আর সেই মুহূর্তেই অনুভব করেন অনামিকা, সনৎকাকার কণ্ঠে অমন একটা অপরিচিত সুর শুনতে পেয়েছিলেন কেন?
ভাইপো-বৌ চলে যাবার পর সনৎকাকা মৃদু হেসে বলেন, বুদ্ধিমানের ধর্ম অ্যাডজাস্ট করে চলা, কী বলিস?
অনামিকা কিছু বলেন না, শুধু তাকিয়ে থাকেন ওঁর হাস্যরঞ্জিত মুখের দিকে।
কীরে, অমন করে হাঁদার মত তাকিয়ে আছিস কেন?
দেখছি!
কী দেখছিস?
কিছু না।
সনৎকাকা আর কিছু বলতেন হয়তো, হঠাৎ ঘরে ঢোকেন সনৎকাকার ভাইপো, যার পুরো নামটা জানাই নেই অনামিকার। নীরুদা বলেই জানেন।
নীরুদার পরনে গাঢ় রঙের সিল্কের লুঙ্গি, গায়ে একটা টেস্ গেঞ্জি, হাতে টোব্যাকোর টিন। স্ত্রীর সম্পূর্ণ বিপরীত ভঙ্গীতে একেবারে হৈ চৈ করতে করতে ঢোকেন তিনি, আরে আমাদের কী ভাগ্য! শ্রীমতী লেখিকা দেবীর আগমন! তারপর আছো কেমন? বাড়ির সব খবর কি? খুব তো লিখছো-টিখছে!
অনামিকা বলেন, একে একে জবাব দিই, কেমন? আছি ভালো, বাড়ির খবর ভালো, লিখছি অবশ্যই, তবে “খুব” কিনা জানি না।
জানো না কি! শুনতে পাই তুমি নাকি দারুণ পপুলার! মেয়েরা নাকি তোমার লেখার নামে পাগল!
অনামিকা হেসে ফেলে বলেন, মেয়েরা তো? মেয়েদের কথা বাদ দাও। ওরা কিসে না পাগল হয়?
তা যা বলেছে–, নীরুদা হো হো করে হেসে ওঠেন, খুব খাঁটি কথা। শাড়ি দেখলো তো পাগল, গহনা দেখলে তো পাগল, লোকের গাড়ি-বাড়ি দেখলো তো পাগল। সিনেমার নামে পাগল, খেলা দেখার নামে পাগল। বাজার করতে পাগল, বাপের বাড়ির নামে পাগল, এমন কি একটা উলের প্যাটার্নের জন্যও পাগল। তাছাড়া রাগে পাগল, সন্দেহে পাগল, অভিমানে পাগল, অহঙ্কারে পাগল, অপরের ওপর টেক্কা দেবার ব্যাপারে পাগল, মোট কথা নেচার ওদের আধাআধি পাগল করেই পাঠিয়েছে, বাকিটা ওরা নিজে নিজেই–
মেয়েদের তো তুমি অনেক স্টাডি করেছে নীরুদা? অনামিকা হাসেন, লিখলে তুমিও সাহিত্যে নাম করতে পারতে।
লিখলে?
নীরুদা উদাত্ত গলায় বলে ওঠেন, দরকার নেই আমার অমন নাম করার। দেশের ছেলেগুলোকে বখিয়ে সমাজকে উচ্ছন্ন দিয়ে জাতির সর্বনাশ করে নাম আর পয়সা করা হচ্ছে। এই সিনেমাগুলো হচ্ছে, কী থেকে এর উৎপত্তি? ওই তোমাদের সাহিত্য থেকেই তো? কী ঘটছে তা থেকে? ছেলেগুলো ওই থেকেই অসভ্যতা অভব্যতা খুনোখুনি রাহাজানি শিখছে না?
সনৎকাকা হেসে ফেলে বলে ওঠেন, শুনলি তো? এবার কী জবাব দিবি দে!
জবাব দেবার কিছু থাকলে তো? অনামিকা হাসলেন, জবাব দেয়া নেই, স্রেফ কাঠগড়ায় আসামী যখন। আর সিনেমার গল্পকেও যদি সাহিত্য বলে ধরতে হয়, তাহলে তো ফাঁসির আসামী!
বলে ফেলেই অনামিকা ঈষৎ ভীত হলেন, এর মুখেও সঙ্গে সঙ্গে কাঠের চাষ হবে না তো?
কিন্তু ভীতিটা অমূলক নীরুদা বরং আরো বীরদর্পে বলে ওঠেন, তা সাহিত্য নয় কেন? সাহিত্যিকদের লেখা গল্প-টল্পই যখন নেওয়া হচ্ছে।
তা বটে।
হুঁ বাবা! স্বীকার না করে উপায় আছে? নীলা কাকার সামনেই টোব্যাকোর টিন ঠুকে কুচো তামাক বার করে একটা সিগারেট বানাতে বানাতে বলেন, তা তোমার গল্প-টল্পও তো শুনেছি সিনেমা হয়, তাই না?
অনামিকা লক্ষ্য করলেন, নীরুদা আর তাকে ‘তুই’ করে কথা বলছেন না, অথচ আগে বলতেন। তুই ছাড়াই বলতেন না বরং। তার মানে এখন সমীহ করছেন। নাকি দীর্ঘদিন দূরে থাকার দূরত্ব? কিন্তু তাই কী হয়? কই সনৎকাকা তো তাকে ‘তুমি’ বলতে বসলেন না!
বেদনা অনুভব করলেন অনামিকা।
আত্মীয়জন সমীহ করছে, এটা পীড়াদায়ক। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই এটা ঘটতে দেখেন। পুরোনো সম্পর্কের সহজ ভঙ্গীটি যেন খুঁজে পান না। নেহাৎ যারা বাড়ির লোক তারাও কি মাঝে মাঝে এমন দূরত্ব দেখায় না? যেন বকুল নামের মেয়েটা অন্য নামের ছদ্মবেশ পরে অন্যরকম হয়ে গেছে।
অতএব তারাই বা অন্যরা হয়ে যাবে না কেন?
অথচ এই নামটার সম্পর্কে তাদের অনাগ্রহের শেষ নেই, জানবার ইচেছর লেশ নেই। শম্পা বাদে, বাড়ির আর সকলে অনামিকা দেবীর বহির্জীবন এবং কর্মকাণ্ড সম্পর্কে শুধু উদাসীনই নয়, যেন বিদ্বিষ্ট। তাদের কথার সুরে কণ্ঠস্বরের ভঙ্গীতে অনেক সময়ই মনে হয়, অনামিকা বুঝি স্রেফ সংসারকে ফাঁকি দেবার জন্যেই দিব্যি একটি ছুতো আবিষ্কার করে নিয়ে মনের সুখে স্বাধীনতা উপভোগ করছে। যেন বকুলের যেটি প্রাপ্য নয়, সেটি ওই কৌশলটি করে লুটে নিচ্ছে বকুল।
অনামিকা কি লিখছেন, কতো লিখছেন, কোথায় লিখছেন, এ ব্যাপারে কারো মাথাব্যথা নেই, অনামিকা যে বিনা পরিশ্রমে শুধু কাগজের উপর কতকগুলো আঁকিবুকি টেনে অনেকগুলো টাকা পেয়ে যান, সেইটা নিয়েই কোনো এক জায়গায় ব্যথা। সেই টাকার সুযোগ যারা গাছে–ষোলো ছেড়ে আঠারো আনা, তাদেরও।
না, অনামিকার দাদা-বৌদিরা হাত পেতে কোনো খরচা নেন না অনামিকার কাছ থেকে, কিন্তু অনামিকারই বা ওরা ছাড়া আর কে আছে? কোথায় করবেন খরচ? দূর সম্পর্কের দুঃস্থ আত্মীয়জন? হয়তো কিছুটা করতে হয় সেখানে, কিন্তু তাতে পরিতৃপ্তি কোথায়?
কিন্তু ওই রূঢ় রুক্ষ কথাটা থাক, অভিমানের আরো ক্ষেত্র আছে বৈকি। অনামিকার সাহিত্যের ব্যাপারে একেবারে বরফ শীতল হলেও, বাইরে অনামিকার অসাক্ষাতে যে ওরা অনামিকার নিতান্ত নিকটজন বলে পরিচিত হতে পরম উৎসাহ, সে তথ্য অনামিকার অবিদিত নেই।
হয়তো জীবন এই রকমই। এতে আহত হওয়াটাই নির্বুদ্ধিতা। অনামিকা যখন তার পরিচিত বন্ধু সমাজের দিকে তাকিয়ে দেখেন, তখন এই অনুভূতিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে–জীবন এই রকমই।
