অনামিকা দেবী ভাবলেন তাই আসছে। কিন্তু ছেলেটা হঠাৎ কাছ ঘেঁষে এসে পাশের বাড়ির খবর দিতে বসলো।
বললে, আপনিও যেই বেরিয়ে এলেন—
অনামিকা দেবী ঝাপসা ভাবে একবার তার বাড়ির এপাশ-ওপাশ স্মরণ করলেন!
তারাচরণবাবুর মা মারা গেলেন তা হলে! ভুগছিলেন অনেক দিন ধরে। বললেন, তাই নাকি? আমি তো–
এগিয়ে চলেছেন উদ্যোক্তারা ছেলেটাকে পাশ-ঠ্যালা করছেন তবু ছেলেটা যেন নাছোড়বান্দা।
হয়তো ও সেই স্বভাবের লোক যারা কার কাছে একটা দুঃসংবাদ পরিবেশন করব্বার সুযোগটাকে বেশ একটা প্রাপ্তিযোগী মনে করে, তাই সুযোগটাকে ফস্কাতে চায় না; সঙ্গে সঙ্গে এগোতে থাকে, হলের মধ্যে ঢুকে যায়, আর হঠাৎ একবার চান্স পেয়ে বলে নেয়, আপনি কি করে জানবেন? এক্ষুনি টেলিগ্রাম এলো। ওই যে আপনাদের পাশের বাড়ির সুনির্মলবাবু ছিলেন। বক্সারে থাকতেন–
কথাটা শেষ করতে পেলো না।
ততক্ষণে তো অনামিকা দেবীকে মঞ্চে তোলার জন্য গ্রীন রুমের দিকে নিয়ে চলে গেছে। এরা সর্বসমক্ষে দোদুল্যমান ভেলভেটর পর্দার ওদিকে সাজিয়ে বসিয়ে মাহেন্দ্রক্ষণে যবনিকা উত্তোলন করবে!
এখনো ভাবতে গেলে বিস্ময়ের কুল খুঁজে পান না অনামিকা দেবী!
বুঝতে পারেন না সত্যিসত্যিই সেই ঘটনাতা ঘতেছিল কি না। অথচ ঘটেছিল। যবনিকা উত্তোলিত হয়েছিল নাটকীয় ভঙ্গীতে, উৎসুক দর্শকের দল দেখতে পেয়েছিল সারি সারি চেয়ারে সভানেত্রী, প্ৰধান অতিথি এবং উদ্বোধক সমাসীন।
তারপর নাটকের দৃশ্যের মতই পর পর দেখতে পেয়েছিল, উদ্বোধন সঙ্গীত অন্তে তিন প্রধানকে মোটা গোড়ে মালা পরিয়ে দেওয়া হলো, সমিতি-সম্পাদক উদাত্ত ভাষায় তাদের লক্ষ্য, আদর্শ ইত্যাদি পেশ করলেন। তারপর একে একে উদ্বোধক, প্রধান অতিথি এবং সভানেত্রী ভাষণ দিলেন, তারপর যথারীতি সমাপ্তি সঙ্গীত হলো।
আর তারপর আসল ব্যাপার সংস্কৃতি অনুষ্ঠান শুরু হবার জন্যে পুনর্বার যবনিকা নামলো।
সভানেত্রীর ভাষণ হয়েছিল কি?
হয়েছিল বৈকি।
এমন জমজমাট অনুষ্ঠানের ত্রুটি হতে পারে কখনো?
তারপর যদি সভানেত্রী হঠাৎ অসুস্থতা বোধ করে বাড়ি চলে যান, তাতে অনুষ্ঠানে ত্রুটি হবার কথা নয়।
.
না, কোনো ত্রুটি হয়নি অনুষ্ঠানের।
সভানেত্রীর ভাষণেও নাকি ত্রুটির লেশ ছিল না। উদ্যোক্তাদেদর একজন এ অভিমতও প্রকাশ করলেন, এই রকম মৃদু সংক্ষিপ্ত এবং হৃদয়গ্রাহী ভাষণই তাঁরা চান। দীর্ঘ বক্তৃতা দুচক্ষের বিষ।
অতএব ধরা যেতে পারে সভা সাফল্যমণ্ডিত হয়েছিল। তাছাড়া কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, ধন্যবাদ, শুভেচ্ছাজ্ঞাপন ইত্যাদি সব কিছুই ঠিকমত সাজানো হয়েছিল।
আকাশের সেই নক্ষত্ৰখানি আকাশের জানলা দিয়ে সবই তো দেখেছিল তাকিয়ে।
কী করে তবে বিশ্বাস করবে সে, এই ভয়ানক যন্ত্রণাটা সত্যি। বিশ্বাস করেনি, নিশ্চয়ই বিশ্বাস করেনি। হয়তো মৃদু হেসে নিঃশব্দ উচ্চারণে বলেছিল, এতোই যদি যন্ত্রণা তো ওই সব সাজানো-গোছানো কথাগুলি চালিয়ে এলে কী করে শুনি? শোনামাত্রই তো সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়তে পারতে তুমি। এরকম ক্ষেত্রে যেটা খুব স্বাভাবিক ছিল।
আকস্মিক সেই অসুস্থতাকে লোকে এমন কিছু অস্বাভাবিক বলেও মনে করতো না।
বলতো গরমে, বলতো অতিরিক্ত মাথার খাটুনিতে। অথবা বলতো, শরীর খারাপ নিয়ে এসেছিলেন বোধ হয়।
আর কী?
সভা পণ্ড হতো?
পাগল!
রাজা বিনে রাজ্য চলে, আর সভানেত্রী বিহনে সভা চলতো না?
কতো কতো জায়গায় তো এমনিতেই সভাপতির অন্তর্ধান ঘটে। এই আসছেন এখুনি আসছেন, আনতে গেছে বলতে বলতে কর্তৃপক্ষ হাল ছেড়ে দিয়ে আর কোনো কেষ্টবিষ্টুকে বসিয়ে দেন সভাপতির আসনে!
অনামিকা দেবী সেদিন হঠাৎ সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে তাই হতো। তাছাড়া আর কী লোকসান?
অথচ ওই মূর্খ সভানেত্রী আপ্রাণ চেষ্টায় সেই সংজ্ঞাটাকেই ধরে রাখতে চেষ্টা করেছেন। সত্যিই তাই করেছিলেন অনামিকা। ওই পালিয়ে যেতে চেষ্টা করা বস্তুটাকে ধরে রাখবার জন্যে তখন যেন একটা লড়াইয়ের মনোভাব নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নেমেছিলেন।
হার মানবো না!
কিছুতেই হার মানবো না।
বুঝতে দেবো না কাউকে! জানতে দেবো না। আমার মধ্যে কী ঘটছে।
কিন্তু সম্ভব হয়েছিল তো!
বহুবার নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করেছে বকুল, কী করে হলো সম্ভব?
তার মানে আসলে মন নামক লোকটার নিজস্ব কোনো চরিত্র নেই? সে শুধু পরিবেশের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত!
ভগবান সম্পর্কে কখনোই খুব একটা চিন্তা ছিল না বকুলের। চলিত কথার নিয়মে ভগবান শব্দটা ব্যবহার করতে হয়তো। ভগবান খুব রক্ষে করেছেন। ভগবান জানেন কী ব্যাপার! খুব ভাগ্যি যে ভগবান অমুকটা করেননি।
এই রকম।
এ ছাড়া আর কই?
শুধু এই একটি জায়গায় ভগবানকে মুখোমুখি রেখে প্রশ্ন করেছে বকুল, এখনো করে, ভগবান! কী দরকার পড়েছিল তোমার ওই শান্ত সভ্য অবোধ মানুষটাকে তাড়াতাড়ি পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবার? কী ক্ষতি হতো তোমার, যদি সেই মানুষটা পৃথিবীর একটুখানি কোণে সামান্য একটু জায়গা দখল করে থাকতো আরো কিছুদিন! তোমার ওই আকাশে তো নক্ষত্রের শেষ নেই, তবে কেন তাড়াতাড়ি আরো একটি বাড়াবার জন্যে এমন নির্লজ্জ চৌর্যবৃত্তি তোমার!
ভগবানকে উদ্দেশ করে কথা বলার অভ্যাস সেই প্ৰথম।
ভগবানের নির্লজ্জতায় স্তম্ভিত হয়ে, ভগবানের নিষ্ঠুরতায় স্তব্ধ হয়ে গিয়ে।
