বকুলের খাতায় ছন্দের চরণধ্বনি উঠলেই সে ধ্বনি পৌঁছে যেতো সেজদির কাছে। এটাই ছিল বরাবরের নিয়ম।
শুধু সেই একসময়, মহাজাতি সদনে অনুষ্ঠিত ফাংশানের কদিন পরে বকুলের খাতায় ছন্দের পদপাত পড়েছিল, কিন্তু সেজদির কাছে পৌঁছয়নি। খাতার মধ্যেই সমাধিস্থ হয়ে আছে সে।
সেই খাতাটা, যার পাতার খাঁজে সেই চিঠিখানা ঘুমিয়ে আছে এখনো।
কই? কোথায়? আমাদের সেই গল্পটা?
না, সেজদির কাছে যায়নি খাতার সেই পৃষ্ঠাটা। গেলে হয়তো যত্নের ছাপ পড়তো তাতে। দেখা হতো ছন্দে কতটা ত্রুটি, শব্দচয়নে কতটা দক্ষতা।
আর হয়তো শেষ পর্যন্ত শেষও হতো। কোনো একখানা সমাপ্তির রেখা টানা হতো। কিন্তু ওটা যায়নি সেজদির কাছে। বকুলের অক্ষমতার সাক্ষী হয়ে পড়ে আছে খাতার মধ্যে!
অথচ সেই রাত্রেই লেখেনি বকুল যে, অক্ষমতোটাকে ক্ষমা করা যাবে! লিখেছিল তো কদিন যেন পরে—
লিখেছিল–
রাত্রির আকাশে ওই বসে আছে যারা
স্থির অচঞ্চল,
আলোক স্ফুলিঙ্গ সম
লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি তারা,
আমরা ওদের জানি।
পৃথিবী হতেও বড়ো বহু বড়ো
গ্ৰহ উপগ্রহ।
নাম-পরিচয়হীন দূরান্তের পড়শী মোদের।
দুর্লঙ্ঘ্য নিয়মে অহৰ্নিশি আবর্তিছে
আপন আপন কক্ষে।
কিরণ বিকীর্ণ করি।
বিজ্ঞানের জ্ঞানলোকে
ধরা পড়ে গেছে ওদের স্বরূপ।
অনেক অঙ্কের আর অনেক যুক্তির
সারালো প্রমাণে
রাখেনি কোথাও সন্দেহের অবকাশ।
ওরা সত্য, ওরা গ্রহদল।
তবু মনে হয়–
জীবনের ঊষাকালে মাতৃমুখ হতে
শুনেছি যা ভ্ৰান্তবাণী, শিখেছি যা ভুল,
সব চেয়ে সত্য সেই।
সত্য সব চেয়ে যুক্তিহীন বুদ্ধিহীন
সেই মিথ্যা মোহ।
তাই স্তব্ধ রাত্রিকালে,
নিঃসীম নিকষপটে নির্নিমেষ দৃষ্টি মেলি
দেখি চেয়ে চেয়ে–
অনেক তারার মাঝে কোথা আছে
দুটি আঁখিতারা।
যে দুটি তারকা কোটি কোটি যোজনের
দূরলোকে বসি
চেয়ে আছে তন্দ্ৰাহীন।
চেয়ে আছে সকরুণ মৌন মহিমায়
মাটির পৃথিবী পরে।
যেথা সে একদা–
একটি নক্ষত্র হয়ে জ্বলিত একাকী
আলোকিয়া একখানি ঘর।
নিয়তির ক্রুর আকর্ষণে যেথা হতে নিয়েছে বিদায়
প্রাণবৃন্তখানি হতে ছিঁড়ে আপনারে।
লক্ষ ক্রোশ দূর হতে–
হয়তো সে আছে চেয়ে
সেই গৃহখানিপানে নতনেত্ৰ মেলি।
হয়তো দেখিছে খুঁজে–
দীপহীন দীপ্তিহীন সেই ঘর হতে
দুটি নেত্ৰ আছে কিনা জেগে
ঊর্ধ্ব আকাশেতে চেয়ে।
কোটি তারকার মাঝে
খুঁজিবারে দুটি আঁখিতারা
সহসা একদা যদি–
না, আর লেখা হয়নি।
কতকাল হয়ে গেল, খাতার পাতার রংটা হলদেটে হয়ে গেছে, ওটা অসমাপ্তই রয়ে গেল। কি করে তবে বলা যায় মন নামক কোনো সত্যবস্তু আছে?
না নেই, মন নামক কোনো সত্য বস্তু নেই। অন্ততঃ অনামিকা দেবীর মধ্যে তো নেইই। থাকলে তারপর আরো অনেক অনেক গল্প লিখতে পারতেন না তিনি। থাকলে সেই চিঠিখানাই তাঁর কলমের মুখটা চেপে ধরতো। বলে উঠতো, থামো থামো, লজ্জা করছে না তোমার? ভুলে যাচ্ছে নক্ষত্রেরা অহনিশি তাকিয়ে থাকে?
কিন্তু সে সব কিছু হয়নি। সে কলম অব্যাহত গতিতে চলেছে। বরং দিনে দিনে নাকি আরো ধারালো আর জোরালো হচ্ছে। অন্ততঃ শম্পা তো তাই বলে। আর শম্পা নিজেকে এ যুগের পাঠক-পাঠিকা সমাজের মুখপাত্র বলেই বিশ্বাস রাখে।
শম্পা মাঝে মাঝেই এসে বলে, আচ্ছা পিসি, তুমি এমন ভিজেবেড়াল প্যাটার্নের কেন?
অনামিকা দেবী ওর কোনো কথাতেই বিস্ময়াহত হন না, তাই মৃদু হাসেন। অথবা বলেন, সে উত্তর সৃষ্টিকর্তার কাছে। তুই বা এমন বাঘিনী প্যাটার্নের কেন, সেটাও তো তাহলে একটা প্রশ্ন!
বাজে কথা রাখে। শম্পা উদ্দীপ্ত গলায় বলে, তোমায় দেখলে তো স্রেফ একটি ভোঁতা। পিসিমা মনে হয়, অথচ কলম থেকে লেখাগুলো এমন জব্বর বার করো কী করে বাছা?
আজও শম্পা উদ্দীপ্ত মূর্তিতেই এসে উদয় হলো, নাঃ, তোমার এই ভিজে বেড়াল নামটাই হচ্ছে আসল নাম!
অনামিকা দেবী বোঝেন তার সাম্প্রতিককালের কোনো একটা লেখা ওর বেদম পছন্দ হয়ে গেছে, উচ্ছাস তৎ-দরুন। মৃদু হেসে বলেন, সে কথা তো আগেই হয়ে গেছে।
গেছে, তবু কিছুটা সংশয় ছিল, আজ সেটা ঘুচলো।
বাঁচলাম।
তুমি তো বাঁচলে, মুশকিল আমারই! তোমার কাছে এসে বসলেই ভাবনা ধরবে ভিজে বেড়ালটির মতো চক্ষু মুদে বসে আছ, কিন্তু কোন ফাঁকে অন্তরের অন্তস্থল পর্যন্ত দেখে বসছো!
তাতে ভাবনাটা কী? অনামিকা হাসেন, তোর অন্তস্থলে তো আর কোন কালিঝুলি নেই।
সে না হয় আমার নেই। শম্পা অনায়াস মহিমার গলায় বলে, আমার ভেতরটা না হয় দেখেই ফেললে, বয়েই গেল আমার; কিন্তু অন্যদের? তাদের কথাও তো ভাবতে হবে।
তুইই ভাব। তারপর আমার কী কী শাস্তিবিধান করিস কর।
শাস্তি!
শম্পা উত্তাল গলায় বলে, শাস্তি কী গো? বল পুরস্কার! কী একখানা মারকাটারী গল্প লিখেছে এবারের উদয়নে, পড়ে তো আমার কলেজের বন্ধুরা একেবারে হাঁ! বলে, আচ্ছা তোর পিসিকে তো আমরা দেখেছি, দেখলে তো একেবারেই মনে হয় না উনি আমাদের, মানে আর কি আধুনিক মেয়েদের এমন বোঝেন। আশ্চৰ্য, কী করে উনি আধুনিক মেয়েদের একেবারে যাকে বলে গভীর গোপন ব্যথা-বেদনার কথা এমন করে প্রকাশ করেন? সত্যি পিসি, তোমায় দেখলে তো মনে হয় তুমি আধুনিকতা-টাধুনিকতা তেমন পছন্দ কর না!
অনামিকা দেবী ঈষৎ গম্ভীর গলায় বলেন, এমন কথা মনে করার হেতু?
