নিশ্চয় ভালো আছো এটা একটা কথা নাকি? মানে আছে এর? সনৎকাকার প্রবোধদা চটে লাল হয়ে গিয়েছিলেন, সব সময় মানুষ নিশ্চয় ভালো থাকে? এই যে আমি! ক’দিন ভাল থাকি?
আমাদের সকলের ইচ্ছের জোরে ভালো থাকবে, সেটাই প্রার্থনা।
বাজে কথা রাখো। এ সব হচ্ছে তোমাদের এ যুগের ফাঁকিবাজি। নিজে কেমন আছি এটুকু লিখতেও আলিস্যি।
সনৎকাকাকে তার প্রবোদা এ যুগের বলে চিহ্নিত করতেন। সেটা যেন কতদিন হয়ে গেল? সনৎকাকার বয়েসটাই বা কোথায় গিয়ে পৌঁছলো? অথচ তার প্রবোধদার অর্ধশতাব্দী পার হয়ে যাওয়া মেয়েটাও বলে, সনৎকাকাকে আমি বলি আধুনিক।
তার মানে সনৎকাকা হচ্ছেন সেই দলের, যারা চির-আধুনিক। সেই আধুনিক সনৎকাকা আজও তেমনি চিঠি লিখেছেন। যাতে ল্যাজামুড়ো নেই। আপন কুশলবার্তাও নেই। যেটাকে তিনি প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, ওটাকে কিছুতেই আলসা বলতে দিতে রাজী হবো না আমি। আমার ভালো থাকা মন্দ থাকার খবর আমি যেচে যেচে দিতে যাবো কেন? কার কাছে। সেটা দরকারী জানি আমি। যার দরকার সে নিজে জানতে চেয়ে চিঠি লিখবে। পোস্টকার্ডের দাম ওই দু’লাইনেই উসুল হয় বাবা!
পারুলও এইরকম চিঠি লেখে। হয়তো ওই কু-দৃষ্টান্তের ফল।
খামের চিঠিতে অবশ্য ব্যতিক্রম ঘটে সনৎকাকার। সেটার দাম শুধু উসুল করেই ছাড়েন না তিনি। উসুলের উপর বাড়তি মাশুল চাপিয়ে তবে ছাড়েন অনেক সময়ই। আর সেটারও ওই ল্যাজামুড়ো থাকে না বলেই অনেক সময় পত্র না বলে প্রবন্ধও বলা চলে। হয়তো কোনো একটা বিশেষ প্রসঙ্গ নিয়েই তার শুরু এবং শেষ।
তেমনি একখানা চিঠি দিল্লীতে ভাইপোর কাছে গিয়ে মাত্র একবারই লিখেছিলেন সনৎকাকা। দিল্লীর সমাজ নিয়ে যার শুরু এবং সারা। তবে এও লিখেছিলেন, এটা হচ্ছে প্রথম ছাপ, অর্থাৎ বিশুদ্ধ বাংলায় ফাস্ট ইম্প্রেশান, দেখি এখানে থাকতে থাকতে এদের মর্মের গভীরে প্রবেশ করতে পারি কিনা এবং ছাপ বদলায় কিনা।
কিন্তু সে চিঠি আর আসেনি তার। দিল্লীর সমাজের মর্মমূলে প্রবেশ করাটাই কি হয়নি তার এখনো? নাকি সেই প্রবেশের ছাপটা প্রকাশ করতে বসার উৎসাহ পাননি আর?
কিন্তু অনামিকাই কি খোঁজ করেছিলেন, কি ধরনের ছাপ পড়লো আপনার সনৎকাকা? আর জানিয়েছিলেন কি, আপনি কেমন আছেন সেটা জানা আমার কাছে খুব দরকারী? না! হয়ে ওঠেনি।
ভাইপোর কাছেই শেষ জীবনটা থাকতে হবে, এই অনিবার্যকে মেনে নিয়েই থাকতে গিয়েছিলেন সনৎকাকা। কারণ লোকজন চরিয়ে একা সংসার করার মতো বয়েস যে আর নেই অথবা থাকবে না, এটা উপলব্ধি করে ফেলেছিলেন। আর তা না পারলে শেষ গতি তো ওই ভাইপো আর ভাইপো-বৌ। নিজের স্ত্রীটি এমন অতীতকালে তাকে ছেড়ে গেছেন যে এখন আর বোধ করি মনেও পড়ে না–একদা তিনি ছিলেন। একালের পরিচিত সমাজ অনেকেই সনং ব্যানার্জিকে চিরকুমার বলেই জানে!
অনামিকা ওঁর স্ত্রীকে একবার মাত্র দেখেছিলেন। স্ত্রীকে নিয়ে কোথায় যেন বেড়াতে যাবার পথে একবার প্রবোধদার বাড়িতে নেমেছিলেন তিনি। প্রেমঘটিত বিবাহ বলে বৌভাতের ভোজ-টোজ তো হয়নি। তাই বিয়ের সময় কেউ বৌ দেখেনি।
.
অনামিকার মনে আছে, ওরা চলে গেলে প্রবোধচন্দ্র বলেছিলেন, এই বৌ? রোগাপটকা কেলে! কী দেখে মজলেন আমাদের সনৎবাবু! তাই বাড়ুয্যে হায় ঘোষালের গরে মাথা মুড়োতে গেলেন! ছ্যাঃ!
যাক সেই অতীত ইতিহাস নিয়ে আর কেউ চিন্তা করে না। ধরেই নিয়েছে সবাই, লোকটা এতোদিন স্বাধীনভাবে একা থাকলেও, এবার ওকে পরাধীন হতে হবে। আর সেই সূত্রে বাংলা বিহার উড়িষ্যা মধ্যপ্রদেশ, এক কথায় ভারতবর্ষের যে কোন প্রদেশেই হোক, শেষ জীবনটা কাটাতে হবে। অতএব বহুদিনই সনৎকাকা বাংলা দেশ ছাড়া।
এতদিন পরে যে হঠাৎ এলেন, সে কি কোনো বিশেষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্যে? সনৎকাকার সেই ভাইপোটি বদলি হয়ে আবার বাংলা দেশের কোনো চেয়ারে অধিষ্ঠিত হতে এলেন? তার সঙ্গে লটবহরের মত সনৎকাকাও?
অনামিকাকে উনি এ ইঙ্গিতের কণামাত্রও দেননি যে তুমি এসো অথবা তোমায় দেখতে ইচ্ছে করছে।
তবু অভিমানের কোনো প্রশ্ন নেই।
এসো শব্দটি ব্যবহার না করলেও অনামিকা দেবী যে সেখানে সর্বদাই স্বাগত এ কথা অনামিকা যতটা জানেন, ততটা বোধ করি সনৎ ব্যানার্জি নিজেও জানেন না…ওই চিঠিটাই তো এসো!
সেই একটি অনুক্ত এসো শব্দটি অনামিকাকে টেনে বার করলো ঘর থেকে।
বেরোবার সময় আশা অথবা আশঙ্কা করছিলেন, দুষ্ট মেয়েটা কোন্ ফাঁক থেকে এসে জেরা করতে শুরু করবে, এ কি শ্রীমতী লেখিকা দেবী, নিজে নিজে ট্যাক্সি ডেকে বেরোনো হচ্ছে যে? রথ আসেনি তোমার? পুষ্পমাল্য ভূষিত করে সভার শোভাবর্ধন করতে বসিয়ে রাখবার জন্যে?
না, মেয়েটাকে ধারেকাছে কোথাও দেখতে পেলেন না। নির্ঘাত সেই কারখানার কুলিটার সঙ্গে কোথাও ঘুরছে, নচেৎ আর কোথা? আজ তো কলেজের ছুটি।
বাড়ি জানা ছিল, তবু খুঁজে বার করতে কিছু দেরি হয়ে গেল। রাস্তার চেহারাটা একেবারে বদলে গেছে। অনেক দিন যে আসা হয়নি সেটা ধরা পড়লো ওই চেহারাটা দেখে।
মাঝারি একটা গলির মধ্যে পৈতৃক বাড়ি সনৎকাকাদের, সেই গলির মোড়ে অনেকখানিটা জমি পড়ে ছিল বহুকাল যাবৎ। সেটা ছিল পাড়ার বালকবৃন্দের খেলার মাঠ এবং পাড়ার ঝিয়েদের ডাস্টবিন। কষ্ট করে আর কেউ ছাইপাশ-জঞ্জালগুলোকে নিয়ে রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে কর্পোরেশনের ডাস্টবিনে ফেলতে যেতো না, ওই মাঠেই ফেলতো। তাতে যে ছেলেদের খেলার আমোদ কিছুমাত্র ব্যাহত হতো এমন নয়, শুধু খেলার শেষে বাড়ি ফেরার পর মা-ঠাকুমার জামাকাপড় ছাড়, পা ধুয়ে ফেল ইত্যাদি চিৎকারে তাদের শান্তিটা কিঞ্চিৎ বিঘ্নিত করতো।
