তবু আরো একটা টিকিট ছিল, যার জোরে সনৎকাকার এ বাড়িতে প্রবেশাধিকার প্ৰবোধচন্দ্রের খুব দূর-সম্পর্কের মামাতো ভাই উনি। নইলে শুধু কাগজের সম্পাদক অথবা পুস্তক প্রকাশক হলে কে ডিঙোতে দিতো এ চৌকাঠ? আর কে গলাধঃকরণ করতো সেকথা–মেয়েটি যে আপনার রত্ন প্ৰবোধদা! একে আপনি বাড়ি বসিয়ে রেখেছেন? কলেজে-টলেজে পাঠালে–
কিন্তু শুধুই কি সম্পর্ক?
চরিত্র নয়?
যার জোরে জোর গলায় বলতে পারে মানুষ, আমার সঙ্গে যাবে, তবে আবার এতো চিন্তা কী?
.
অনেকটা সময় পার হয়ে গিয়েছিল বোধ হয়, হঠাৎ শম্পার প্রশ্নে যেন অন্য জগৎ থেকে ছিটকে সরে এলেন অনামিকা দেবী।
শম্পা প্রশ্ন করছে, তোমার সেই সনাতনী বাবার মেয়ে হয়েও চিরকুমারী থেকে গেলে কী করে বল তো পিসি? যা সব গল্প শুনি তোমার বাবা বুড়োর!..হতাশ প্ৰেম-ট্রেম নয় তো?
তোর বড্ডো বাড় বেড়েছে শম্পা-
আহা বাড়বৃদ্ধিই তো ভালো পিসি! বল না তোমার ঘটনা-টটনা—
তোর মত রাতদিন ঘটনা ঘটাতাম, এই বুঝি মনে হয় তোর আমায় দেখে?
মনে অবশ্যি হয় না, তবে চিরকুমারী থাকাটার কারণটাও তো জানা দরকার।
তুই থামবি? নাকি ধাড়ি বয়সে মার খাবি?
বাচাল শম্পাকে ধমক দিয়ে থামালেন অনামিকা দেবী। কিন্তু ওর প্রশ্নের ধাক্কাটাকে তখুনি থামিয়ে ফেলতে পারলেন না। সেই আর একদিনের মতই ভাবতে বসলেন, তার জীবনের এই অবিশ্বাস্য ঘটনাটা, এই নিজের মনে নিজের মত থেকে যাওয়া, এটা আর কিছুই নয়, তার ভাগ্যদেবতার অপার করুণার ফল। সে করুণার স্পর্শ সারাজীবনে বারেবারেই অনুভব করেছেন, তবু এটাই বুঝি সবচেয়ে বড়ো। যার জন্যে কৃতজ্ঞতার আর অন্ত নেই তাঁর ভাগ্যের কাছে।
হতাশ প্রেম?
পাগল নাকি?
এখনকার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সেই প্রথম প্রেমকে সকৌতুকে দেখে তার মূল্যায়ন করে অবজ্ঞা করছেন না অনামিকা দেবী, শুধু সেই কালের পরিপ্রেক্ষিতে তাকিয়ে দেখে বলেছেন, পাগল নাকি!
হতাশ প্রেমে কাতর হবার যার কথা, সে কী অনামিকা দেবী? সে তো বকুল!
সেই বকুলের পক্ষে কি অমন একটা অদ্ভুত কথা ভাবা সম্ভব ছিল?
বকুলের বাবা-দাদারা যদি যোগ্য পাত্ৰ যোগাড় করে এনে, সেই তরুণী মেয়েটাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দিত, মেয়েটা কি এ যুগের সিনেমার নায়িকার মত বিয়ের পিঁড়ি থেকে ছিটকে উঠে, কনেচন্দন রুমালে মুছে ফুলের মালা গলা থেকে টান মেরে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে জমজমাট বিয়েবাড়ি থেকে উধ্বশ্বাসে পথে বেরিয়ে পড়তে পারতো, এ অসম্ভব এ অসম্ভব বলতে বলতে?
নাকি অভিভাবকদের চেষ্টার মুখে তাদের মুখের ওপর বলতে পারতো, বৃথা চেষ্টা করবেন না। যদি করেন তো নিজের দায়িত্বে করবেন।
নাঃ, এসব কিছুই করতে পারতো না সে। কেউই পারতো না তখন। বকুলরা দেবদাস পড়ে মানুষ হওয়া মেয়ে। অভিভাবকরা বিয়ে দিলে সে বর হাতিপোতার জমিদারই হোক আর মশাপোতার ইস্কুলমাস্টারই হোক, তার চাদরে গাঁটছড়া বেঁধে ঠিকই তার পিছু পিছু গিয়ে দুধে-আলতার পাথরে দাঁড়াতো।
তারপর?
তারপর সারাজীবন সেই জীবনের জাবর কাটতো, আর কখনো কোনো এক অসতর্ক মুহূর্তে হয়তো একটা উন্মনা নিঃশ্বাস ফেলতো।
পারুলের জীবনে প্রথম প্রেম-ট্রেম কিছু নেই, তবু পারুলের জীবনটাও ওই জাবরকাটা ছাড়া আর কি? পারুলও অনেক উন্মানা নিঃশ্বাস ফেলেছে বৈকি। যে প্ৰেম জীবনে কখনো আসেনি তার বিরহেই নিঃশ্বাস ফেলেছে পারুল। হয়তো এখনো তার সেই গঙ্গার ধারের বারান্দায় পড়ন্ত সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে যে নিঃশ্বাসটা ফেলে পারুল সেটা তার ছেলেদের প্রতি অভিমানে নয়, সেই না-পাওয়ায় গভীর শূন্যতার।
হঠাৎ একটা কথা ভাবলেন অনামিকা দেবী, নির্মল যদি সেজদিকে ভালবাসতো!
যদিও পারুল নামের প্রখরা মহিলাটি নির্মল নামের মেরুদণ্ডহীন ভীরু ছেলেটাকে নস্যাৎ করে দিয়েছিল, তবু এ কথাটা এতোদিন পরে মনে হলো অনামিকা দেবীর।
নির্মলের ওপর বকুল সম্পর্কে একটা প্রত্যাশা ছিল বলে পারুল হয়তো অতো ধিক্কার দিয়েছিল ছেলেটাকে। যদি সে রকম কোনো প্ৰত্যাশা না থাকত, যদি ছেলেটা তার পরিপূর্ণ জীবনের মাঝখানে বসেও পারুলের দিকে দীন-দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো, পারুল হয়তো সম্পূর্ণতা পেতো। পারুল সেই সঞ্চয়টিকে পরম মূল্য দিতো।
সেজদি এখনো প্ৰেম-ট্রেম ভালো বোঝে-মনে মনে বললেন অনামিকা দেবী, আমার মত এমন নীরস হয়ে যায়নি। অবিরত যতো রাজ্যের কাল্পনিক লোকের প্ৰেম-ভালবাসার কথা লিখতে লিখতে, নিজের অনুভূতিগুলো ভোঁতা হয়ে গেছে আমার।
নইলে সেদিন মহাজাতি সদনে, সেই ফাংশানের দিন, কেমন করেই আমি—
হঠাৎ কেমন স্তব্ধ হয়ে গেলেন অনামিকা দেবী।
ভোঁতা হয়ে যাওয়া অনুভূতিও কি হঠাৎ তীক্ষ্ণ হয়ে ঝনঝনিয়ে উঠলো? সেই ধাক্কায় স্তব্ধ হয়ে গেলেন?.
নির্মল, সুনিৰ্মল নামের সেই বড় চাকুরে ছেলেটার মধ্যেও বুঝি সব পেয়েও বরাবর সেজদির মতোই একটা না-পাওয়ার শূন্যতা ছিল।
তাই নির্মল বলেছিল, কতো গল্প লিখছো, আমাদের গল্পটা লেখো না।
তখন আর মোতিহারীতে নেই নির্মল, বদলির চাকরির সূত্রে আরো কোথায় যেন ছিল। সেখানে বাংলা পত্রিকা দুর্লভ, তবু খুঁজে খুঁজে পড়তো। আর ছুটিতে বাড়ি এলেই সেই নিতান্ত কম বয়সের মতো চেষ্টা করে করে উপলক্ষ খুঁজে অনামিকা দেবীর সঙ্গে দেখা করে যেতো।
