বাঃ, লেখিকা আবার নতুন কী দেখবে?
লেখিকা দেখবে সমারোহের অন্তরালে অবস্থিত দৈন্য। দেখবে অনেক জমজমাটের ওপিঠের গভীর শূন্যতা। কিন্তু-, নির্মল মিষ্টি একটু হেসে বলেছিল, কিন্তু এ গল্পও এখন চাই না আমি। এ গল্প পরে লিখো, যখন মরে-টরে যাবো। আমি চাই সেই বোকা ছেলেমেয়ে দুটোর গল্প-যাহারা আঁকেনি ছবি, সৃজেছিল শুধু পটভূমি।
অনামিকা দেবী হেসে কুটিকুটি হয়ে বলেছিলেন, কেন? নতুন করে অনুভব করতে, কী বোকা ছিল তারা?
তারপর বলেছিলেন, আচ্ছা লিখবো।
নির্মল বললে, ঠিক আছে! কিসে দেবে বল, সেই পত্রিকাটার গ্রাহক হবে কাল থেকে।
আরে তুমি গ্রাহক হতে যাবে কোন দুঃখে? লেখিকা নিজেই না হয় পাঠিয়ে দেবে!
নাঃ। ও মৃদু হেসে বলেছিলো, বিনা প্রতীক্ষায় পেলে সে জিনিস আর মূল্যবান থাকে না। এ বেশ প্রতি মাসে ডাকের প্যাকেটটা খোলবার সময় হাত কাঁপিবে–
অনামিকা দেবীর ভাবনা ধরে গিয়েছিল।
অনামিকা দেবীর মনে হয়েছিল, এমনি ছোট্ট ছোট্ট কথার চাবি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নির্মল নামের ছেলেটা বুঝি অনামিকা দেবীর সেই অনেক আগে বন্ধ করে দেওয়া, অনেক নীচের পাতাল-ঘরটা খুলে ফেলতে চায়।
তাই অনামিকা দেবী খুব জোরে হেসে উঠেছিলেন, ও বাবা! বল কি? এতো?
তুমি ঠাট্টা করছো?
বাঃ, ঠাট্টা করবো কেন? এমনিই বলছি-এতো?
নির্মল উদাস হাসি হেসে বলেছিল, ঠাট্টা অবশ্য করতে পারো তুমি, সে রাইট আছে তোমার। আমার আর মুখ কোথায়?
ও কথা বোলো না নির্মলদা, বকুল তখন ব্যাকুল হয়ে বলেছিল, ও কথা কোনোদিনও বলবে না। আমার মতে এটাই ভালো হয়েছে।
তাই ভাববো।
দীর্ঘনিঃশ্বাসের মত একটা শব্দ পেয়েছিলেন অনামিকা দেবী।
তারপর আবার সেই আবেগের গলায় উচ্চারিত কথা, আমি কিন্তু প্ৰতীক্ষা করবো।
বলেছিল নির্মল।
প্রতীক্ষা করবো!
কিন্তু সে গল্প লেখা হয়েছিল কোনোদিন?
কই আর?
লেখা হলে আর সেই ঘর-সংসারী বড় বয়সের মানুষটা কতোদিন পরে আবার একখানা চিঠি লিখে বসবে কেন? কই? কোথায় সেই গল্প? যে গল্প কেবল তুমি বুঝবে আর আমি বুঝবো, আর কেউ বুঝতে পারবে না?
১৪. অকস্মাৎ একদিন সেই চিঠিটা
হ্যাঁ, অকস্মাৎ একদিন সেই চিঠিটা এসে হাজির হয়েছিল। অবাক হয়ে গিয়েছিলেন অনামিকা দেবী। আশ্চর্য রকমের ছেলেমানুষ আছে তো মানুষটা? এখনো সেই গল্পটার কথা মনে রেখে বসে আছে? এখনো ভাবছে সেই গল্পটা ভালো লাগবে তার? শুধু একা বুঝে ফেলে পরম আনন্দে উপভোগ করবে?
অথবা পরম বেদনায় একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে, সে দীর্ঘশ্বাসকে মিশিয়ে দেবে অনন্তকালের বিরহী হিয়ার তপ্তশ্বাসের সঙ্গে!
ভগবান জানেন কী ভাবছে!
কিন্তু আশ্চর্য লাগে বৈকি!
আশ্চর্য লাগে এই ভেবে, অথচ মাধুরী-বৌকে ও প্রাণ তুল্য ভালবাসে। নিবিড় গভীর স্নেহসহানুভূতি-ভরা সেই ভালবাসার খবর বকুলের অজানা নয়। অজানা নয়, এই অনামিকা দেবীরও। তবু সেই অতীত কৈশোরকালের প্রথম-প্রেম নামক হাস্যকর মুঢ়তাটুকুকে আজও আঁকড়ে ধরে রেখেছে লোকটা!
আজও ওর প্রাণের মধ্যে গোপন গভীরে সেই মূঢ়তাটুকুর জন্যে হাহাকার!
হয়তে ওর এই ছেলেমানুষি মনটা বজায় থাকার মূলে রয়েছে মাধুরী-বৌয়ের আশ্চর্য হৃদয়ের অনাবিল ভালবাসার অবদান। মাধুরী-বৌ যদি সংসারের আরো অসংখ্য মেয়ের মত ঈর্ষাবিদ্বেষ, সন্দেহ আর অভিমানে ভরা একটা মেয়ে হতো, যদি মাধুরী-বৌ তার তীব্ৰ তীক্ষ্ণ অধিকারের ছুরিটা নিয়ে ওই অবোধ মানুষটার সেই মূঢ়তাটিকে দীৰ্ণবিদীর্ণ ছিন্নভিন্ন করে উৎপাটিত করে ফেলবার কাজে উৎসাহী হয়ে উঠতো, যদি ওকে বুঝিয়ে ছাড়ত এখনো তোমার ওই প্রথম প্রেমকে পরম প্রেমে লালন করাটা মহাপাতক তাহলে কী হতো বলা যায় না। হয়তো মূঢ় ছেলে মানুষটা সেই তীব্র শাসনবাণীতে কুণ্ঠিত হয়ে গুটিয়ে যেতো, সঙ্কুচিত করে ফেলতো নিজেকে।
কিন্তু মাধুরী-বৌ কোনো দিন তা করেনি।
মাধুরী-বৌ ওকে যেন মাতৃহৃদয় দিয়ে ভালবেসেছে। ভালবেসেছে বন্ধুর হৃদয় দিয়ে।
মাধুরী-বৌ ওর ওই প্রথম প্রেমের প্রতি নিষ্ঠাকে শ্রদ্ধা করে।
.
চিঠি মাধুরী-বৌও লিখতো বকুলকে।
অথবা বলতে পারা যায় মাধুরী-বৌই লিখতো। নির্মল তো মাত্ৰ দুবার। সেই অনেক দিন আগে ছোট্ট দু লাইনের একটা, কী যে তাতে বক্তব্য ছিল ভুলেই গেছেন অনামিকা দেবী। আর তারপর অনেক দিন পরে এই চিঠি।
যোগাযোগ রাখতো মাধুরী-বৌ।
কোথায় কোথায় বদলি হয়ে যাচ্ছে তারা, কেমন কোয়ার্টার্স পাচ্ছে, দেশটা কেমন, এমনি ছোটখাটো খবর দেওয়া চিঠি।
কিন্তু বকুল?
উত্তর দিতো নিয়মিত?
নাঃ, মোটেই না।
প্রথম দিকে ভদ্রতা করে দিয়েছিল উত্তর দুচারটে, তারপর আর নয়।
তারপর কি অভদ্র হয়ে গেল? নাকি অহঙ্কারী হয়ে গেল? অথবা অলস?
তা ঠিক নয়।
বকুল নিষেধাজ্ঞা পালন করতে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
তা এই নিষেধাজ্ঞা কি বকুলের বড়দার? না নির্মলের সেই বড় জেঠির?
সেই নিষেধাজ্ঞা পালন করেছিল বকুল?
নাঃ, তখন আর অতোটা হাস্যকর কোনো ঘটনা ঘটেনি।
নিষেধাজ্ঞা ছিল স্বয়ং পত্ৰদাত্রীর।
মাধুরী-বৌ নিজেই লিখেছিল, আমাদের খবরটা দিয়ে মাঝে মাঝে আমি তোমায় চিঠি দেব ভাই, তাতে তুমি খুশি হও না-হও, আমি খুশি হবো। তুমি কিন্তু ভাই উত্তরপত্রটি দিও না।…কী? ভাবছে নিশ্চয় এ আবার কোন ধরনের ভদ্রতা? তা তুমি ভাবলেও, এ অভদ্রতাটি করছি ভাই আমি। হয়তো এমন অদ্ভুত অভদ্রতা সংসারের আর কারো সঙ্গেই করতে পারতাম না, শুধু তুমি বলেই পাবলাম! জানি না এটা পারছি তুমি লেখিকা বলে, না আমার বরের প্রেমিকা বলে! যাই হোক, মোট কথা পারলাম। না পেরে উপায় কি বল? যেদিন তোমার চিঠি আসে, লোকটার আহারনিদ্রা যে প্রায় বন্ধ হবার যোগাড়!
