পারুল বোধ করি শেষের বিদায়-প্রার্থনায় শুনতে পায় না, তাই আস্তে বলে, এতো কথা তুই শিখলি কোথা থেকে?
কি জানি! হয়তো নিজের থেকেই। তবে মা বলে নাকি পিসিই আমার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। পিসির দৃষ্টান্তই আমার পরকাল ঝরঝরে করে দিয়েছে! অথছ দেখো, মিলটিল কিছুই নেই। পিসি জীবনভোর শুধু বানানো প্রেমের গল্পই লিখলো, সত্যি প্রেমের ধার ধারলো না কখনো, আর আমি তো সেই আট বছর বয়স থেকেই প্রেমে পড়ে আসছি।
চমৎকার! তা সবগুলোই বোধ হয় “সত্যি” প্রেম?
তৎকালীন অবস্থায় তাই মনে হয় বটে, তবে কী জানো, ধোপে টেকে না। দু-দশদিন একটু ভালোবাসা-ফালোবাসা হলেই ছোঁড়ারা অমনি ধরে নেয় বিয়ে হবে। দু’চক্ষের বিষ। শুধু ভালোবাসাটা বুঝি বেশ একটা মজার জিনিস নয়।
পারুল ঈষৎ গম্ভীর গলায় বলে, তা মজার বটে। তবে কথা হচ্ছে এটিকেই বা তাহলে দু’চক্ষের বিষ দেখলি না কেন? বিয়ের প্রশ্ন তুলেই তো বাপের সঙ্গে ঝগড়া!
শম্পাও হঠাৎ গম্ভীর গলায় বলে, এক্ষেত্রে ব্যাপার একটু আলাদা। এখানে ওই হতভাগাই বিয়ের বিপক্ষে। কেবলই বলে কিনা, সরে পড়ো বাবা, আমার দিক থেকে সরে পড়ো। তোমার বাবা কতো দামীটামী পাত্র ধরে এনে বিয়ে দিয়ে দেবে, আমি হতভাগা, চালচুলো নেই, চাকরির স্থিরতা নেই, বৌকে কী খাওয়াবো তার ঠিক নেই, আমার সঙ্গে দোস্তি করতে আসা কেন?…আমারও তাই রোখ চেপে গেছে
পারুল ওর দিকে তাকিয়ে আস্তে বলে, এ বিয়েতে সুখী হতে পারবি?
শম্পা অম্লানবদনে বলে, হতে বাধা কী? সুখী হওয়া-টওয়া তো স্রেফ নিজের হাতে। তবে যদি হতভাগা মরে-ফরে যায় সে আলাদা কথা।
বালাই ষাট! পারুল বলে, তোর মুখে কি কিছুই আটকায় না বাছা?
পিসিও তাই বলে। শম্পা চলে যায় হাসতে হাসতে।
অভাবনীয় একটা বৃহৎ ভার ঘাড়ে পড়া সত্ত্বেও খুব একটা ভালো-লাগা ভালো-লাগা ভাব আসে পারুলের।
১৮. বহু-বহুদিন পরে চন্দন এলো
বহু-বহুদিন পরে চন্দন এলো বাপের বাড়িতে। অথবা ভাইদের বাড়িতে।
আবির্ভাবটা অপ্রত্যাশিত।
স্বগত কর্তা প্রবোধকুমারের বড় মেয়ে চাপা বরং কদাচ কখনো এ বাড়িতে আসে, পাকা চুলের মাঝখানটায় সুগোল টাকের উপর বেশ খানিকটা সিঁদুর লেপে আর কপালের মাঝখানে বড় একটা সিঁদুর টিপ– পরে, ঢোলা সেমিজের ওপর চওড়াপাড় একটা শাড়ি জড়িয়ে প্রসাধিত হয়ে এসে পা ছড়িয়ে বসে। যতক্ষণ থাকে, নিজের হাঁটুর বাত, অম্বলশুল ও কর্তার হাঁপকাশ রক্ত আমাশা এবং খেকি মেজাজের গল্প করে, ভাই ভাই-বৌ এবং ভাইপো-বৌদের ওপর বিশ-পঁচিশ দফা নালিশ ঠুকে, বাঁধানোদাঁতের পাটি খুলে রেখে মাড়ি দিয়ে পাকলে পাকলে– সিঙ্গাড়া কচুরি সন্দেশ রসগোল্লা খেয়ে, বকুল সম্পর্কে কিছু তথ্য আর তার লেখা দু’চারটে বই সংগ্রহ করে চলে যায়। বকুলের সঙ্গে কোনোদিন দেখা হয়, কোনোদিন দেখা হয় না। দেখা হলে প্রত্যেকবারই নতুন করে একবার জিজ্ঞেস করে, তা নিজের অমন খাসা নামটা থাকতে এই একটা অনামা-বিনামা নামে বই লিখতে যাস কেন?
তারপর ফোকলা মুখে একগাল হেসে বলে, আমার দ্যাওরঝি ভাসুরপো-বউরা আর নাতনী ছুঁড়িটা তোর নাম করতে মরে যায়! এইসব বইটই ওদের জন্যেই নিয়ে যাওয়া। আমি বাবা সাতজন্মেও নাটক-নভেল পড়ি না। তা ওদেরই একশো কৌতূহল। তুই কেমন করে লিখিস, কেমন করে হাঁটিস চলিস, উঠিস বসিস, এই সব। আমি বলি, আরে বাবা, আমাদেরই বোন তো, যেমন আমরা, তেমনি। চারখানা পাও নেই, মাথায় দুটো সিংও নেই। তবে বে থা করলো না, গায়ে হাওয়া দিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিলো, তাই ডাঁটো আছে।..তা ছুঁড়িদের খুব ইচ্ছে বুঝলি তোর সঙ্গে দেখা করবার, মানে তোকে একবার দেখবার, আমিই আনি না।
বকুল মৃদু হেসে বলে, তা আনো না কেন?
চাপা হয়তো ফট করে দালানের কোণে, কি সিঁড়ির কোণে খানিকটা পানের পিচ ফেলে মুখ হালকা করে নিয়ে বলে, আনা মানেই তো আমার জ্বালা। তাদের জন্যে গাড়ি ভাড়া কারো, হাপিত্যেশী হয়ে বসে থাকো কতোক্ষণে সাজগোজ হবে, আবার ফেরার জন্যে তাগাদা থাকবে, অতো ভালো লাগে না। এ বাবা স্বাধীনভাবে এলাম, দু-দণ্ড বসলাম, মুখ খুলে সংসারের দুটো গল্পগাছা করলাম, চুকে গেল। ওদের তাই বলি, সেই অনামী দেবীকে দেখে তোদের কী চারখানা হাত গজাবে রে?…তা তখন বলে, বেশ তবে ওঁর বই নিয়ে এসো? দে বাবা দু’চারখানা বই-ই দে।
চাঁপাকে সুবর্ণলতার মেয়ে বলে মনেই হয় না।
ফেরার সময় বইয়ের প্যাকেট বাঁধতে বাঁধতে আর একটি কথাও বলে যায় চাঁপা, এখন তো নতুন আইনে মেয়েরাও বাপের সম্পত্তি পাচ্ছে, তা আমাদের কপালে আইনকানুন সব মিথ্যে, যে ঘাসজল সেই ঘাসজল! তুই তবু চালাকি করে বাবার বাড়িটা খুব ভোগ করে যাচ্ছিস!
বকুল মৃদু হাসে।
হাসিটা কি নিজের চালাকির মহিমায়?
চাঁপার ওই আসাটা দৈবাতের ঘটনা হলেও, তবু ঘটে কদাচ কদাচ।
কিন্তু চন্দন?
তার চেহারাটাই তো প্রায় ভুলে গেছে এ বাড়ির লোকেরা। অথচ এমন কিছু দূরে সে থাকে না। থাকে রাণাঘাটে।
তবু চন্দনের পায়ের ধুলো এ বাড়িতে দুর্লভ।
চন্দনের শ্বশুর রাণাঘাটের এক নামকরা উকিল ছিলেন, সেখানে তিনি প্রচুর বিষয় সম্পত্তি করে রেখে গিয়েছিলেন–জমিজমা বাগানপুকুর ধানচাল। চন্দনের স্বামী জীবদ্দশাকাল সেই ভাঙিয়ে খেয়েছেন। এখন চন্দনই তার মালিক! ছটা মেয়ে চন্দনের, ছেলে নেই, মেয়েদের প্রায় সব কটাই বিয়ে হয়ে গেছে। একটাই বুঝি আছে এখনও আইবুড়ো। তবু চন্দনের মরবার সময় নেই।
