তাই মনে হচ্ছে, অনামিকা হেসে ফেলে বলেন, কিন্তু যাই বলো নীরুদা, সরকারের অতোবড়ো একটা দায়িত্বের জোয়াল কাঁধে নিয়েও যে তুমি সাহিত্য নিয়ে এত ভেবেছো, চর্চা রেখেছে, এটা আশ্চর্যি! এমন কি এতো সব মুখস্থ-টুখস্থ রাখা—
চর্চা রাখতে দায় পড়েছ-, নীরুদা সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে অম্লান বদনে বলেন, তোর বৌদি বলে তাই শুনি। ও তো বলে-নাটক-নভেল গল্প-টল্প একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে যদি দেশের কিছু উন্নতি হয়! জিনিসপত্রগুলো কি? কতকগুলো বানানো কথা মাত্র, তাছাড়া আর কিছু? ওদের মেয়ে এদের ছেলের সঙ্গে প্রেম করলো, নয়তো এর বৌ ওর সঙ্গে পালিয়ে গেল, এই তো ব্যাপার! এই নিয়েই ফেনিয়ে ফেনিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে সাতশো পাতার বই, কুড়ি টাকা দাম, দশটা এডিশন, একটা ক্লাস ওয়ান অফিসারের থেকে বেশী আয় আজকাল নামকরা লেখকের! রাবিশ!
অনামিকার হঠাৎ মনে হয় গাত্রদাহটা বোধ হয় ওই আয়টাকে কেন্দ্র করেই এবং সহসা হাতের কাছে একটা ঘোরতর পাপীকে পেয়ে
চিন্তার ছেদ পড়লো।
সুদৃশ্য একটা ট্রে হাতে ঝাড়ন কাঁধে একটি ভৃত্যের আবির্ভাব ঘটলো। বলা বাহুল্য ট্রে-তে অনামিকার জন্য চা এবং টা!
নীরুদা একটু নড়েচড়ে বসলেন। একটু যেন অসহায়-অসহায় এবং অপ্রতিভ-অপ্রতিভ ‘গলায় বললেন, মেমসাহেব কোথায়?
ভৃত্যের গলায় কিন্তু গভীর আত্মস্থতা।
ঘরে আছেন। মাথা ধরেছে।
মাথা ধরেছে! এই সেরেছে!
নীরুদা চঞ্চল হয়ে ওঠেন, ওই একটি ব্যাধি সঙ্গের সাথী বেচারার। সনৎকাকা উদ্বিগ্ন গলায় বলেন, যা দিকিন দেগে তো একবার।
না, দেখবো আর কি, নীরুদার কণ্ঠস্বর স্খলিত, ও তো আছেই।
তারপর যেন জোর করেই নিজেকে চাঙ্গা করে নিয়ে বলেন, আচ্ছা বকুল, কাকাকে কেমন দেখছো বল?
ভালই তো।
তা এখন অবশ্য ভালই তো বলবে। যা অবস্থা হয়েছিল, আর যে ভাবে এই ভালর পর্যায়ে রাখা হয়েছে! কথা তো শুনতেই চাইতেন না। আর্গুমেন্টটা কী জানো? এতো সাবধানে সাবধানে নিজেকে জিইয়ে রেখে আরো কিছুদিন পৃথিবীতে থাকবার দরকারটা কী? বোঝ? শুনেছো এমন কথা? তোমার বইতে আছে এমন ক্যারেক্টার?
তাই নেই। অনামিকা ঈষৎ গভীর সুরে বলেন, সাধ্য কি যে এ ক্যারেক্টারকে আঁকি?
নীরুদা খোলা গলায় বলেন, অসাধ্য হবে না যদি আমার কাছে দু’দিন বসে ডিক্টেশান নাও। উঃ! তবে হ্যাঁ, একটি জায়গায় স্রেফ জব্দ।
এক ঝলক হাসিতে নীৰুদার মুখ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, বৌমাটির কাছে তার ট্যা-ফোঁটি চালাতে পারেন না। বললে তুমি বিশ্বাস করবে না বকুল, এখন কাকার আমার রাতদিন মা জননী ছাড়া
হঠাৎ কেমন যেন চাঞ্চল্য বোধ করেন নীরুদা। বোধ করি শিরঃপীড়াগ্রস্ত সেই বেচারীর পীড়ার কথা সহসা হৃদয়ে এসে ধাক্কা মারে।
উঠে পড়েন উনি। কই তুমি তো কিছুই খেলে না, স্যাণ্ডুইচটা অদ্ভুতঃ খাও বলেই শিথিল চরণে চটি টানতে টানতে এগিয়ে যান।
সনৎকাকা কয়েক সেকেণ্ড সেই দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু হেসে বলেন, ছেলেটার জন্যে দুঃখ হয়।
সে কী কাকা! অনামিকা গালে হাত দেন, নিজে তো উনি সুখের সাগরে ভাসছেন!
সেটাই তো আরো দুঃখের।
সনৎকাকার কথাটা কি ধাঁধা? না খুব সোজা? জলের মতো একেবারে?
যারা সুখের সাগরে ভাসছে, তাদের জন্যেই চিন্তাশীলদের যতো দুঃখ! তাদের দুঃখবোধ জাগিয়ে তুলে, সেই দুঃখ নিরাকরণের জন্য মাথা খোঁড়াখুঁড়ি!
কিন্তু
মনে মনে একটু হাসলেন অনামিকা, কিন্তু যারা জেগে ঘুমোয়? যারা জেনে বুঝে কৃত্রিমতার দেবতাকে পুজো দিয়ে চলে? আচ্ছা কেন দেয়? চামড়া উড়ে যাওয়া শুধু রক্ত-মাংসের চেহারাটা সহ্য করতে পারে না বলে? রূপ-রস-রং-জৌলুসহীন পৃথিবীটায় বাস করতে পারবে না বলে?
.
সনৎকাকার বাড়ি থেকে অনামিকাদের বাড়ির দূরত্ব নেহাৎ কম নয়, ট্যাক্সিতে বসে চিন্তাকে ছেড়ে দিয়ে যেন গভীরে তলিয়ে যান অনামিকা।
নীরুদা উঠে যাবার পর আরো কিছুক্ষণ বসেছিলেন সনৎকাকার কাছে, আরো কত কথা হয়েছে, সনৎকাকার হাসির সুরমাখা প্রশ্নটা যেন কানের পর্দায় লেগে রয়েছে এখনো–চোখ থেকে মুছে যায় যদি, সব রং সব অনুরাগ, শুধিতে কাহার ঋণ, কাটাতেই হবে দিন, ধরণীর অন্নজলে বাইয়া ভাগ।
সনৎকাকা কি কবিতা লেখেন?
আস্তে আস্তে নিজের ভেতর থেকে আর এক প্রশ্ন ওঠে। লেখা নিয়ে তো অনেক হাস্যকর কথা হলো, হাসলামও। কিন্তু নিজের জমার খাতায় অঙ্কটা কী? সত্যিই কি কিছু লিখেছি?
যে লেখা কেবলমাত্র নগদ বিদায় নিয়ে চলে যায় না, কিছু পাওনা রেখে যায়?
আমি কি সত্যি সত্যি কারো কথা বলতে পেরেছি? আমি কি সত্যকার জীবনের ছবি আঁকতে পেরেছি? নাকি নীরুদার ভাষায়, শুধু কতকগুলো কাল্পনিক চরিত্র খাড়া করে গল্প বানিয়েছি?
হয়তো অপস্রিয়মাণ সমাজজীবনের কিছু ছবি রয়ে গেল আমার খাতায়, কিন্তু যে সমাজজীবন বর্তমানের স্রোতে উত্তাল? মুহূর্তে মুহূর্তে যার রং বদলাচ্ছে, গড়ন বদলাচ্ছে? আমার অভিজ্ঞতায় কি ধরতে পারছি তাদের? না, পারছি না। তার কারণ, আজ আর সমাজের একটা গোটা চেহারা নেই, সে খণ্ড ছিন্ন টুকরো টুকরো! সেই টুকরোগুলো অসমান তীক্ষ্ণ, তাতে যতটা ধার আছে ততটা ভার নেই। আর যেন ওই তীক্ষ্ণতাটা অদূর ভবিষ্যতে ভোতা হয়ে যাবার সূচনা বহন করছে। তবু এখন যারা সেটা ধরতে পারছে, তারা সামাজের সেই ধারালো টুকরোগুলো তুলে নিয়ে আরো শান দিচ্ছে।
