তাহলে কি কলমকে এবার ছুটি দেবেন অনামিকা? বলবেন, তোমার ছুটোছুটি এবার শেষ হোক!
হয়তো অনামিকা দেবীর ভক্ত পাঠকের দল সেই অনুপস্থিতিতে হতাশ হবে, কিন্তু নতুন কিছু যদি তাদের দিতে না পারি, কী হবে পুরনো কথাকে নতুন মোড়কে সাজিয়ে?
গাড়ি একটা বাঁক নিল, সামান্য একটু নির্দেশ দিলেন চালককে, তারপর আবার ভাবলেন, কিন্তু সেই নতুন কথাটা কি? কেবলমাত্র নিষ্ঠুর হাতে সব কিছুর আবরণ উন্মোচন?
তা ছাড়া? তাছাড়া আর সবটাই তো পুরনো।
জীবন নিয়েই সাহিত্য, চরিত্র নিয়েই কল্পনা। আদ্যিকালেও যা ছিল, আজও কি তাই নেই? যেটা অন্যরকম সেটা তো পরিবেশ। সমাজে যখন যে পরিবেশ, তার খাঁজে খাজে ওই জীবনটাকে যেমন দেখতে পাওয়া যায়, সেটাই সাহিত্যের উপজীব্য। আজকের পরিবেশ যদি বাপছাড়া, পালছেঁড়া, হালভাঙা হয়, সাহিত্যই বা
না, না, বাঁ দিকে নয়, ডান দিকে– নির্দেশ দিলেন চালককে। তারপর শিথিল ভঙ্গী ত্যাগ করে উঠে বসলেন, এবার ঠিক জায়গায় নামতে হবে।
যে মনটাকে ছেড়ে দিচ্ছিলেন, তার দিকে তাকালেন, তারপর আস্তে বললেন, কিন্তু পরিবেশ সাহিত্যের উপর জয়ী হবে, না সাহিত্য পরিবেশের উপর? সাহিত্যের ভূমিকা কি পরাজিতের?
বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থেকে নামলেন, একটু চকিত হলেন, দরজার কাছে ছোড়দা দাঁড়িয়ে, দাঁড়িয়ে বড়দার ছেলেও।
ওরা এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কেন? অনামিকার দেরি দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে? সেটা তো অলীক কল্পনা! অনামিকার গতিবিধি নিয়ে কে মাথা ঘামায়? ব্যস্ত তেমন হলেন না, ভাবলেন নিশ্চয় সম্পূর্ণ অন্য কারণ। ধীরেসুস্থে মিটার দেখছিলেন, বড়দার ছেলে এগিয়ে এলো, দ্রুত প্রশ্ন করলো, শম্পার সঙ্গে দেখা হয়েছে?
শম্পার সঙ্গে!
হা হা, তোমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেছে?
ভাইপোর গলায় যেন একটা নিশ্চিত সন্দেহের সুর, যেন যে প্রশ্নটা করছে সেটার উত্তরটা তার অনুকূল হওয়ারই সম্ভাবনা।
অনামিকা বিস্ময় বোধ করলেন। বললেন, আমি তো তাকে সকালের পর আর দেখিইনি। কেন কী হয়েছে?
যা হবার তাই হয়েছে। বড় ভাইপো যেন পিসিকেই নস্যাৎ করার সুরে বলে ওঠে, কেটে পড়েছেন। সকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না তাকে।
১৬. জলের অপর নাম যে কেন জীবন
জলের অপর নাম যে কেন ‘জীবন’ এ কথা বোধ করি এমন করে উপলব্ধি করতে পারতো না পারুল যদি সে তার এই চন্দননগরের বাড়িটিতে একা এসে বাস না করতো, আর যদি না ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু চুপচাপ গঙ্গার জলের দিকে তাকিয়ে থেকে কাটাত।
এক গঙ্গার কতো রূপ, কতো রং, কতো রঙ্গ, কত বৈচিত্র্য! শুধু ঋতুতে ঋতুতেই নয়, দিনে রাত্রে, সকাল সন্ধ্যায়, প্রখর রৌদ্রের দুপুরে, ছায়া-ছায়া বিকেলে, শুক্লপক্ষে কৃষ্ণপক্ষে বদল হচ্ছে তার রঙের রূপের ভঙ্গিমার। এই অফুরন্ত বৈচিত্র্যের মধ্যে যেন অফুরন্ত জীবনের স্বাদ।
সেকালের তৈরি বাড়ি, ছোট হলেও ছোট নয়, একালের ফ্ল্যাটবাড়ির ছোটত্বের সঙ্গে তার ছোঁটত্বের তুলনাই হয় না। ফেলে ছড়িয়ে অনেকগুলো ঘর-বারান্দা, অকারণ অর্থহীন খানিকটা দালান, এই বাড়িতে শুধু একা পারুল তার নিতান্ত সংক্ষিপ্ত জীবনযাত্রার মধ্যে নিমজ্জিত, গলার সাড়া নেই কোথাও, নেই প্রাণের সাড়া।
তবু যেন পারুলকে ঘিরে এক অফুরন্ত প্রাণপ্রবাহ। নিঃসঙ্গ পারুল শুধু ওই জলের দিকে তাকিয়েই যেন অফুরন্ত সঙ্গের স্বাদ পায়, যেন অনন্ত প্রাণের স্পর্শ পায়।
পরিবর্তন মানেই তো জীবন, যা অনড় অচল অপরিবর্তিত, সেখানে জীবনের স্পন্দন কোথায়? অচলায়তনের মধ্যেই মৃত্যুর বাসা। জীবনই প্রতি মুহূর্তে রং বদলায়। তাই নদীপ্রবাহ জীবন-প্রবাহের প্রতীক। তবু নদীর ওই নিয়ত রূপবৈচিত্র্যের গভীরে যে একটি স্থির সত্তা আছে, পারুলের প্রকৃতির মধ্যে বুঝি আছে তার একাত্মতা। পাগল হয়ে সেই সত্তার গভীরে নিমগ্ন থেকে ওই রূপ-বৈচিত্র্যের মধ্য হতে আহরণ করে বাঁচার খোরাক, বাঁচার প্রেরণা।
অথচ পারুলের মত অবস্থায় অপর কোনো মেয়ে অনায়াসেই ভাবতে পারতো, আর কী সুখে বাঁচবো? ভাবতে, আর বেঁচে লাভ কী?
পারুল তা ভাবে না। নিঃসঙ্গ পারুল যেন তার জীবনের পাত্রখানি হাতে নিয়ে চেখে চেখে উপভোগ করে।
প্রতিটি দিনই যেন পারুলের কাছে একটি গভীর উপলব্ধির উপচার হাতে নিয়ে এসে দাঁড়ায়।
পারুল যে কেবলমাত্র সেই দীর্ঘদিন পূর্বে মৃত অমলবাবু নামের ভদ্রলোকটির স্ত্রী নয়, পারুল যে মোহনলাল এবং শোভনলাল নামক দু-দু’জন ক্লাস ওয়ান অফিসারের মা নয়, পারুল যে বহু আত্মীয়জনের মধ্যেকার একজন নয়, পারুল একটি সত্তার নাম, সেই কথাটাই অনুভব করে পারুল। আর তেমনি এক অনুভবের মুহূর্তে মাকে মনে পড়ে পারুলের।
আগে পারুল মাকে বুঝতে পারতো না। পারুল তার মার সদা উত্তেজিত স্বভাবপ্রকৃতির প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতে, পারুল তার মার ওই ডজনখানেক ছেলেমেয়ে বরদাস্ত করতে পারতো না। কিন্তু এখন পারুল যেন দর্শকের ভূমিকায় বসে মাকে দেখতে পায়।
পারুলের একটা নিঃশাস পড়ে। পারুল ভাবে মা যদি খুব অল্পবয়সে বিধবা হয়ে যেতো, তাহলে হয়তো মা বেঁচে যেতো।
হয়তো বকুলই পারুলকে এই দৃষ্টিটা দিয়েছে। বকুলই তার মার অপরিসীম নিরুপায়তার ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছে কাল্পনিক চরিত্রের মধ্যে দিয়ে। সেই অবরোধের অসহায় যুগে প্রায় সব বাঙালী মেয়ের জীবনেই তো বকুল-পারুলের মায়ের জীবনের ছায়ার প্রতিফলন।
