ভরাট উদার সেই গলার স্বর যেন ভয়ের খোলসগুলো খুলে খুলে দিয়েছে।
তবুও কম বাধা কি ঠেলতে হয়েছিল?
প্ৰবোধচন্দ্রের চার দেয়ালের মধ্যে থেকে বেরিয়ে প্ৰবোধচন্দ্রের বয়স্থা কুমারী মেয়ে এক নিতান্ত দূর-আত্মীয় পুরুষের সঙ্গে একা বেড়াতে গিয়ে দুরাত বাড়ির বাইরে কাটিয়ে আসবে, এর থেকে অনিয়ম পৃথিবীতে আর আছে কিনা, সেটা তো প্ৰবোধচন্দ্রের জানা ছিল না, জানতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছিল তাঁকে, অনেক বাধার সৃষ্টি করতে হয়েছিল।
তবু বেরিয়ে পড়তে পেরেছিল প্ৰবোধচন্দ্রের বয়স্থ কুমারী মেয়ে। একবার স্ত্রীর তীর্থযাত্ৰা রোধ করতে যে কৌশল গ্রহণ করেছিলেন, সে কৌশল করতে সাহস হয়নি প্ৰবোধচন্দ্রের।
হ্যাঁ, বকুলের মা সুবৰ্ণলতা একদা সঙ্গিনী যোগাড় করে কেদারবন্দরীর পথে পা বাড়িয়েছিলেন, প্ৰবোধচন্দ্ৰ সেই বাড়ানো পা-কে ঘরে ফিরিয়ে এনেছিলেন কেবলমাত্র সামান্য একটু কৌশলের জোরে। কিন্তু সে কৌশল এখন আর প্রয়োগ করা চলে না। এখন আর সাহস হয় না একসঙ্গে অনেক বেশী মাত্রায় জোলাপ খেয়ে নাড়ি ছাড়িয়ে ফেলতে। এখন ভয় হয় সেই চলে যাওয়া নাড়ি আর যদি ফিরে না আসে!
অতএব শেষ পর্যন্ত এ সংসারে সেই ভয়ঙ্কর অনিয়মটা ঘটেছিল। তখনো বকুলের বড়দাদার ছেলে স্কুলের গণ্ডি পার হয় নি, আর বাকি সবই তো কুচোকাচার দল।
তখন এ বাড়িতে আসামী শুধু বকুল নামের মেয়েটা।
বড়দা তাই বাবাকে প্রশ্ন করেছিল, বাড়িতে তা হলে এই সব স্বেচ্ছাচার চলবে?
প্ৰবোধচন্দ্ৰ কোঁচার খুঁটে চোখ মুছে বলেছিলেন, আমি কে? আমি তো এখন মনিষ্যির বার হয়ে গেছি! তোমরা বড় হয়েছে।–
আমরা আমাদের নিজেদের ঘর শাসন করতে পারি, আপনার ধিঙ্গী মেয়েকে শাসন করতে যাবো কিসের জোরে? তায় আবার তিনি লেখিকা হয়েছেন, পৃষ্ঠবল বেড়েছে!
তবু এসেছিলো শাসন করতে। বড়দা নয়, যে মেজদা সাতে পাঁচে থাকে না, সে।
বলেছিল, বাবার উঁচু মাথাটা এইভাবে হেঁট না করলে হতো না?
বকুল ওর মেজদার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলেছিল, বাবার এতে মাথা হেঁট হবে, একথা আমি মনে করি না মেজদা। অনেকে তো এমন যায়।
ও মনে কর, না? অনেকে এমন যায়! চমৎকার! তা হলে আর বলার কি আছে? কিন্তু সুবিধের খাতিরে এটাও বোধ হয় ভুলে যাচ্ছে, সকলের বাড়ি সমান নয়। এ বাড়ির রীতিনীতিতে–
বকুলের মুখে একটু হাসি ফুটে উঠেছিল।
বকুল সেই হাসিটা সমেতই বলেছিল, সুবিধের খাতিরে অনেকে তো অনেক কিছুই ভুলে যায় মেজদা। একদা এ বাড়িতে গৌরীদানের রীতিও ছিল, এখন কুমারী মেয়ের বয়স পঁচিশে গিয়ে ঠেকলেও অনিয়ম মনে হচ্ছে না। এটাই কি মনে থাকছে সব সময়?
তার মানে বকুল তার এই পঁচিশ বছরের কুমারীত্বের কথা তুলে দাদাকে খোঁটা দিয়েছিল। তার মানে এটা যে বকুলের জেদে ঘটেনি সেটাই বোঝাল বকুল।
ওঃ তাই! মেজদা একটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলেছিল, যথাসময়ে বিয়ে দেওয়া হয়নি বলে যথেচ্ছাচারের ছাড়পত্র পেয়ে গেছ, সেটা খেয়াল হয়নি! তবে বিয়ের চেষ্টাটা বাবা থাকতে আমাদেব করার কথা নয়। বাবা না থাকলে অবশ্যই–
এবার বকুল জোরে হেসে উঠেছিল। বলেছিল, দোহাই মেজদা, তোমরা আমার বিয়ে দাওনি বলে ক্ষেপে উঠে যথেচ্ছাচার করতে চাইছি, এতোটা ভেবো না লক্ষ্মীটি! ওই বিয়েটা না হওয়া আমার পক্ষে পরম আশীর্বাদ। সনৎকাকা আগ্রহ করে বললেন, তাই সাহস। জীবনের এ স্বপ্ন যে কখনো সফল হবে, তা কোনো দিন ভাবিনি। যদি তোমাদের বাড়ির একটা মেয়ের জীবনে এমন অঘটন ঘটে——
১৩. ঘটেছিল সেই অঘটন
তা শেষ পর্যন্ত ঘটেছিল সেই অঘটন।
সনৎকাকার সঙ্গে বোলপুরের পথে পা বাড়িয়েছিল বকুল।
জীবনের প্রথম বিস্ময়!
সে কী আশ্চর্য স্বাদ! .
সে কী অভাবিত রোমাঞ্চ!
আকাশে কতো আলো আছে, বাতাসে কতো গান আছে, জগতে কতো আনন্দ আছে, সে কথা আগে কবে জেনেছিল বকুল?
কিন্তু বকুল কি সেই জ্যোতির্ময় পুরুষের কাছাকাছি পৌঁছেছিল? তার পায়ে হাত রেখে প্ৰণাম করেছিল? তাকে বলতে পেরেছিল আমার জীবন ধন্য হলো?
পাগল!
বকুল অনেকের ভিড়ে অনেক পিছনে বসেছিল, শুধু অন্যকে বলা কথা শুনেছিল। অথবা কথাও শোনেনি। বকুল শুধু এক রূপময় শব্দময় আলোকময় জগতের দরজায় দাঁড়িয়েছিল–সমন্ত চেতনা লুপ্ত করে।
পৌষ মেলা দেখতে মেলার মাঠে নিয়ে গিয়েছিলেন সনৎকাকা।
বাধ্য হয়েই ওঁর সঙ্গে যেতে হয়েছিল বকুলকে। কিন্তু বকুলের মনে হয়েছিল কী অর্থহীন এই ঘোরা! কী লাভ ওই মাটির কুঁজো, কাঠের বারকোশ, রঙিন কুলো, মেটে পাথরের বাসন, লোহার কড়া, চাটু আর নাগরদোলা দেখায়। অবশ্য শুধু ওই নয়, মেলায় আরো অনেক আকর্ষণ ছিল, লোকেরা তো ওই মেলার মাঠেই পড়ে থাকছিল, এবং তাদের মুখ দেখে আদৌ মনে হচ্ছিল না কোনো অর্থহীন কাজ করছে। শুধু বকুলেরই মনে হচ্ছিল, অনন্তকাল সেই দেবমন্দিরের দরজায় বসে থাকলেই বা কী ক্ষতি? জীবনে কি আর কখনো এ সৌভাগ্য হবে?
হয়ওনি। কতো-কতোগুলো দিন গিয়েছিল তারপর।
তারপর তো দেবতা বিদায় নিয়েছিলেন।
সনতকাকা এসে বলেছিলেন, যাই ভাগ্যিস সেদিন বাপের ভয়ে আটকে বসে থাকনি, তাই না–
কিন্তু বকুলদের সংসারে বকুলের সনৎকাকার পরিচয় কি?
মাসিক পত্রিকার সম্পাদক?
প্রেসের মালিক?
পুস্তুষ্ক প্রকাশক?
আসলে তো এইগুলোই পরিচয়ের সূত্র।
