হাসতে হাসতে বলে, তুমি ঠিক যেন সেই সেকালের রাজরাজড়াদের মত কথা বললে বাবা! যাঁরা আজ যাকে কেটে রক্তদর্শন করতেন, কাল আবার তাকে ডেকে আনতে বলতেন! এইমাত্র তো হুকুম হয়ে গেল, এ বাড়িতে জায়গা হবে না, আবার এখুনি হুকুম হচ্ছে বাড়ি থেকে বেরোনো হবে না–অদ্ভুত!
হঠাৎ কী হয়ে যায়!
শম্পার বাবা কাণ্ডজ্ঞানশূন্যভাবে মেয়ের সেই চুড়ো করে বাধা খোঁপাটা ধরে সজোরে নাড়া দিয়ে বলে ওঠেন, ওঃ আবার বড় বড় কথা! আস্পদ্দার শেষ নেই তোমার। তোমাকে আমি চাবি-বন্ধ করে রেখে দেব তা জানো, পাজী মেয়ে।
শম্পা নিতান্ত শান্তভাবে খোঁপা থেকে ঝরে পড়া পিনগুলো গোছাতে গোছাতে বলে, পারবে না, খামোকা আমার কষ্ট করে বাধা খোঁপাটাই নষ্ট করে দিলে! যাক গে মরুক গে, আচ্ছা যাচ্ছি তাহলে!
বলে দিব্যি চটিটা পায়ে গলিয়ে টানতে টানতে বাবার সামনে দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। বাবার মুখ দিয়ে আর একটি কথাও বেরোয় না। হঠাৎ ওই চুলটা ধরার সঙ্গে সঙ্গেই কি নিজের ভুলটা চোখে পড়লো তার! মনে পড়ে গেল নিরুপায়তার পাত্র বদল হয়েছে!
তাই ওই চলে যাওয়ার দিকে স্তব্ধ-বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন? নাকি অধস্তনের ঔদ্ধত্য শক্তিহীন করে দিয়ে গেল তাকে?
হতে পারে।
চার টাকা মণের চালের ভাতে যাদের হাড়ের বনেদ, তাদের চিত্তজগৎ থেকে যে কিছুতেই ওই উধ্বতন-অধস্তন প্রভু-ভৃত্য গুরুজন-লঘুজন ইত্যাদি বিপরীতার্থক শব্দগুলো পুরনো অর্থ হারিয়ে বিপরীত অর্থবাহী হয়ে উঠতে চাইছে না! তাই না তাদের প্রতি পদে এত ভুল! যে ভুলের ফলে ক্রমাগত শক্তিহীনই হয়ে পড়ছে তারা!
অনিবার্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলেই তো শক্তির বৃথা অপচয়।
অনামিকা দেবী এসবের কিছুই জানতে পারেননি, অনামিকা তিনতলার ঘরে আপন পরিমণ্ডলে নিমগ্ন ছিলেন। ছোড়দার উচ্চ কণ্ঠস্বর যদিও বা একটু কানে এসে থাকে, সেটাকে গুরুত্ব দেননি। নানা কারণেই তো ওনার কণ্ঠস্বর মাঝে মাঝে উচ্চগ্রামে উঠে যায়, খবর নিতে গেলে দেখা যায় কারণটা নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর।
অতএব স্বরটা কান থেকে মনে প্রবেশ করেনি। কিন্তু ঘটনাটাকে কি সত্যিই একটা ভয়াবহ ঘটনা বলে মনে হয়েছিল শম্পার মা-বাপের! ওঁরা শুধু মেয়ের দুঃসহ স্পর্ধা দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন!
তার মানে নিজের সন্তানকে আজ পর্যন্ত চেনেননি ওঁরা।
কেই বা চেনে?
কে পারে চিনতে?
সব থেকে অপরিচিত যদি কেউ থাকে, সে হচ্ছে আপন সন্তান। যাকে নিশ্চিন্ত বিশ্বাসের মোড়ক দিয়ে মুড়ে রাখে মানুষ।
কাজেই সামান্য ওই কথা-কাটাকাটির সূত্রে কী ঘটে গেল, অনুধাবন করতে পারলেন না শম্পার মা-বাপ। ওঁরা ঠিক করলেন মেয়ে এলে কথা বলবেন না, বাক্যালাপ বন্ধই করে ফেলবেন।
অনামিকা দেবী লেখায় ইতি টেনে একটু টান-টান হয়ে বসলেন, আর তখনি চোখ পড়লো টেবিলের পাশের টুলটার ওপর, আজকের ডাকের চিঠিপত্রগুলো পড়ে রয়েছে।
বাচ্চা চাকরটা কখন যেন একবার ঢুকেছিল, রেখে গেছে। অনেকগুলো বইপত্তরের উপর একখানা পরিচিত হাতের লেখা পোস্টকার্ড।
১৫. পোস্টকার্ডখানার মাথার উপর
পোস্টকার্ডখানার মাথার উপর তারিখের নিচে লেখা ঠিকানাটা দেখে চোখটা যেন জুড়িয়ে গেল। আগ্রহে তুলে নিলেন সেটা, তুলে নিয়ে দ্রুত চোখ বুলিয়ে ফেললেন, তারপর আবার ধীরেসুস্থে পড়তে বসলেন।
অথচ অনামিকা দেবীর নামাঙ্কিত ওই পোস্টকার্ডটায় তো মাত্র দু’তিন ছত্র।
..অনেক দিন পরে কলকাতায় ফিরে তোমার কথাটাই সর্বাগ্রে মনে পড়লো, তাই একটা
চিঠি পোস্ট করে দিচ্ছি। নিশ্চয় ভালো আছ।
সনৎকাকা।
এই ধরন সনৎকাকার চিঠির।
গতানুগতিক পদ্ধতিতে স্নেহ-সম্বোধনান্তে শুরু করে আশীর্বাদান্তে ইতির পাট নেই সনৎকাকার। বাহুল্য কথাও নয়। ঝরঝরে তরতরে প্রয়োজনীয় কয়েকটি লাইন। কখনো বা পোস্টকার্ডের পুরো দিকটা সাদাই পড়ে থাকে, ও-পিঠের অর্ধাংশে থাকে ওই লাইন কটা।
একদা, অনামিকা দেবীর বাবা যখন বেঁচে ছিলেন, ওই চিঠির ব্যাখ্যা করে তীব্র আপত্তি তুলেছিলেন তিনি, এ আবার কি রকম চিঠি তোমার সনৎ? একে কি চিঠি বলে?
সনৎকাকা হেসে বলেছিলেন, চিঠি তো বলে না। বলে কার্ড। পোস্টকার্ড।
তাতে কি হয়েছে? লিখছো যখন সে চিঠিতে একটা যথাযোগ্য সম্পর্কের সম্বোধন থাকবে, কুশল প্রশ্ন থাকবে না, নিজে কেমন আছো এ খবর থাকবে না, প্রণাম আশীর্বাদ থাকবে না, মাথার ওপর একটা দেবদেবীর নাম থাকবে না, এ কেমন কথা? না না, এটা ঠিক নয়। এতে কু-দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়। তোমার দেখাদেখি অন্যেও এইরকম ল্যাজামুড়োহীন চিঠি লিখতে শিখবে।
শুনে কিন্তু সনৎকাকা কিছুমাত্র লজ্জিত না হয়ে বরং হেসেই উঠেছিলেন। বলেছিলেন, তা চিঠিটা তো আর টাটকা রুইমাছ নয় যে, ল্যাজামুড়ো বাদ গেলে লোকসান আছে! যথাযোগ্য সম্বোধন তো নামের মধ্যে রয়েছে। তোমায় লিখলে লিখবো প্রবোধদা, বোঝাই যাবে তুমি গুরুজন, বকুলকে লিখলে শুধু বকুলই লিখবো, অতএব বুঝতে আটকাবে না লঘুজন।
তা বলে একটা শ্রীচরণকমলেষু কি কল্যাণীয়াসু লিখবে না?
সেটা না লিখলেই কি বোঝা যায় না? সনৎকাকা বোধ করি তার প্রবোধদার এই তুচ্ছ কারণে উত্তেজিত হওয়াটা দেখে আমোদ পেয়েছিলেন, তাই হেসে হেসে বলে চলেছিলেন, ঘটা করে না বললেও বোঝা যায় ছোটদের আমরা সর্বদাই কল্যাণ কামনা করি, আশীর্বাদ করি। এবং বড়দেরও ভক্তিটক্তি প্রণাম-টণাম করে থাকি। কুশল প্রশ্ন তো থাকেই। নিশ্চয় ভালো আছে এটাই তো কুশল প্রশ্ন। অথবা কুশল প্রার্থনা।
