খেতে বসে খিদে কম, শুতে গিয়ে ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস। আবার এমনও সন্দেহ হয় আমায় বুঝি ঈর্ষাই করছে। যে বস্তু ওর কাছে দুর্লভ, সে বস্তু আমি এমন অনায়াসে লাভ করছি, এটা হিংসের বিষয়, হলেও হতে পারে তো?
অথচ বাবুর নিজে সাহস করে লেখার মুরোদ নেই; বলেছিলাম, আমার চিঠি পড়ছে কি জন্যে শুনি? ইচ্ছে হয় নিজে চিঠি লিখে উত্তর আনাও! আমার চিঠিতে তো আছে ঘোড়ার ডিম, তোমার চিঠিতে বরং রোমান্স-টোমান্স থাকবে!.. তা উচিতমত একটা জবাবই দিতে পারলো না। রেখে দিয়ে বললো, ঠিক আছে, পড়তে চাই না।
বোঝ ভাই!
এর পরে আবার মান খুইয়ে পড়তেও পারবে না, দীর্ঘশ্বাস আরো বাড়বে।
এই রকমই চিঠি লিখতো মাধুরী–বৌ।
একবার লিখেছিল, মাঝে মাঝে ভাবি, আশ্চৰ্য, তোমরা চিঠি লেখালিখিই বা করোনা কেন? চিঠির দ্বারা আর সমাজকে কতোটা রসাতলে দেওয়া যায়? আবার ভাবি, থাকগে, হয়তো এই-ই ভালো। লক্ষ্মীর কৌটোয় তুলে রাখা মোহর ভাঙাতে না বেরোনোই ভালো।
আর একবার লিখেছিল, উঃ বাবা, ক্ৰমে ক্রমে কী লেখিকাই হয়ে উঠছ! এখানে তো তোমার নামে ধন্য ধন্য। আমি বাবা মরে গেলেও ফাঁস করি না, এই বিখ্যাত লেখিকাটি আমার চেনা-জানা।…কী দরকার বলো? এনে তো দেখাতে পারবো না? তাছাড়া এও ভাবি, সত্যিই কি চেনা-জানা? যে তুমি-কে দেখি, গল্প করি হয়তো বা হতাশ প্রেমের নায়িকা বলে, মাঝে মাঝে করুণাও করে বসি, এই সব জটিল কুটিল ভয়ঙ্কর গল্পটল্প কি তারই লেখা? না আর কেউ লিখে দেয়? সত্যি ভাই, তোমার মুখের ভাষার সঙ্গে তোমার লেখার ভাষার আদৌ মিল নেই।… তবু মাঝে মাঝে ওই অভাগা লোকটার জন্যে মায়া হয়। এমন একখানি নিধি ঘরে তুলতে পারতো বেচারা, কিন্তু বিধি বাম হলো। তার বদলে কপালে এই রাঙামূলো।
শ্লেষ করে লিখতো না, অসূয়ার বশেও লিখতো না, মনটাই তো এমনি সহজ সরল মাধুরীবৌয়ের। মেয়েমানুষের মন এমন অসূয়াশূন্য, এটা বড় দুর্লভ।
মাধুরী-বৌ বলেছিল, লক্ষ্মীর কৌটোয় তুলে রাখা মোহর না ভাঙানোই ভালো।
তবু সেবার সে মোহর বার করে বসেছিল নির্মল। কে জানে মাধুরী-বৌকে জানিয়ে কি না-জানিয়ে!
হয়তো জানায়নি।
হয়তো অফিসে বসে লিখে পাঠিয়েছে, কই? কোথায় সেই গল্প? যে গল্প কেবল তুমি বুঝবে, আর আমি বুঝবো। আর কেউ বুঝবে না।…চিঠির উত্তর চাই না, গল্পটাই হবে উত্তর।
চিঠির উত্তর দিতে নির্মলও বারণ করেছিল।
পড়ে হেসে ফেলেছিলেন অনামিকা দেবী। তার ভাগ্যটা মন্দ নয়, লোকে চিঠি দিয়ে উত্তর দিতে বারণ করে!
কিন্তু উত্তর স্বরূপ যেটা চেয়েছিল?
যার জন্যে হয়তো দিনের পর দিন, মাসের পর মাস প্রতীক্ষা করেছিল। সে গল্প কোথায়?.. সেই এক বিদারণ-রেখা টানা আছে।অনামিকা দেবীর জীবনে। সে গল্প লেখা হয়নি।
অথচ তারপর কতো গল্পই লিখলেন। এখনো লিখে চলেছেন।
কিন্তু একেবারেই কি লেখা হয়নি সে গল্প?
সেদিন মহাজাতি সদন থেকে ফিরে চুপিচুপি সেই প্রশ্নটাই করেছিলেন অনামিকা দেবী আকাশের কোন এক নক্ষত্ৰকে, একেবারেই কি লিখিনি তোমার আর আমার সেই গল্পটা? লিখেছি লিখেছি। লিখেছি নানা ছলে, নানা রঙে, নানা পরিবেশের মাধ্যমে। আমাদের গল্পটা রেণু রেণু করে মিশিয়ে দিয়েছি অনেক-দের গল্পের মধ্যে!
তবু—
তুমি জেনে রইলে, অনেক গল্প লিখলাম আমি, শুধু তোমার আর আমার সেই গল্পটা লিখলাম না কোনো দিন। তুমি অনেকবার বলেছ, তবু লিখিনি। তুমি প্রতীক্ষা করেছ ছেলেমানুষের মত, হতাশ হয়েছে ছেলেমানুষের মত, বুঝতেও পেরেছি সেকথা, তবু হয়ে ওঠেনি।
কেন হয়ে ওঠেনি, আমি নিজেই ভাল জানি না। হয়তো পেরে উঠিনি বলেই। তবু আজ আমার সে কথা ভেবে খুব যন্ত্রণা হচ্ছে। খুব যন্ত্রণা।
কিন্তু নক্ষত্রটা কি বিশ্বাস করেছিল সেকথা? বিশ্বাস করবার তো কথা নয়। সে তো সব কিছুই দেখেছিল আকাশের আসনে বসে।
দেখেছিল মহাজাতি সদনে মন্ত এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছে, ভিড়ে ভেঙে পড়েছে হল, আলোয় ঝলমল করছে প্রবেশদ্বার।
মস্তবড় একখানা গাড়ি থেকে নামলেন অনুষ্ঠানের সভানেত্রী। এরাই পাঠিয়েছিল গাড়ি।
শান্ত প্ৰসন্ন চেহারা, ভদ্রমার্জিত সাজসজ্জা। উদ্যোক্তাদের আভূমি নমস্কারের বিনিময়ে নমস্কার করছেন। পাড়ার সেই একটা ছেলে, রাজেন্দ্রলাল স্ট্রীটের কোনো একখানে যার বাড়ি, অনামিকা দেবীকে ধরে কবে এই অনুষ্ঠানের প্রবেশপত্র একখানা যোগাড় করেছিল, সেই ছেলেটা কেমন করে যেন মহাজনবেষ্টিত সভানেত্রীর একেবারে কাছ ঘেঁষে খুব চাপা গলায় বললে, আপনিও বেরিয়ে এলেন, আর সঙ্গে সঙ্গেই আপনাদের পাশের বাড়ির একটা স্যাড ব্যাপার! বিরাট কান্নাকাটি!
ছেলেটা কাছ ঘেঁষে আসার চেষ্টা করায় অনামিকা দেবী ভাবছিলেন, তার সঙ্গ ধরে একেবারে প্রথম সারির চেয়ারে গিয়ে বসবার তাল করছে বোধ হয়।… পাড়ার ছেলেরা সুযোগ-সুবিধের তালটা খোঁজে, বাড়ির ছেলেরা কদাচ নয়। অনামিকা দেবীর ভাইপোরা কোনোদিন সামান্য একটা কৌতূহল প্রশ্নও করে না অনামিকা দেবীর গতিবিধি সম্পর্কে। কদাচ কখনো কোনো ভালো অনুষ্ঠানের প্রবেশপত্ৰ উপহার দিয়ে দেখেছেন, দেখতে যাবার সময় হয়নি ওদের; অথচ তার থেকে বাজে জিনিসও দেখতে গিয়েছে পয়সা খরচ করে। গিয়েছে হয়তো পরদিনই।
পাড়ার ছেলেরাই সুযোগ টুযোগের আশায় কাছে ঘেঁষে আসে।
