কী মুশকিল! মনে করার আবার হেতু থাকে?
থাকে বৈকি। কার্য থাকলেই কারণ থাকবে, এটা তো অবধারিত সত্য। দেখা সে কারণ।
ওরে বাবা, অতো চেপে ধরো না। ওরাই তো বলে।
দ্যাখ বিচ্ছু তোর ওই ওদের যদি কখনো এ প্রশ্নের উত্তর দিতে চাস তো বলিস আধুনিকতা আর উচ্ছৃঙ্খলতা এক বস্তু নয়। আর- অনামিকা দেবী একটু হাসলেন, আর আধুনিক শব্দটার বিশেষ একটা অর্থ আছে, ওটা বয়েস দিয়ে মাপা যায় না। একজন অশীতিপর বৃদ্ধও আধুনিক হতে পারেন, একজন কুড়ি বছরের তরুণ যুবকও প্রাচীন হতে পারে। ওটা মনোভঙ্গী। কেবলমাত্র বয়সের টিকিটখানা হাতে নিয়ে যারা নিজেদের আধুনিক …ভেবে গরবে গৌরবে স্ফীত হয়, তারা জানে না ও টিকিটটা প্রতিমুহূর্তে বাসি হয়ে যাচ্ছে, অকেজো হয়ে যাচ্ছে। কুড়ি বছরটা পচিশ বছরের দিকে তাকিয়ে অনুকম্পার হাসি হাসবে। আমি একজনকে জানি, আজ যার বয়েস আশীর কম নয়, তবু তাকেই আমি আমার জানা জগতের সকলের থেকে বেশী আধুনিক মনে করি।
জানি নে বাবা! শম্পা দুই হাত উল্টে বলে, তোমার সেই আশী বছরের আধুনিকটিকে দেখিয়ে দিও একদিন, দেখে চক্ষু সার্থক করা যাবে। তবে তোমার ওই উদয়নের নবকন্যা পড়ে কলেজের মেয়েরা তোমায় ফুলচন্দন দিচ্ছে এই খবরটা জানিয়ে দিলাম। লিলি তো বলছিল, ইচ্ছে হচ্ছে গিয়ে পিসির পায়ের ধুলো নিয়ে আসি।…লেখক মশাইরা তো দেখতে পান শুধু যুগযন্ত্রণায় ছটফটিয়ে মরা ছেলেগুলিকেই, সে যন্ত্রণা যে মেয়েদের মধ্যেও আছে,–কে কবে খেয়াল করেছে? ওনারা জানেন কেবলমাত্ৰ দেহযন্ত্রণা ছাড়া মেয়েদের আর কোনো যন্ত্রণা নেই। ঘেন্না করে, লজ্জা করে, রাগে মাথা জ্বলে যায়। পিসিকে গিয়ে বলবো।–
অনামিকা দেবী কথায় বাধা দিয়ে বলেন, তা যেন বুঝলাম, কিন্তু পায়ের ধুলো নেওয়া!। তা যে বাপু বড় সেকেলে! এই তোর বন্ধু! সেকেলে গাইয়া! ছি!
তা বলো। ক্ষতি নেই।
শম্পা গেঁটিয়ে বিছানায় বসে গম্ভীর গলায় বলে, দ্যাখো পিসি, তোমায় আর আমি কী বুঝবো, তুমি কী না বোঝ! তবে আমি তো দেখছি আসলে প্রাণের মধ্যে যখন সত্যিকার আবেগ আসে তখন তোমার গিয়ে ওসব সেকেলে একেলে জ্ঞান থাকে না।
থাকে না বুঝি?
কই আর? নিজেকে দিয়েই তো দেখলাম, সাতজন্মেও ঠাকুর-দেবতার ধার ধারি না, ধারেকাছেও যাই না, যারা ওই সব ঠাকুর-টাকুর করে তাদের দিকে বরং কৃপার দৃষ্টিতে তাকাই। কিন্তু তোমার কাছে আর বলতে লজ্জা কি, জাম্বোর যেদিন হঠাৎ একেবারে একশো জ্বর উঠে বসলো চড়চড় করে, ডাক্তার মাথায় হাত দিয়ে পড়লো বলেই মনে হলো, সেদিন দুম করে ঠাকুরের কাছে মানত না কি যেন তাই করে বসলাম। বললাম, হে ঠাকুর ওর জ্বর ভালো করে দাও, তোমায় অনেক পুজো দেব। বোঝ ব্যাপার!
অনামিকা দেবী হেসে ফেলে বলেন, ব্যাপার তো বেশ বুঝলাম, জলের মতোই বুঝলাম, কিন্তু জাম্বোটি কী বস্তু তা তো বুঝলাম না!
জাম্বো কে জানো না?
শম্পা আকাশ থেকে পড়ে।
ওর নামটা তোমায় কোনোদিন বলিনি নাকি?
কার নাম?
আঃ, ইয়ে সেই ছেলেটার! মানে সেই মিস্ত্রীটার আর কি! যেটার বেশ বন্য বন্য ভাবের জন্যে এখনো রিজেক্ট করিনি!
তার নাম জাম্বো? আফ্রিকান বুঝি?
আহা আফ্রিকান হতে যাবে কেন? ওর চেহারাটার জনো ওর কাকা নাকি ওই নামেই ডাকতো। শুনে আমারও বেশ পছন্দ হয়ে গেল।
তা তো হবেই। তুমি নিজে যেমন। তোর নামও শম্পা না হয়ে হিড়িম্বা হওয়া উচিত ছিল। কেন, একটু সভ্য-ভব্য হতে পারিস না? বাড়িতে তো তোর বয়সী আরো একটা মেয়ে রয়েছে, তাকে দেখেও তো শিখতে পারিস?
কী শিখতে পারি? সভ্যতা? কাকে দেখে? তোমার ওই নাতনীটিকে দেখে? আমার দরকার নেই! শম্পা অবজ্ঞায় ঠোঁট উল্টোয়।
তারপর বলে, আমি নেহাৎ অশিক্ষিত অ-সভ্য বলেই ওর কীর্তিকলাপ মুখে আনতে চাই না, শুনলে না তুমি মোহিত হয়ে যেতে নাতনীর গুণাপনায়!
আহা লেখাপড়ায় হয়তো তেমন ইয়ে নয়, কিন্তু আর সব কিছুতে তো-
লেখাপড়ার জন্যে কে মরছে? শম্পা ঝাঁঝিয়ে উঠে বলে, বর্ণপরিচয় না থাকলেও কোনো ক্ষতি নেই, কিন্তু আর সবটা কী শুনি?
কেন, নাচ গান, ছবি আঁকা, সূচের কাজ, টেবল ম্যানার্স, পার্টিতে যোগ দেবার ক্যাপাসিটি-
থামো পিসি, মাথায় আগুন জেলে দিও না। তোমার ওই বৌমাটি মেয়েটার ইহকাল পরকাল সব খেয়ে মেরে দিয়েছেন, বুঝেছো? ছবি আঁকে! হুঁ! যা দেখবে সবই জেনো ওর মাস্টারের আঁকা। সেলাই তো স্রেফ সমস্তই ওর মাতৃদেবীর—তবে হ্যাঁ, সাজতে-টাজতে ভালই শিখেছে। যাকগে মরুকগে, মহাপুরুষরা বলে থাকেন পরচর্চা মহাপাপ। তুমি যে দয়া করে তোমার ওই নাতনীটিকেই এ যুগের আধুনিকাদের প্রতিনিধি ভাবোনি এই ভালো! যাক লিলি যদি আসে, আর পায়ের ধুলোফুলো নিয়ে বসে, ওই নিয়ে কিছু বোলো না যেন।…আবেগের মাথায় আসবে তো! আর আবেগের মাথায়-হঠাৎ ঠাট্টা-টাট্টা শুনলে–
আচ্ছা আচ্ছা, তোর বন্ধুর ভারটা আমার ওপরই ছেড়ে দে। কিন্তু সেই যে জাম্বুবান না কার জন্যে যেন ঠাকুরের কাছে মানত করে বসেছিলি-পুজো দিয়েছিস? নাকি তার জ্বর ছেড়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই তোরও ঘাড় থেকে ভগবানের ভূত ছেড়ে গেল!
শম্পা হেসে ফেলে। অপ্রতিভ-অপ্ৰতিভ হাসি।
বলে, ব্যাপারটা আমি নিজেই ঠিক বুঝতে পারছি না পিসি। ঠাকুর-টাকুর তো মানি না, হঠাৎ সেদিন কেনই যে মরতে— এখন ভেবে পাচ্ছি না কী করি? পুজো ফুজো দেওয়া মনে করলেই তো নিজের ওপর কৃপা আসছে, অথচ—
