সনৎকাকা আস্তে বলেন, বঙ্গভূমি সম্পর্কে একটা মোহ ছিল, সেটা তাহলে আর রাখবো লেছিস?
অমন জোরালো একটা রায় দিয়ে বসবো, এমন সাহস নেই কাকা! আমি তো নিজেই জানি না মোহটা একেবারে মুছে ফেলে দেবার মতো দুঃসময় সত্যিই এসেছে কিনা। তবে মাঝে মাঝে ভাবি, এইটাই কি চেয়েছিলাম আমরা? এইটাই কি আমাদের দীর্ঘদিনের তপস্যার পুরস্কার? বহু দুঃখ, বহু ক্লেশ সয়ে, এই দেবতাকেই জাগালাম আমরা আমাদের ধ্যানের মন্ত্র? তা যদি হয় তো সেটা সেই মন্ত্রেরই ত্রুটি।
তবে সেই কথাই বল্ জোর গলায়। তোরা সাহিত্যিকরা, কবিরা, শিল্পীরা, তোরাই তো বলবি। মানে তোরা বললেই লোকের কানে পৌঁছবে। আমাদের মত ফালতু লোকেরা একযোগে তারস্বরে চেঁচালেও কিছু হবে না। কি না!
অনামিকা হেসে ফেলেন, ওই আশী বছরের বৃদ্ধের এই একটা নেহাৎ ছেলেমানুষি ভঙ্গী। দেখে ভারী কৌতুক অনুভব করেন অনামিকা! হেসে বলেন, কারুর বলাতেই কিস্যু হবে না। সমাজের একটা নিজস্ব গতি আছে, যে গতিটা যাকে বলে দুরন্ত দুর্বার দুর্জয়। এবং তার নিজেরও জানা নেই গতির ছকটা কি। যতো দিন যাচ্ছে, ততই অনুভব করছি কাকা, গোটাতিনেক জিনিসকে অন্ততঃ পরিকল্পনা করে গড়ে তোলা যায় না। সে তিনটে হচ্ছে সমাজ, সাহিত্য এবং জীবন।
এই সেরেছে, মেয়েটা বলে কি! সনৎকাকা একটি বিস্ময়-আতঙ্কের ভঙ্গী করেন, বলিস কি রে! দুটো না হয় না পারা গেল, কিন্তু বাকিটা? সাহিত্যকে পরিকল্পনা মত গড়ে তোলা যায় না? সে তো নিজের হাতে।
আগে তাই ভাবতাম, অনামিকা আবার যেন অন্যমনা হয়ে যান, আগে তাই ধারণাই ছিল। ভাবতাম কলমটা তো লেখকের নিজের আয়ত্তে। কিন্তু ক্রমশই মনে হচ্ছে হয়তো ঠিক তা নয়। কোথাও কোনোখানে কারো একটি গভীর অভিপ্রায় আছে, সেই অভিপ্রায় অনুসারেই যা হবার হচ্ছে।
সর্বনাশ! তুই যে তত্ত্বকথায় চলে যাচ্ছিস। অর্থাৎ সকলই তোমারই ইচ্ছা ইচ্ছাময়ী তারা তুমি!
মাঝে মাঝে তাই মনে হয়। অনামিকা মৃদুস্বরে বলে চলেন, ইচ্ছাময়ী কি অনিবার্য যে নামই দেওয়া হোক, অদৃশ্য একটা শক্তিকে কি আপনি অস্বীকার করতে পারেন কাকা? কবিত্ব করে বললে, জীবনদেবতা। কবির কথাতেও এ কথা বলা হয়েছে, এ কী কৌতুক নিত্য নতুন ওগো কৌতুকময়ী, আমি যাহা চাই বলিবারে তাহা বলিতে দিতেছ কই?
সনৎকাকা মৃদু হেসে যোগ দেন, অন্তর মাঝে বসি অহরহ মুখ হতে তুমি ভাষা কেড়ে লহ, মোর কথা নিয়ে কি যে কথা কহ, এই তাহলে তোর বক্তব্য?
সব সময় না হলেও অনেক সময়ই। অন্তরদেবতাই বলুন, আর অনিবার্যই বলুন, একটা কিছু ঘটনা আছে। সে কোন্ ফাঁকে লেখকের কলমটাকে নিজের পকেটে পুরে ফেলে! সেই জন্যেই বলছিলাম, সাহিত্যের নিজের একটা গতি আছে। সভা ডেকে, আইন করে, অথবা নির্দিষ্ট কোনো ছক কেটে দিয়ে তাকে বিশেষ একটি গতিতে নিয়ন্ত্রিত করা যায় না। আমার তে অন্ততঃ তাই মনে হয়।
তার মানে তোর মতে যে যা লিখছে সবই ওই অদৃশ্য শক্তির ক্রীড়নক হয়ে?
কে কি করে জানি না কাকা, তবে আমি অনেক সময়ই অনুভব করি এটা।
সনৎকাকা মৃদু হাসেন, শুনতে পাই আরো একটা জোরালো শক্তিই নাকি তোদের আজকালের সাহিত্যের নিয়ন্ত্রক! তার শক্তির প্রভাবেই লেখকের কলম—
অনামিকা হেসে ফেলেন, শুনতে তো কিছু বাকি নেই দেখছি আপনার। কিন্তু যত দোষ নন্দঘোষ বললে চলবে কেন? এ ধাঁধ তো চিরকালের–পৃথিবীটা কার বশ?
আহা সে ধাঁধার উত্তর তো সকলেরই জানা। কিন্তু আমরা চাই কবি সাহিত্যিক শিল্পী, এঁরা সে পৃথিবীর বাইরের হবেন। অন্ততঃ সেটাই আমাদের ধারণার মধ্যে আছে।
তেমন হলে উত্তম। কিন্তু তেমন ধারণার কি সত্যিই কোনো কারণ আছে কাকা? সেকালেও মহা মহা কবিরা রাজসভার সভাকবি হতে পেলে কৃতার্থ হতেন। সেটাই তাদের পরম পাওয়ার মাপকাঠি ছিল। আর সেটা আশ্চর্যেরও নয়। পৃথিবীটা যেহেতু টাকার বশ, সেই হেতুই সব কিছুর মূল্য নির্ধারণ তো হয় ওই টাকার অঙ্ক দিয়েই নিজের প্রতি আস্থা আসারও তো ওইটাই মানদণ্ড! তার ওপর আবার সাহিত্য জিনিসটা আজকাল ধান চাল তুলো তিসির মত ব্যবসার একটি বিশেষ উপকরণ হয়ে উঠেছে। অতএব লেখকরাও টাকার অঙ্ক দিয়ে নিজের মূল্য নিরূপণ করতে অভ্যস্ত হবেন এ আর বিচিত্র কী? আর যে লেখা বেশী টাকা আনবে, সেই রকম লেখাকেই কলমে আনবার চেষ্টা করাটাও অতি স্বাভাবিক।
সনৎকাকা ঈষৎ উত্তেজিত গলায় বলেন, তার মানে তুইও ওই টাকার জন্যে লেখাটাকে সমর্থন করিস?
অনামিকা হেসে ফেলে বলেন, সমর্থনের কথা নয় কাকা, সমর্থনের কোনো প্রশ্নই নেই। আমি সেই অনিবার্যের কথাই বলছি। আমার ধারণায় এইটা হলে ওইটা হবেই। আপনি অবশ্যই জানেন, আজ এমন একটা অবস্থা দাঁড়িয়েছে, সমাজের প্রতিটি স্তরের লোক অর্থাৎ প্রতিটি সুযোগ-সন্ধানীই লেখকের কলম ভাঙিয়ে খাচ্ছে। লেখকের কলমই তো বিজ্ঞাপনের বাহন। কাগজের সম্পাদকরা এখন আর লেখক তৈরি করে তোলার দায়িত্বর ধার ধারেন না, ধার ধারেন শুধু সেই লেখকের যার লেখা থাকলে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন আসবে। অতএব প্রতিষ্ঠিত লেখকরা ক্রমশই তাদের ওই বিজ্ঞাপন সংগ্রহের কল হয়ে উঠছেন। আর তার অবশ্যম্ভাবী পরিণাম হিসেবে নতুনরা ওই দরবারে ঢোকবার পথ না পেয়ে লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে উৎকট রঙের উদ্ভট পোশাক গায়ে চাপিয়ে দরবারের দরজায় দাঁড়িয়ে অঙ্গভঙ্গী করে টিন পেটাচ্ছে। জানে এতে লোক জুটবেই। দরবারে ঢুকে পড়তে পারলে তখন দেখানো যাবে প্রতিভা।
