তবে আর অথচ কি? অনামিকা নির্লিপ্ত গলায় বলেন, ভেবে নে হঠাৎ একটা বোকামি করে ফেলেছিলি, তার জন্য আবার কিসের দায়?
তাই বলছো?
শম্পা প্ৰায় অসহায়-অসহায় মুখে বলে, আমিও তো ভাবছি সে কথা, মানে ভাবতে চেষ্টা করছি, কিন্তু কী যে একটা অস্বস্তি পেয়ে বসেছে! কাপড়ে চোরকাঁটা বিধে থাকলে যেমন হয়, প্ৰায় সেই রকম যেন! দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু-
তাহলে জিনিসটা চোরকাটাই। অনামিকা মুখ টিপে হেসে বলেন, চোরের কাঁটা। অলক্ষিত চোর চুপি চুপি সিঁদ কেটে—
পাগল! ক্ষেপেছো! শম্পা হৈ-চৈ করে ওঠে, তুমি ভাবছো এই অবকাশে আমার মধ্যে ঠাকুর ঢুকে বসে আছে? মাথা খারাপ! তবে আর কি, ওই অস্বস্তিটার জন্যই ভাবছিলাম-তুমি দিয়ে দিতে পারবে না?
দিয়ে দিতে? কী দিয়ে দিতে?
আহা বুঝছে না যেন! ন্যাকা সেজে কী হবে শুনি? ওই কিছু পুজোফুজো দিয়ে দিলেই–মানে সত্যরক্ষা আর কী! প্ৰতিজ্ঞাটা পালন করা দরকার।
অনামিকা ক্ষুব্ধ গলায় বলেন, কার কাছে প্ৰতিজ্ঞা? যাকে বিশ্বাস করিস না তার কাছে তো? সেখানে আবার সত্যরক্ষা কি? অনায়াসেই তো ভাবতে পারিস, দেব না, বয়ে গেল! ঠাকুর না হাতি!
চেষ্টা-করেছি—, শম্পা আরো একটু অপ্রতিভ হাসি হেসে বলে, সুবিধে হচ্ছে না। ও তুমি যা হয় একটা করে দিও বাবা।
আমি? আমি কী করে দেব?
আঃ বললাম তো, ওই পুজোটুজো যা হোক কিছু। তোমার কাছ থেকে টাকা নিয়েই তো দিতে হতো।
অনামিকা কৌতুকের হাসি গোপন করে বলেন, সে আলাদা কথা। কিন্তু তুই কোন ঠাকুরের কাছে পুজো কবলালি, আমি তার কী জানি?
কোন ঠাকুর! শম্পা আবার আকাশ থেকে পড়ে, ঠাকুর আবার কোন ঠাকুর? এমনি ঠাকুর!
আহা, কোনো একটা মূর্তি তো ভেবেছিলি? কালী কি কেষ্ট, দুর্গা কি শিব-
না পিসি, ওসব কিছু ভাবি-টাবিনি। শম্পা এবার ধাতস্থ গলায় বলে, এমনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে মরেছি। মানে ওর টেম্পারেচারটাও যতো ওপর দিকে উঠে চলেছে, আমার চোখও তো ততো ওপর দিকে এগোচ্ছে। জ্বর যখন একশো ছয় ছড়িয়ে আরো চার পয়েন্ট, আমার চোখও তখন স্রেফ চড়কগাছ ছাড়িয়ে আকাশে। মূর্তি-টুর্তি কিছু ভাবিনি, শুধু ওই আকাশটাকেই বলেছি, ছোঁড়াটা তোমার এমন কী কাজে লাগবে বাপু যে টানাটানি শুরু করেছো? তোমার ওখানে তো অনেক তারা আছে, আরো একটা বাড়িয়ে তোমার লাভ কী? হঠাৎ জোরে হেসে ওঠে শম্পা, দেখেছো পিসি, কুসংস্কারের কী শক্তি? যেই না বিপদে পড়া, অমনি স্রেফ ছেলেমানুষের মতো ভাবতে শুরু করা-মৃত্যুর দূত আকাশ থেকে নেমে আসে, মরে গেলে মানুষরা সব আকাশের নক্ষত্র হয়ে যায়। এসব হচ্ছে ভুল শিক্ষার কুফল! …যাচ্চলে, ঘুমিয়েই পড়লে যে! বাবা তোমার আবার কবে থেকে আমার মাতৃদেবীর মতো ঘুমের বহর বাড়লো? মা তো-থাক বাবা, ঘুমোও। রাত জেগে জেগে লিখেই বুড়ী মলো!
নেমে যায় শম্পা।
বোজা চোখেই অনুভব করেন অনামিকা।
আর সেই মুদ্রিত পল্লবের নীচটা ভয়ানক যেন জ্বালা করতে থাকে।
ঠিক সেই সময় চোখ জ্বালা করছিল আর একজনের। সে চোখ শম্পার মা রমলার। তার মেয়ে যে কেবলই কেবলই তাকে ছাড়িয়ে, অথবা সত্যি বলতে তাকে এড়িয়ে কেবলই গুণবতী পিসির কাছে ছুটবে, এটা তার চক্ষুসুখকর হতেই পারে না। অথচ করারও কিছু নেই। শ্বশুর ঠাকুর বাড়িটি রেখে গেছেন, কিন্তু উঠানের মাঝখানে একটি বিষবৃক্ষ পুঁতে রেখে গেছেন।
হতে পারে ননদিনীটি তার পরম গুণাবতী, তার নিজেরই বোনেরা, ভাজেরা, ভাজের বোনেরা এবং বোনেদের জা ননদ ভাগ্নী ভাসুরঝি ইত্যাদি পরিচিতকুল সকলেই যে ওই গুণবতীর ভক্ত, তাও জানতে বাকী নেই শম্পার মার, এমন কি তিনি অনামিকা দেবীর সঙ্গে একই বাড়িতে বাস করার মতো পরম সৌভাগের অধিকারিণী বলে অনেকে ঈর্ষার ভানও করে থাকে, কিন্তু নিজে ত তিনি জানেন সর্বদাই হাড় জ্বলে যায় তার ননদিনীর বোল-বোলাও দেখে।
এদিকে তো ইউনিভার্সিটির ছাপও নেই একটা, অথচ বড় বড় পণ্ডিতজনেরা পর্যন্ত মান্য করে কথা বলতে আসে, খোসামোদ কয়ে ডেকে ডেকে নিয়ে যায় সভার শোভাবর্ধন করতে, এটা কি অসহ্যের পর্যায়ে পড়বার মতো নয়?
যাক গো মরুক গে, থাকুন না হয় আপন মান যশ অর্থ প্রতিষ্ঠার উচ্চ মঞ্চে বসে, শম্পার মার মেয়েটা কেন ওঁর পায়ে পায়ে ঘুরতে যায়? মেয়েকে যে তিনি হাতের মুঠোয় পুরে রাখতে পারলেন না, তার কারণ তো ওই গুণবতীটি!
না। সত্যি, সংসারের মধ্যে যদি কোনো একজন বিশেষ গুণসম্পন্ন হয়ে বসে, সে সংসারের অপর ব্যক্তিদের জ্বালার শেষ নেই। শুধু চোখই নয়, অহরহ সর্বাঙ্গ জ্বালা করে তাদের। প্রতিভা-ট্ৰতিভা ওসব দূর থেকেই দেখতে ভালো, কাছের লোকের থাকায় কোনো সুখ নেই। তা সংসারের কোনো একজন যদি সাধু-সন্ন্যাসীও হয় তাহলেও। আত্মজনের ভক্তজন এসে জুটলেই বাড়ির লোকের বিষ লাগতে বাধ্য।
অতএব শম্পার মাকে দোষ দেওয়া যায় না।
তবু পুরুষমানুষ হলেও বা সহ্য হয়, এ আবার মেয়েমানুষ!
তাছাড়া শম্পার মার কপালে ওই মেয়ের জ্বালা। বাড়িতে তো আরো মেয়ে আছে, আরো মেয়ে ছিল, যাদের বিয়ে হয়ে গেছে একে একে, কেউ তো তার ওই বেয়াড়া মেয়েটার মতো পিসিভক্ত নয়। আর বেয়াড়া যে হয়েছে সে তো শুধু ওই জন্যেই।
এই তো অলকা বৌমার মেয়ে, খুবই নাক-উঁচু ফ্যাশানি, মানুষকে যেন মানুষ বলে গণ্যই করে না, তবু দাখো তাকিয়ে, এই বয়সে মা-দিদিমাদের সঙ্গে গুরুদীক্ষা নিয়েছে। এদিকে যতই ফ্যাশান করুক আর নেচে বেড়াক, সপ্তাহে একদিন করে সেই আত্মাবাবার মঠে হাজিরা দিতে যাবেই যাবে। তবু তো একটা দিকেও উন্নতি হচ্ছে। তাছাড়া সেখানে —নাকি সমাজের যতো কেষ্ট-বিষ্টুরা এসে মাথা মুড়োন, কাজেই গুরুমন্ত্র বলে একটা লোকলজ্জাও নেই। কুলগুরুর কাছে দীক্ষা নেওয়ায় যে গ্রাম্যতা আছে, এদের কাছে দীক্ষা নেওয়ায় তো সেটা নেই। বরং ওতেই মানমর্যাদা, ওতেই আধুনিকতা।
