অনেকদিন পরে এসে দেখলেন অনামিকা দেবী সেই মাঠটায় বিরাটকলেবর একটি ম্যানসন উঠেছে। যাতে অজস্র খোপ। সেই খোপ খোপ কে জানে কতো পরিবার এসে বাসা বেঁধেছে। কে জানে এর মধ্যে থেকেই তারা জীবনের মানে খুঁজে পাচ্ছে কিনা।
তবে আপাততঃ চেনা বাড়িটাও খুঁজে পেতে দেরি হলো ওই বহুখোপবিশিষ্ট আকাশছোঁয়া বাড়িটার জন্যে। তারপর ঢুকে পড়লেন।
হৈ-চৈ করে উঠলেন না সনৎকাকা, খুব শান্ত সহৃদয় হাস্যে বললেন, আয়। তোর অপেক্ষাই করছিলাম।
প্রণাম করে বসে পড়ে ছেলেমানুষের মতো বলে উঠলেন অনামিকা দেবী, অপেক্ষা করছিলেন মানে? আসতে বলেছিলেন নাকি আমায়?
বলিনি? সে কী রে? না বললে এলি কেন? হাসলেন সনৎকাকা।
লজ্জিত হলেন অনামিকা দেবী। বললেন, তারপর, কেমন আছেন বলুন।
খুব ভালো। খাচ্ছি দাচ্ছি বাড়ি বসে আছি, খাটতে-টাটতে হচ্ছে না, এর থেকে আরামদায়ক অবস্থা আর কি হতে পারে?
অনামিকা অবশ্য এই আরামদায়ক অবস্থার খবরে বিশেষ উৎসাহিত হলেন না, বরং ঈষৎ শঙ্কিত গলায় বললেন, কেন, বসে আছেন কেন? বেরোন না?
বেরোবো? কেন? সনৎকাকা দরাজ গলায় হেসে উঠলেন, চলৎশক্তি জুন্মাবার জন্যে যদি একটা বছর লেগে থাকে, সেটা বাদ দিয়েই ধরছি, উনআশী বছর কাল ধরে তো হাঁটলাম বেরোলাম বেড়ালাম, বাকি দিনগুলো ঘরে বসে থাকাই বা মন্দ কি?
ওটা তো বাজে কথা, অনামিকা আরো শঙ্কিত গলায় বলেন, আসল কথাটা বলুন তো! শরীর ভাল নেই?
এই দ্যাখো! শরীর ভাল নেই মানে? ভাল না থাকলেই হলো?
তবে? তবে বাড়ি বসে থাকবেন কেন?
বাঃ, বললাম তো! জীবনের প্রত্যেকটি স্টেজই চেখে চেখে উপভোগ করা দরকার নয়? নীরুকে বললাম, দ্যাখ নীরু, এই হৃদযন্ত্রটা তো বহুকাল যাবৎ খেটে মরছে, এবার যদি ছুটি চায় তো চাক না, ছুটি নিতে দে। তা শুনতে রাজী নয়। ধরে নিয়ে এলো এক ব্যাটা ডাক্তারকে, মোটা ফী, সে তার পাণ্ডিত্য না দেখিয়ে ছাড়বে কেন? ব্যস হুকুম হয়ে গেল নট নড়নচড়ন নট কিচ্ছু। অতএব স্রেফ “গাব্বুপিল” হয়ে পড়ে আছি।
অনামিকা বুঝে নিলেন ব্যাপারটা। আস্তে বললেন, কতোদিন হয়েছে এরকম?
আরে বাবা, হয়নি তো কিছুই। তবে কী করে দিনের হিসেব দেবো? তবে তো কবে থেকে চুল পাকলো, কবে থেকে দাঁত নড়লো, এসব হিসেবও চেয়ে বসতে পারিস। একটা যন্ত্র বহুদিন খাটছে, একদিন তো সেটা বিকল হবেই, তাকে ঘষে মেজে আবার চাকায় জুড়ে দেবার চেষ্টা কি ঠিক? কিন্তু কী আর করা? কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। আপাততঃ যখন নীরুবাবুই কর্তা, তার ইচ্ছাই বলবৎ থাকুক।
নীরুদা বুঝি আবার কলকাতায় বদলি হয়ে এলেন?
বদলি? আরে না না। ও তো রিটায়ার করে দেশে এসে বসলো।
রিটায়ার করে। অনামিকা অবাক হয়ে বলেন, এখুনি?
এখুনি কি রে? সরকারী হিসেব কি ভুল হয়? যথাযথ সময়েই হয়েছে। আমরাই শুধু মনে রাখতে ভুলে যাই দিন এগিয়ে চলেছে।
তাহলে এখন এখানেই, মানে কলকাতাতেই থাকবেন?
তাছাড়া? সনৎকাকা আবার হাসেন, নীরুর সংসারের আবোল-তাবোল আসবাবপত্তরগুলোর সঙ্গে এই একটা অবান্তর বস্তুও থাকবে। যতদিন না–
হেসে থেমে গেলেন।
কলকাতায় এসে আর কোনো ডাক্তার দেখানো হয়েছে?
দ্যা বকুল, যে রেটে কেবলই মনে করিয়ে দিতে চেষ্টা করছিস–কাকা তুমি বুড়ো হয়েছে, কাকা তুমি রুগী হয়ে বসে আছে, তাতে তোকে আর নীরুকে তফাৎ করা শক্ত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গয় যবনিকাপাত কর। তোর কথা বল। খুব তো লিখছিস-টিখছিস। দিল্লীতেও নামডাক। নতুন কি লিখছিস বল?
নতুন কি লিখছি?
অনামিকা হাসলেন, কিছু না।
কিছু না? সে কী রে? এই যে শুনি এবেলা-ওবেলা বই বেরোচ্ছ তোর!
খবর তো যতো হাঁটে ততো বাড়ে! অনামিকা আর একটু হাসেন, নশো মাইল ছাড়িয়ে গিয়ে পৌঁছেছে তো খবরটা।
তার মানে, তুই বলছিস খবরটা আসলে খবরই নয়, স্রেফ বাজে গুজব। লিখছিস টিকছিস না!
লিখছি না তা বলতে পারি না, বললে বাজে কথা বলা হবে, তবে নতুন কিছু আর লিখছি কই?
কেন রে? সনৎকাকা একটু চাঙ্গা হয়ে উঠে বসে বলেন, সমাজে সংসারে এত নতুন ঘটনা ঘটছে রোজ রোজ, মুহূর্তে মুহূর্তে সমাজের চেহারা পাল্টাচ্ছে, তবু নতুন কথা লিখতে পারছিস না?
অনামিকা হঠাৎ যেন অন্যমনস্ক হয়ে যান, যেন নিজের সঙ্গে কথা বলেন, হয়তো এই জন্যেই পারছি না। রোজ রোজ যে নতুন নতুন ঘটনা ঘটছে তার হিসেব রাখতে পারছি না, মুহূর্তগুলোকে ধরে যেতে পারছি না, হারিয়ে যাচ্ছে, অন্য রকম হয়ে যাচ্ছে তারা।
ধরতে চেষ্টা করতে হবে, জোর দিয়ে যেন নির্দেশ দিলেন সনৎকাকা।
চেষ্টা করছি, হচ্ছে না। এই মুহূর্তগুলো তো স্থায়ী কিছু দিয়ে যাচ্ছে না, ওরা শুধু সাবানের ফেনার মতো রঙিন বুদবুদ কেটে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। আর একদিকে–, একটু যেন ভাবলেন অনামিকা দেবী, আর একদিকে কোথায় যেন চলছে ভয়ানক একটা ভাঙনের কাজ, তার থেকে ছিটকে আসা খোয়া পাথরের টুকরো, উড়ে আসা ধুলো গায়ে চোখে এসে লাগছে, কিন্তু সেই ভয়ানককেই বা ধরে নেব কী করে? তার সঙ্গে তো আমার প্রত্যক্ষের যোগ আছে, যোগ নেই নিকট অভিজ্ঞতায়। আধুনিক, না আধুনিক বলবো না, বলবো বর্তমান সমাজকে তবে আমি কলমের মধ্যে ভরে নেব কী করে? শুনতে পাই অবিশ্বাস্য রকমের সব নাম-না– জানা ভয়ানক প্রাণী জঙ্গল থেকে বেরিয়ে ঘরের মধ্যে এসে ঢুকে পড়ছে, ঘরের লোকের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে, এবং সেই প্রাণীরা তাদের নখ দাঁত শিঙ লুকোবারও চেষ্টা করছে না। বরং ওইগুলোই গৌরবের বস্তু ভেবে সমাজে দেখিয়ে বেড়াচ্ছে। আর ঘরের লোকেরাও তাই দেখে উঠে পড়ে লাগছে নখ দাঁত শিও গাবার কাজে। কিন্তু এ সমস্তই তো আমার শোনা কথা। শোনা কথা নিয়ে লিখতে চেষ্টা করাটা তে হাস্যকর কাকা। অথচ এও শুনতে পাই, ওদের কাছেই নাকি সাহিত্যের নতুন খোরাক, ওদের কাছেই সাহিত্যের নতুন কথা।
