তা তখনো উপলক্ষ খোঁজার চেষ্টা করতে হতো বৈকি।
জগৎসংসারে এতো লোক থাকতে, একজন আর একটি জনের সঙ্গে দেখা হওয়ার জন্যে ব্যাকুল হচ্ছে, এটা ধরা পড়ে যাওয়া যে দারুণ লজ্জার! হোক না তাদের যতোই কেননা বয়েস, ধরা পড়লেই মারা গেলে!
আর পড়বেই ধরা।
ওই ব্যাকুলতাটা এমনি জিনিস যে সংসারের বুনো মানুষগুলো তো দূরের কথা, শিশুর চোখেও ধরা পড়তে দেরি হয় না। শিশুও বিশেষ দৃষ্টিটা যে বিশেষ তা বুঝে ফেলে কৌতূহলদৃষ্টি ফেলে তাকিয়ে দেখে।
অতএব নিজের ক বছরের যেন বাচ্চা ছেলেটাকেও ভয়ের দৃষ্টিতে দেখে, চেষ্টা করে করে উপলক্ষ সৃষ্টি করতে নির্মল।
তেমনি এক মিথ্যা উপলক্ষের মুহূর্তে গভীর একটু দৃষ্টি মেলে বলেছিল নিৰ্মল, এতো গল্প লিখছো, আমাদের গল্পটা লেখো না!
বকুল তো তখন অনামিকার খোলসে বন্দী, সে খোলস ভেঙে ফেলে বকুল হয়ে ফুটে উঠবার উপায় কই তার? বকুলকে তো চিরকাল ওই খোলসের বোঝাটা বয়ে বেড়াতেই হবে।
এই খোলস জিনিসটা বড় ভয়ানক, প্ৰথমে মনে হয় আমি বুঝি নিজেই গায়ে চড়ালাম ওটাকে, খুলে রাখতে ইচ্ছে হলেই খুলে রাখবো, কিন্তু তা হয় না। আস্তে আস্তে নাগপাশের বন্ধনে বেঁধে ফেলে সে, তার থেকে আর মুক্তি নেই।
অতএব অনামিকা দেবীকে অনামিকা দেবী হয়েই থাকতে হবে। আর কোনদিনই বকুল হওয়া চলবে না, অন্য আর কিছু হবার ইচ্ছে থাকলেও চলবে না।
কাজে কাজেই বকুলকে নির্মলের ওই ছেলেমানুষি কথায় হেসে উঠে বলতে হয়েছিল, আমাদের গল্প? সেটা আবার কী বস্তু?
নির্মলের সেই ছেলেমানুষ অথচ গভীর চাহনির মধ্যে আঘাতের বেদনা ফুটে উঠেছিল। নির্মল আহত গলায় বলে উঠেছিল, এখন হয়তো সে বস্তু তোমার কাছে তুচ্ছ হয়ে গেছে, অনেক বড় হয়ে গেছে তুমি, তবু আমার কাছে সে সমান মূল্যবানই আছে। তুচ্ছ হয়ে যায়নি।
মনকে চঞ্চল হতে দিতে নেই।
কারণ সেটা ছেলেমানুষি, সেটা ওই খোলসখানার উপযুক্ত নয়। তাই আচঞ্চল কৌতুকে বলতে হয়, ওরে বাবা! সেই তামাদি হয়ে যাওয়া দলিলটা এখনো আয়রন চেস্টে তুলে রেখেছে? তোমার তো খুব অধ্যবসায়া!
নির্মল তার প্রকৃতিগত আবেগের সঙ্গে বলেছিল, তোমার কাছে হয়তো তামাদি হয়ে গেছে বকুল, আমার কাছে নয়।
তাই তো, তাহলে তো ভাবালে!
বলে হেসে ফেলেছিলেন অনামিকা দেবী।
আর ভেবেছিলেন, মনে করি বুঝি অনুভূতির ধারগুলো সব ঘষে ঘষে ক্ষয়ে গেছে আমার, কিন্তু সত্যিই কি তাই? তাই যদি হয়, কেন তবে ওকে দেখলে ভিতর থেকে এমন একটা উথলে ওঠা আহ্লাদের ভাব আসে? কেন ওর যে কদিন ছুটি থাকে, মনে হয় আকাশ-বাতাস সব যেন আনন্দে ভাসছে? কেন ওর ছুটি ফুরোলে মনে হয়, কী আশ্চৰ্য,এরইমধ্যে এক মাস হয়ে গেল! আর কেন মনে হয়, দিনগুলো কেমন যেন একরঙা হয়ে গেল!
ভাবাতে পারলাম? নির্মল আগ্রহের গলায় কৌতুক-স্বরে বলেছিল, সেটাও আশার কথা। তা ভাবনাটাকে রূপ দিয়ে ফেলো না, লেখো না আমাদের গল্প। এতো লিখছো বানানো গল্প।
অনামিকা দেবীর ওই আবেগের দিকে তাকিয়ে মমতা হয়েছিল, হঠাৎ যেন কোথায় কোন ধুলোর স্তরের নিচে থেকে মাথা তুলে একটা বিশ্বাসঘাতক দুষ্ট চুপি-চুপি বলে উঠেছিল, বাজে কথা বলছ কেন? বুকে হাত দিয়ে বল দিকি জিনিসটা একেবারে তামাদি হয়ে গেছে, একথা তুমি নিজেই বিশ্বাস কর!
তাই অনামিকা মৃদু হেসে বলেন, আচ্ছা না হয় লিখলামই একটা সত্যি গল্প, কিন্তু তারপর?
কী তারপর?
লোকে ভুলে-টুলে গেছে, আবার তাদের মনে পড়িয়ে দিয়ে এই বুড়ো বয়সে ধরা পড়া তো? খুব তরল শুনিয়েছিল গলাটা।
নির্মলের ঝকঝকে চোখ দুটো হঠাৎ খুশির আলোয় ঝলসে উঠেছিল। নির্মল কি অনামিকার ওই তরলতার বুদবুদে বকুলের ছায়া দেখতে পেয়েছিল?
আশ্চর্য নির্মলের চোখের সেই ঝলকানিটা কোনোদিনই ম্লান হয়ে যায়নি! হয়তো এই দীপ্তিটা অন্য এক আলোর। হয়তো নির্মল তাঁর জীবনের বহিরঙ্গের সমন্ত সমারোহের অন্তরালে একটি অন্তরঙ্গ কোণে একটি অকম্প দীপশিখা জেলে, সেটিকে বিশ্বস্ততার স্ফটিকের কৌটোয় ভরে রেখেছিল, এই দীপ্তি সেই শিখার।
নির্মল সেই দীপ্তি দিয়ে বলেছিল, ধরা পড়ে যাওয়া মানে? তবে আর কিসের বড় লেখিকা? এমন কৌশলে লিখবে যে, কেউ জানতেই পারবে না এটা সত্যি গল্প!
চেনা লোকেরা পারবে।
উহুঁ। যাতে না পারে, সেইভাবে লিখবে।
হেসে উঠেছিলেন অনামিকা দেবী, তবে আর লিখে লাভ? কেউ যদি টেরই না পেলো?
বাঃ, নাই বা টের পেলো। না পাওয়াই তো চাইছি। লোকের জন্যে তো নয়, নিজেদের জন্যেই। কেউ ধরতে পারবে না, শুধু আমরা দুজনে বুঝবো। বল তো কী মজা হবে সেটা!
তা হলেও—, অনামিকা দেবী একটু দুষ্ট হাসি হেসেছিলেন, গল্পের মূল নায়িকা তো বড় জেঠিমাকেই করতে হবে!
ধ্যেৎ! ওই গল্পটা লিখতে কে তোমায় সাধছে? একেবারে আমাদের নিজেদের গল্পটা লেখো, যে গল্পটা এখনো রোজ তৈরি হচ্ছে।
লিখলে কিন্তু পাল্লা দুটো ভয়ানক উঁচু -নিচু দেখাবে! অনামিকা দেবী বলেছিলেন হেসে হেসে, একদিকে সুন্দরী স্ত্রী, সোনারচাঁদ ছেলে, মোটা মাইনের চাকরি, কর্মস্থলে প্ৰতিপত্তি, অন্যদিকে একটা অখাদ্য গল্পলেখিকা-বর জোটেনি, ঘর জোটেনি, তাই সময় কাটাতে কলম ঘষে।
নির্মলের চোখের সেই ঝকঝকানির ওপর মেঘের ছায়া নেমে এসেছিল। নির্মল বলেছিল, সুন্দরী স্ত্রী, মোটা মাইনের চাকরি, সেটা বাইরের লোক দেখবে! তুমি লেখিকা, তুমিও সেটাই দেখবে?
