ওসব জায়গায় আরো একটা মস্ত সুবিধে, বাবার যত কেষ্ট-বিষ্টু শিষ্যরা তো সপরিবারেই এসে ধর্না দেন, ভালো ভালো পাত্র-পাত্রীরও সন্ধান পাওয়া যায় সেই সুযোগে। বাবা নিজেও নাকি কতো শিষ্য-শিষ্যার ছেলেমেয়ের বিয়ে ঘটিয়ে দিয়েছেন।
শম্পার মার অবিশ্যি এসব শোনা কথা। ব্যাপারটা একবার দেখে আসবার জন্যে যতোই কেন না কৌতূহল থাকুক, মান খুইয়ে ভাশুরপো-বৌকে তো গিয়ে বলতে পারেন না, তোমার গুরুর কাছে আমায় একবার নিয়ে চল!
আর বললেই যে নিয়ে যাবে, তারই বা নিশ্চয়তা কি? এই তো ওর নিজের শাশুড়ীই তো বলেছিল একদিন। সেখানে ভীষণ ভিড়, সেখানে আপনার কষ্ট হবে, আপনি ব্লাড-প্রেসারের রোগী–সংকীর্তনের আওয়াজে আপনার প্রেসার বেড়ে যাবে বলে কেমন এড়িয়ে গেল। সোজা তো নয় বৌটি, ঘুঘু! তবু নিজের মেয়েটিকে কেমন নিজের মনের মতোটি করে গড়তে পেরেছে। ভাগ্য, ভাগ্য, সবই ভাগ্য! শম্পার মার ভাগ্যেই সব উল্টো।
মেয়েকে নামতে দেখেই শম্পার মা আটকালেন, কোথায় না কোথায় সারাদিন ঘুরে বাড়ি এসেই তো পিসির মন্দিরে গিয়ে ওঠা হয়েছিল, বলি সেখানে কি ডানহাতের ব্যাপারটা আছে? নাকি পিসির মুখ দেখেই পেট ভরে গেছে?
শম্পা দাঁড়িয়ে পড়ে কঠিন গলায় বলে, আর কোনো কথা আছে তোমার?
আমার আবার কী কথা থাকবে। শম্পার মা-ও ধাতব গলায় বলে ওঠেন, যতোক্ষণ আমার হেফাজতে আছ, ঠিকসময় খেতে দেওয়ার ডিউটিটা তো পালন করতে হবে আমায়। দয়া করে কিছু খাবে চল!
আমার খিদে নেই।
খিদে নেই? ওঃ, পিসি বুঝি ঘরে কড়াপাকের সন্দেশের বাক্স বসিয়ে রেখেছিল ভাইঝির জন্যে!
শম্পা একটু তীক্ষ্ণ হাসি হেসে বলে, না, কড়াপাকটা পিসির ভাজেরই একচেটে!
ওঃ বটে! বড় তোর কথা হয়েছে! কবে যে তোকে ভিন্ন গোত্র করে দিয়ে হাড় জুড়বো—
শম্পা আর একটু হেসে বলে, ওটার জন্যে তুমি আর মাথা ঘামিও না মা। ওই গোত্র বদলের কাজটা আমি নিজেই করে নিতে পারবো।
কী বললি? কী বললি শুনি?
যা বলেছি তা একবারেই বুঝেছো মা। আবার শুনে কেন রাগ বাড়াবে! বলে শম্পা একটা পাক খেয়ে ঘরে ঢুকে যায়।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে শম্পার বাবা প্রায় তার নিজের বাবার গলায় মেয়েকে বলে ওঠেন, দাঁড়াও। তোমার সঙ্গে কথা আছে।
বাপের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়লো শম্পা।
শম্পার বাবার বোনের মতো ভীরু ভঙ্গীতে নয়, দাঁড়ালে নিজের ভঙ্গীতেই। যে ভঙ্গীতে ভীরুতা তো নয়ই, বরং আছে কিঞ্চিৎ অসহিষ্ণুতা। যেন ট্রেনের টিকিট কাটা আছে, যাবার সময় পার হয়ে যাচ্ছে, অতএব যা বলবে চটপট বলে নাও বাপু।
বাবা এই অসহনীয় ভঙ্গীটাকেও প্রায় সহ্য করে নিয়ে পাথুরে গলায় বলেন, ছেলেবেলা থেকেই তোমায় বার বার বলতে হয়েছে, তবু কোনোমতেই তোমায় বাধ্য বিনীত সভ্যতা জ্ঞানসম্পন্ন করে তোলা সম্ভব হয়নি! তুমি যে একটা ভদ্র বাড়ির মেয়ে, সেটা যেন খেয়ালেই রাখো না! কিন্তু মনে হচ্ছে সেটা এবার আমাকেই খেয়ালে রাখতে হবে। তোমার নামে অনেক কিছু রিপোর্ট পাচ্ছি কিছু দিন থেকে, এবং
কথার মাঝখানে বাবাকে তাজ্জব করে দিয়ে শম্পা টুক্ করে একটু হেসে ফেলে বলে, রিপোর্টারটি অবশ্যই আমাদের মা-জননী!
থামো! বাচালতা রাখে!
বাবা সেই তার নিজের ভুলে যাওয়া বাবার মতই গর্জে ওঠেন, আমি জানতে চাই সত্যবান দাস কে?
সত্যবান দাস১
শম্পা আকাশ থেকে পড়ে, সত্যবান দাস কে তা আমি কি করে জানব?
তুমি কি করে জানবে! ওঃ একটা গুণ ছিল না জানতাম, সেটাও হয়েছে তাহলে? মিথ্যে কথা বলতে শিখেছো? হবেই তো, যেমন সব বন্ধু-বান্ধব জুটছে। কলের মজুর, কারখানার কুলি
কারখানার কুলি! শম্পার মুখে হঠাৎ একচিলতে বিদ্যুৎ খেলে যায়।
জাম্বোর নাম যে আবার সত্যবান, তা তো ছাই মনেই থাকে না।
মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে হাসি লুকিয়ে বলে শম্পা, মিথ্যে কথা বলবার কিছু দরকার নেই, শুধু চট করে মনে পড়ছিল না। ডাকনামটাই মনে থাকে
ওঃ! শম্পার বাবা ফেটে পড়বার অবস্থাকেও আয়ত্তে এনে বলেন, ডাকনামে ডাকা টাকা চলছে তাহলে? কিন্তু আমি জানতে চাই কোন্ সাহসে তুমি একটা ছোটলোকের সঙ্গে মেশো?
শম্পা ফেরানো ঘাড় এদিকে ফিরিয়ে স্থির গলায় বলে, ছোট কাজ করলেই কেউ ছোট হয়ে যায় না বাবা!
থাক থাক, ওসব পচা পুরনো বুলি ঢের শুনেছি। আমি চাই না যে আমার মেয়ে একটা ইতরের সঙ্গে মেশে।
শম্পার সমস্ত চাপল্যের ভঙ্গী হঠাৎ একটা কঠিন রেখায় সীমায়িত হয়ে যায়। শম্পা তার বাবার চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বলে, তোমার চাওয়ার আর আমার চাওয়ার মধ্যে যদি মিল না থাকে বাবা!
যদি মিল না থাকে?
শম্পার বাবা এই দুঃসাহসের দিকে তাকিয়ে শেষ পর্যন্ত ফেটে পড়েন। বলে ওঠেন, তাহলে তোমার আর এ বাড়িতে জায়গা হবে না।
আচ্ছা, জানা রইল। শম্পা এবার আবার সেই আগের অসহিষ্ণু ভঙ্গীতে ফিরে আসে, আর কিছু বলবে? আমার একটু কাজ ছিল, বেরোতে হবে!
বেরোতে হবে? শম্পার বাবা ভুলে যান তিনি তার বাবার কালে আবদ্ধ নেই। শম্পার বাবার মনে পড়ে, এখন আর চার টাকা মণের চাল খান না তিনি, খান না আট আনা সেরের রুই মাছ। শম্পার বাবা তীব্র কণ্ঠে বলেন, এক পা বেরোনো হবে না তোমার। কলেজ ভিন্ন আর কোথাও যাবে না।
হঠাৎ বাবাকে থ করে দিয়ে ঝরঝরিয়ে হেসে ওঠে শম্পা।
