অবস্থাটা তো বেশ মনোরম লাগছে রে!
কিন্তু কিছু বাড়িয়ে বলছি না কাকা। নতুন লেখকদের অনেক সংগ্রাম করে তবে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। অনেক নতুন ভঙ্গী, নতুন চমক লাগাতে না পারলে উপায় নেই। আর তারই অনিবার্য প্রতিক্রিয়াতে একবার প্রতিষ্ঠিত হয়ে বসতে পেলে আর কেউ খাটতে চায় না। আর নতুন কথা দেবার চিন্তা থাকে না, চিন্তা থাকে না কি বলবার জন্যে এসেছিলাম। ওই টিন পেটানোটাই যখন সহজ কার্যকরী, আর হাঙ্গামায় কাজ কি! তাছাড়া ওই জিনিসটার ওপর বিশেষ একটা আস্থাও থাকে। দেখেছে যখন ওইটাই দরবারের দরজা খোলার চাবি! আসল কথা কি জানেন কাকা, মননশীলতায় স্থির হতে পারার অবকাশও কেউ দিচ্ছে না শিল্পী সাহিত্যিককে, নির্জন থাকতে দিচ্ছে না। তার সেই স্থিরতার স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে পড়ে ভিড় বাড়াচ্ছে।
সনৎকাকা হেসে বলেন, তাতে আর আক্ষেপের কি? তোর মতে তো এ সবই অনিবার্যের হাতের পুতুল!
সেটাও ভুল নয়। তাছাড়া মুশকিল কি, ওই টিন পেটানোদের কাছে লোকে টিন পেটানোই চাইবে। যেমন কৌতুক অভিনেতার কাছে কৌতুক অভিনয় ছাড়া আর কিছু নয়। জীবনে। একবার যে ভাড়ামি করে মরেছে, জীবনে কখনো আর তার সীরিয়াস নায়ক হবার উপায় নেই।
তাহলে তো দেখছি তোদের এই সাহিত্যক্ষেত্রটাও দস্তুরমতো গোলমেলে!
দারুণ গোলমেলে কাকা। নিভৃত চিন্তায় নিমগ্ন হবার গভীর আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়ে উদ্ভ্রান্ত হয়ে বেড়াচ্ছে সবাই।
তোরও তাই অবস্থা নাকি? সনৎকাকা একটু কৌতুকের হাসি হাসেন।
আমার কথা বাদ দিন। অনামিকা বলে ওঠেন, লিখলেই “সাহিত্যিক” হয় না। নিজেকে অন্ততঃ আমি “সাহিত্যিক” শব্দটার অধিকারী ভাবিও না। লেখার অধিকার আছে কিনা একথা ভেবেচিন্তেই একদা লিখতে শুরু করেছিলাম, এখন দেখি পাঠকরাই অথবা সম্পাদকরাই লেখাচ্ছেন। এর বেশী কিছু নয়। তবে ইচ্ছে করে নতুন কিছু লিখি, বিশেষ কিছু লিখি, হেসে ওঠেন অনামিকা, তা সেই বিশেষের ক্ষমতা থাকলে তো? সত্যিই বলবো কাকা, এ যুগকে আমি চিনি না। চেনবার চেষ্টা করবো এমন পরিবেশও নেই। এ যুগ সম্পর্কে যেসব ভয়াবহ চিত্র শুনি অথবা পড়ি সেটা বিশ্বাস করতে পেরে উঠি না।
কিন্তু–, সনৎকাকা আস্তে বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই তো “বাস্তব” বস্তুটা কল্পনার থেকেও অবিশ্বাস্য!
হয়তো তাই। আবার যেন কেমন অন্যমনা হয়ে যান অনামিকা, তার সত্য সাক্ষী পুলিসের রিপোর্ট, ডাক্তারের রিপোর্ট। কিন্তু সাহিত্যিকও কি সেই সত্যেরই সাক্ষী হবে? সাহিত্যিকও কি এই সত্য উদঘাটনের কাজে কলম ধরবে? জানোয়ারের সঙ্গে মানুষের তফাৎ শুধু বাইরের চেহারাটায়! অন্য কোনো তফাৎ আছে কিনা সে সন্ধান না করেই হেসে বলে উঠবে, আরে বাবা থাক, তফাৎ থাকবে কেন? এখানেও রক্তমাংস, ওখানেও রক্তমাংস। রক্তমাংস ব্যতীত আর কোথায় কি?
এই প্রশ্নটাই আজকাল খুব প্রবল হয়েছে, তাই না রে?
খুব! হয়তো অনবরত ওইটা শুনতে শুনতে ওটাই বিশ্বাসের বস্তু হয়ে দাঁড়াবে।
সনৎকাকা দৃঢ়স্বরে বলেন, উঁহু, লোকে তো অনবরত নতুন কথা শুনতে চাইবে, এ কথা আর কতদিন নতুন থাকবে? মানুষ নামের জীবটা তো বাঘসিংহীর মতো অত বড়োও নয়, মাত্র সাড়ে তিন হাত দেহখানা নিয়ে তো তার কারবার! তার রক্তমাংস ফুরোতে কতক্ষণ?
সেই তো কথা। সেইটাই তো ভাবি। ওপরদিকে অনন্ত আকাশ, নিচের দিকে পা চাপালেই কায় পা। কোনটা সত্য?
না, যা বুঝছি তোর দ্বারা আর নতুন কথা লেখা হবে না! সনৎকাকা হাসেন।
হয়তো তাই। হাসেন অনামিকাও, অন্যমনস্কের হাসি। তারপর বলেন, মানুষের সংজ্ঞা যে শুধু জীব মাত্র, শিব শব্দটা যে অর্থহীন, এর প্রমাণ যখন এখনো স্পষ্ট পাইনি, তখন হবে নাই মনে হয়। তবে এটাও ঠিক কাকা, যা আমার অজানা, তা নিয়ে লিখতে গেলে পদে পদে ভুলই হবে সেটা জানি। আমার তো ভাবলে অবাক লাগে–
কথায় বাধা পড়ে।
সনৎকাকার ভাইপো-বৌ এসে দাঁড়ান। বলেন, ওষুধ খাওয়ার সময় হয়েছে কাকামণি।
কোমল মধুর কণ্ঠ। মায়ের আদর ভরা। মনে হলো যেন একটি শিশুর কাছে এসে কথা বললেন।
সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলেন অনামিকা, কারণ উত্তরে পরক্ষণেই সত্যসত্যই যেন একটি শিশুর কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন তিনি।
নাঃ, এই নির্ভুল হুঁশিয়ার মা-জননীটির কাছ থেকে বুড়ো ছেলেটার আর ছাড়ান-ছোড়ান নেই। দাও কোথায় কি ওষুধ আছে তোমার?
কে বললো কথাটা? সনৎকাকা? হ্যাঁ, তিনিই বটে।
অথচ অনামিকার কানে যেন ভয়ঙ্কর রকমের অপরিচিত লাগলো স্বরটা। স্বর, সুর, ভঙ্গী।
সর্বদা যারা সাজিয়ে গুছিয়ে ছেঁদো-ছেঁদো কথা বলে, ঠিক যেন তাদের মতো। অনামিকার খারাপ লাগলো, খুব খারাপ লাগলো, অথচ এমন কি আর ঘটেছে এতে খারাপ লাগার মত?
যে মহিলাটি তার একজন বৃদ্ধ গুরুজনকে স্নেহ-সমাদর জানাতে মহিমাময়ী মাতৃমূর্তিতে কাছে এসে দাঁড়িয়ে স্রেফ মায়ের গলাতেই জানালেন ওষুধ খাবার সময় হয়েছে, তার কণ্ঠস্বর সুরেলা, মুখশ্রী সুন্দর, সাজসজ্জা গ্রাম্যতা-বর্জিত, এবং সর্ব অবয়বে একটি মার্জিত রুচির ছাপ।
এঁর সঙ্গে কথা বলতে হলে তো ওই রকম গলাতেই বলা উচিত। মহিলাটি যদি তার পূজনীয় গুরুজনটির দ্বিতীয় শৈশবের কালের কথা স্মরণ করে তার সঙ্গে শিশুজনোচিত ব্যবহার করেন, গুরুজনটির কি শ্বশুরমোচিত ব্যবহার সঙ্গত?
তবু অনামিকার খারাপ লাগলো। সত্যিই খুব খারাপ।
