই এখনো এক হাঁড়ির না ভিন্ন হাঁড়ির, এ প্রশ্ন তাকে উতলা করে তোলে। ভিন্ন হাঁড়ি হলে তো যা কিছু এনেছে যথা রাণাঘাটের বিখ্যাত কাঁচাগোলা এবং মানকচু, কচি ট্যাড়শ, সজনেডাঁটা, কাঁচা পেপে ইত্যাদি, সবই ভিন্ন ভিন্ন ভাগে ভাগ করতে হবে।
কিন্তু জিজ্ঞেস করাও তো কঠিন।
তবে কথার কৌশলেই জগৎ চলে এই ভরসা। চন্দন হাঁক দিয়ে বলে, কই গো গিন্নীরা, সবাই রান্নাঘরে নাকি? দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে দেখবে কোন্ দিক থেকে কে আসে।
খবরটা ইতিমধ্যেই রটে গিয়েছিল এবং সকলেই সচকিত হয়ে উঁকিবুকি দিচ্ছিল, উনি হঠাৎ কেন? অপ্রতিভ হবার কথা ওনারই, কিন্তু উনি অপ্রতিভ হবার মেয়ে নন, উনি ওঁর ঠাকুমা মুক্তকেশীর হাড়ে তৈরী। তাই উনি কোনোদিকে না তাকিয়ে সঙ্গের লোকটাকে নির্দেশ দিতে থাকেন, মাছটা উঠোনে রেখে ওই কলে হাত ধুয়ে তবে অন্য জিনিসে হাত দে। রোস রোস, টোপাকুলগুলো যেন চটকে ফেলিস নে। আচার তৈরি করেই আনবো ভেবেছিলাম, তা হুট করে আসা হয়ে গেল-সঙ্গী তো জোটে না সব সময়। ভাই-ভাজ তো আর ডাকবে না কখনো, তবু বাপের ভিটে মা-বাপের স্মৃতি একবার তো চোখেও দেখতে ইচ্ছে করে!… বড় পুকুরে জাল ফেলাতে পারলাম না এইটাই খেদ রয়ে গেল–হঠাৎ আসা তো। মেয়েটি কার? বিয়ে হয়নি দেখছি।..মাথায় ও কিসের খোঁপা রে? আমের টুকরি বসিয়ে তার ওপর চুড়ো বানিয়েছিস নাকি? এই এক বিটকেল ঢঙের খোঁপার ফ্যাশান হয়েছে বাবা। আমাদের রাণাঘাটেও কসুর নেই। যাদের পেটে ভাত জোটে না, তাদেরও মাথায় এতো বড়ো খোঁপা! …কানুর বৌকে দেখছি না যে? তারপর বকুল কোথায়? বই-লিখিয়ে বোন আমাদের? তার তো খুব নামডাক। রাণাঘাটেও কমতি নেই।…বকুল বাড়ি নেই? কোথায় গেছে?
অপূর্বর বৌ অলকা মুচকে হেসে বলে, কোথায় গেছেন তা আর কে জানতে যাচ্ছে?
ওমা সে কি! কোথায় যায় বলে যায় না? যতই মিটিং করুক আর লেকচার মারুক, মেয়েমানুষ বেরোবার সময় বাড়িতে বলে যাবে না?…স্বাধীন জেনানা হয়ে গেছেন বুঝি? আমার মেয়েরা তো নিত্যিই খবর-কাগজ এনে খুলে দেখায়, এই দেখো তোমার বোনের ছবি, মা এই দেখো তোমার বোনের নাম। তা আমি বলি, তোরা ওই অনামী দেবীকে দ্যাখ, তোরা গদগদ হ! আমার কাছে সেই চিরকেলে বোকা মুখচোরা বকুলই হচ্ছে বোন। মুখে একটা বাক্যি ছিল না, কেউ অন্যায় করে শাসন করলে বলতে জানতো না, শুধু শুধু বকছো কেন? আমি তো ও দোষটা করিনি! সেই বকুল লেকচার দিয়ে বেড়ায় শুনলে হাসি পায়। অবিশ্যি আমাদের তো বাবা অতি সকালে গলা টিপে বাড়ি থেকে বার করে দিয়ে খালাস হয়েছিলেন, পরে পারুল বকুলকে আধুনিক-টাধুনিক করে মানুষ করে থাকবেন। ছেলেদের তাই বলি, ওরে এক মায়েরই পেটের আমরা, তোদের মাকেও অতি সকালে গোয়ালে ঢুকিয়ে না দিলে, তোদের মাসির মতোই হতে পারতো!…তবে বাবা এও বলবো, বকুল একটা কীর্তি রাখা কাজ করেছে বিয়ে না করে। এ বংশের তিনকুলে কেউ আর দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত দেখাতে পারবে না। প্রথম প্রথম তো শ্বশুরবাড়িতে মুখ দেখাতে পারতাম না, বাপের বাড়ি আসা বন্ধই হয়ে গিয়েছিল ওই কারণে
অপূর্বর বৌ অলকা মৃদু হেসে বলে, সে সব তো ক্লাইভের আমলের কথা।
চন্দন মহোৎসাহে বলে, তোমাদের কাছে তাই আমাদের কাছে যেন এই সেদিন। সে যাক, মিষ্টিটা ঘরে তোলো গো কেউ, পিঁপড়ে ধরবে। কুলগুলো এইবেলা রোদে ফেললে হতো!
মানকচু, কাঁচা পেপে, টোপাকুল, কাতলা মাছ–সব কিছুর সঙ্গে বাড়ির প্রসঙ্গ মিশিয়ে মিশিয়ে একাই সব কথা কয়ে যায় চন্দন।
অলকা আর তার মা ঘরে ঢুকে হাসাহাসি করে বলে, আজব চীজ!
কানুর বৌ ঘরে বসেই কাকে বলে, ভাগ্যিস ওঁর বাপের বাড়ি আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল! না হলে হেসেই মারা যেতে হতো আমাদের। কিন্তু হঠাৎ এরকম আসার কারণটা কী বুঝতে পারছো?
কানু বলে, তাই ভাবছি।
এই মেজকর্তা মেজগিন্নী সাতে-পাঁচে থাকেন না, বাড়িতে যে ধরনের ঘটনাই ঘটুক তারা নির্লিপের ভূমিকা অভিনয় করে যান, তবু তারাও চন্দনের আগমন সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। সকলেরই এক চিন্তা-ইনি কেন হঠাৎ?
বকুল ফিরলো সন্ধ্যার পর।
দরজায় ছোট চাকরটা বসে ছিল, তাড়াতাড়ি বলে উলো, পিসিমা, আপনার একজন বোন এসেছেন বিদেশ থেকে।
বকুলের বুকটা আহ্লাদে ধক করে উঠলো, পারুলের ঝকঝকে মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো তার। পারুল ছাড়া আর কে? দিদি মানে তো পারুল!
সত্যি বলতে, চাঁপা চন্দনকে কোনোদিনই তার নিজের দিদি বলে মনেই হয় না। একে তো তার জ্ঞানের আগেই ওদের বিয়ে হয়ে গেছে, তাছাড়া ওলের সঙ্গে বকুল পারুলের মানসিক ব্যবধান আকাশ-পাতাল।
পারুলের আর্বিভাব আশায় বকুলের মনের ভারটা ভারী হাল্কা হয়ে গেল। হা, মনের ভার একটা ছিল বৈকি। শম্পা চলে যাওয়ার সব দোষটাই তো ছোড়দা ছোটবৌদি অব্যক্তভাবে তারই উপর চাপিয়ে বসে আছে।
