মানুষের সম্পর্কে মর্যাদাবোধ নেই, শুধু ভাঙিয়ে খাবার মতো মানুষকে ভাঙিয়ে খাওয়ার চেষ্টাটা আছে প্রবল। আজকের দিনের সব থেকে বড় শিল্প বোধ করি মানুষ ভাঙিয়ে খাওয়ার শিল্প।
যদি অনামিকা নামের মানুষটাকে ভাঙিয়ে কিছুটা সুবিধে অর্জন করে নিতে পারা যায়, তবেই সেই অর্জনকারীরা অনামিকার অনুরক্ত ভক্ত বন্ধু। কিন্তু অনামিকা ভালই জানেন যে মুহূর্তে তিনি ওই ভাঙিয়ে খাওয়াটা বুঝতে পারছেন সেটা জানতে দেবেন, সেই মুহূর্তে সকলের সব ভক্তি নিশ্চিহ্ন।
আর নিজে যদি তিনি প্রত্যাশার পাত্র হাতে নিয়ে একবার বলে বসেন, আমায় তো অনেক ভাঙালে, এবার আমার জন্যে কিছু ভাঙো না, তা হলেই লজ্জায় ঘৃণায় দুঃখে ধিক্কারে বন্ধুরা সহস্র যোজন দূরে সরে যাবেন!
হ্যাঁ, এই পৃথিবী।
তুমি যদি বোকা হও, অবোধ হও, আত্মস্বার্থে উদাসীন হও, বন্ধুর গুণগুলি সম্পর্কে চক্ষুষ্মান আর দোষগুলি সম্পর্কে অন্ধ হও, তুমি যে পৃথিবীর সব কিছু ধরে ফেলতে পারছ, সেটা ধরতে না দাও, তবেই তোমার বন্ধুজন তোমার প্রতি সহৃদয়।
নচেৎ? হৃদয়বর্জিত!
এই তো এখনই দেখো, এই নীরুদা নামের বিজ্ঞ বয়স্ক এবং আপন প্রাক্তন পদমর্যাদা সম্বন্ধে যথেষ্ট অবহিত আত্মীয়টি, অনায়াসেই ইনি ছেলেমানুষের মতো ওজনহীন উক্তি করছেন, কিন্তু তার উক্তি যে ছেলেমানুষী ও কথা একবার উচ্চারণ করুন দিকি অনামিকা দেবী?
সঙ্গে সঙ্গেই যে উনি ভিন্ন মূর্তি ধারণ করবেন, তাতে সন্দেহ নাস্তি। যেমন করলেন ওঁর স্ত্রী। তিনি হয়তো শিরিষ কুসম সম অতি সুকুমার, ইনি হয়তো তার থেকে কিছুটা সহনশীল, কিন্তু কলসীর মধ্যে গোখরো আছেই।
অতএব হাস্যবদনে উপভোগ কর ওঁর ছেলেমানুষী! অতএব বলে ফেলো, ও বাবা, তোমার ওই বিরাট কর্মচক্রের ঘর্ঘর ধ্বনির মাঝখানেও এতো খবর পৌঁছেছে তোমার কাছে? অতো দূরে থেকে?
পৌঁছবে না?
নীরুদা খুব একটা উচ্চাঙ্গের রসিকতার হাসি হেসে বলে ওঠেন, মোর সুখ্যাতিতে তো কান পাতা নয়। যাক, তুমি যে ওই সব আধুনিক লেখকদের মতো অশ্লীল-অশ্লীল লেখা লেখো না এতেই আমাদের পক্ষে বাঁচোয়া।
অনামিকা মনে মনে হাসলেন। ভদ্রলোক হয়তো তাবৎ জীবনকাল উচ্চ রাজকর্মচারী হিসেবে যথেষ্ট কর্মদক্ষতা দেখিয়ে এসেছেন, হয়তো সূক্ষ্ম দর্শন ক্ষমতায় অধস্তনদের চোখে সর্ষেফুল এবং ঊধ্বতনদের চোখে নিস্কৃতির আলো ফুটিয়ে এসেছেন, কিন্তু সংসারক্ষেত্রে যে আর একজনের চোখ দিয়ে জগৎ দেখে আসছেন, তাতে সন্দেহ নেই।
এ একটা টাইপ। বশংবদ স্বামীর উদাহরণ।
যাক, কথাবার্তাগুলো কৌতুককর।
তাই হাসি-মুখে উত্তর দেন অনামিকা, আমি যে ওই সব মারাত্বক লেখা লিখি না সে কথা কে বললে তোমায়?
আহা ওটা আবার একটা বলবার মতো কথা নাকি? তুমি ওসব লিখতেই পারবে না। হাজার হোক ভদ্রঘরের মেয়ে তো? আমাদের ঘরের মেয়ে! কচি অমন কু হতে যাবে কেন?
তা বটে।
অনামিকা অমায়িক গলায় সায় দেয়, সে কথা সত্যি। তাছাড়া আমি তো আর আধুনিক নই।
বয়সের কথা বলছো? নীরুদা উদাত্ত গলায় বলেন, সেটা আর আজকাল মানছে কে? যতো রাজ্যের বুড়োরাও তো শিং ভেঙে বাছুরের দলে ঢুকছে শুনছি। কী এরা? সমাজের শত্রু নয়? হয়তো এরাই কলেজের প্রফেসর-ট্রফেসর, হয়তো সমাজের মাথার মণি, অথচ স্রেফ পয়সার লোভে কদর্য-কদর্য লিখে
কথাটার উপসংহারটা বেশ জুৎসই করবার জন্যেই বোধ হয় নীরুদা একবার দম নিলেন, সেই অবকাশে অনামিকা খুব নিরীহ গলায় প্রশ্ন করলেন, আর কার লেখা তোমার এতো কদর্য লাগে নীরুদা?
কার আর? নীরুদা সুপুরি একগালে দেওয়ার সুরে বলেন, কার নয়? একধার থেকে সবাইয়ের। আজকাল কোন্ লেখকটা সভ্যভব্য লেখা লিখছে? লিখবে কেন? আজকাল তো অসভ্য লেখাতেই পয়সা। তাই না? যে বই অসভ্যতার দায়ে কোর্টে উঠবে, সেই বইয়ের তো এডিশন হবে।
অনামিকা মৃদু হেসে বলেন, কোর্ট ওঠেনি, এমন বইয়েরও অনেক সংস্করণ হয়। হতে পারে। আমি তার খবর-টবর রাখি না।
ও তাই বুঝি! শুধু এইসব আধুনিক সাহিত্যই পড়ো বুঝি খুব?
পড়ি? আমি?
নীরুদা যেন আকাশ থেকে পড়েন, আমি ছোঁবো ওই নোংরা অপবিত্র দুর্গন্ধ বই? রাবিশ! মলাটও উল্টে দেখিনি কারুর। আমার হাতে আইন থাকলে এইসব লেখকদের একধার থেকে জেলে পুরতাম, বুঝলে? যাবজ্জীবন কারাদণ্ড! ইহজীবনে যাতে আর কলম না ধরতে পারে বাছাধনেরা।
উত্তর দেবার অনেক কথা ছিল অবশ্য, তবে সেটা তো অর্থহীন। সেই নিরর্থক চেষ্টায় গেলেন না অনামিকা, শুধু খুব একটা ভীতির ভান দেখিয়ে বললেন, ওরে বাবা! ভাগ্যিস নেই! তাই বেচারীরা খেয়ে পরে বেঁচে আছে।
যার চোখ দিয়ে জগৎ দেখেন নীরুদা, তার মতো অনুভূতির সূক্ষ্মতা যে অর্জন করে উঠতে পারেননি নীরুদা এটা ঠিক। তাই শ্লেষের সুরে বলেন, শুধু খেয়ে পরে, গাড়ি-বাড়ি করে নয়? অথচ চিরদিনই শুনে এসেছি সরস্বতীর সঙ্গে লক্ষ্মীর বিরোধ। মাইকেল পয়সার অভাবে বই বেচে খেয়েছেন, গোবিন্দদাস না কে যেন না খেয়ে মরেছেন! গানেও আছে, হায় মা যাহারা তোমার ভক্ত, নিঃস্ব কী গো মা তারাই তত! অথচ এখন?
এতক্ষণ কৌতুকের হাসি মুখে মাখিয়ে নিঃশব্দে এই আলাপ-আলোচনা শুনে যাচ্ছিলেন সনৎকাকা, এখন হঠাৎ একটু যোগ দিলেন। বললেন, আহা হবেই তো। এঁরা তো আর মা সরস্বতীর ভক্ত নয়, ভক্ত হচ্ছেন দুই সরস্বতীর, কাজেই লক্ষ্মীর সঙ্গে বিরোধ নেই। কী বলিস বকুল?
