আমি-—জানেন আপনার এই স্পর্ধাজনক উক্তি যদি রাস্তার লোককে ডেকে বলে দিই তো যে যেখানে আছে একযোগে আপনার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গায়ের ছাল ছাড়িয়ে নেবে!
তা জানি। আর সেইখানেই তো আপনাদের বুকের বল! জানেন দোষ যে পক্ষই করুক, কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে এই পুরুষ জাতটাকেই!
করা হয় তো কুলিগিরি, এতো লম্বা লম্বা কথা শেখা হলো কোথা থেকে?
কড়া গলায় ও বললে, আপনাদের মতো মেয়েদের দেখে দেখে।
বললাম, এতো দেখলেন কোথা থেকে?
বললে, চোখ থাকলেই দেখা যায়। কেউ তো আর হারেমে বাস করে না! তারপর সে অনেক কথা। মোট কথা, শেষ অবধি ভাব হয়ে গেল।… একসঙ্গে চা খেলাম।–আর সেই অবধি–
শম্পা একটু হেসে চুপ করে।
তার সঙ্গেই তা হলে ঘুরে বেড়াচ্ছিস এখন?
ঘুরে ঠিক নয়। সময় কোথায় তার? কারখানার কাজ, ওভারটাইম খাটে, ওই মাঝে মাঝে ঘুরি। কালিকুলিমাখা জামা পরেই হয়তো কোনো পার্কে-টার্কে এসে বসে পড়ে।
খুব ভাল লাগে, কেমন? বিশেষ করে চেহারার যা বর্ণনা শুনলাম!
শম্পা এবার গম্ভীর হয়।
বলে, চেহারায় কী এসে যায় পিসি! মানুষটা কেমন সেটাই দেখবার বিষয়। এদেশে একসময় পুরুষের চেহারার আদর্শ ছিল কার্তিক ঠাকুর, আর তার সাজ-সজ্জার আদর্শ ছিল লম্বা-কেঁচা ফুলবাবুটি। এখন বরদাস্ত করতে পারো সে চেহারা? মনের সঙ্গে সঙ্গে চোখের পছন্দও বদলাবে বৈকি।
অনামিকা দেবী হেসে ফেলে বলেন, তা এখন তো ওই বন্য-বন্য বর্বরে-বর্বরে এসে ঠেকেছে! এর পর? পুরো অরণ্যের প্রাণী?
শম্পা উদাস উদাস গলায় বলে, সেটাও অসম্ভব নয়। মানুষ জাতটা দিন দিন যে রকম ভেজাল হয়ে যাচ্ছে!
টেলিফোনটা বেজে উঠলো।
সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠলো শম্পা, নির্ঘাত সে।
রিসিভারের মুখটা হাত দিয়ে ঢেকে অনামিকা চাপা গলায় বলেন, তোকে না বলেছিলাম, তোর ওই বন্ধুদের আমার ফোন নম্বর দিবি না?
বলেছিলে, মানছি সে-কথা। কিন্তু না দিলে ওদের কী গতি হবে সেটা বলো!
কিন্তু ফোন ধরেই হতাশ হয়ে পড়ে শম্পা, সে নয়।
অনামিকা দেবী ততক্ষণে কথা শুরু করে দিয়েছেন, দেখা করতে চান? কারণটা বলুন? লেখা না সভা? দুটোতেই কিন্তু আপাততঃ অপারগ। …কী বললেন? আমাকে সম্বর্ধনা দিতে চান? কী সর্বনাশ! কেন? হঠাৎ কী অপরাধ করে বসলাম? …পাগল হয়েছেন? না না, ও সব ছেলেমানুষী ছাড়ুন।…দেশ চায়? কেন আমার তো এখনো আশী বছর বয়েস হয়নি। আশীর আগে ওসব করতে নেই।… তবু দেখা করতে আসবেন?…দেখুন, আমার বাড়ি আসবেন না এটা বলা শক্ত, কিন্তু এসে কি করবেন? ওসব সঙ সাজ-টাজা আমার দ্বারা হবে না …তা হোক, তবু আসবেন?.. ঠিক আছে, আসুন, তবে কার্ড-ফার্ড ছেপে বসলে কিন্তু তার দায়িত্ব আপনাদের …কী বললেন? নাকতলা শিল্পী সংস্থা?…আচ্ছা ধন্যবাদ।
নামিয়ে রাখলেন।
ক্লান্ত-কান্তু দেখালো তাকে।
এই আবার চলবে খানিক ধন্তাধস্তি, নিতান্ত অভদ্র না হওয়া পর্যন্ত ওদের হাত এড়ানো যাবে না।… কারণ ওই সম্বর্ধনার অন্তরালে অভিসন্ধি নামক যে জন্তুটি অবস্থান করছে, সে তার মুখের গ্রাসটি কি সহজে ছাড়তে রাজী হবে?
দেশ অনামিকা দেবীকে সম্বর্ধনায় ভূষিত করতে চায় বলেই নাকতলা শিল্পী সংস্থা দেশবাসীর মুখপাত্র হয়ে সেই গুরু দায়িত্ব মাথায় তুলে নিতে চাইছে, এমন কথা বিশ্বাস করার মতো ছেলেমানুষ অবশ্যই আর নেই অনামিকা দেবী। তবু যেটুকু দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, সেইটুকু বিশ্বাস করবার ভানই ভালো। সব সত্য উদঘাটিত না করাই বুদ্ধির কাজ। শম্পার নিয়মে সংসারে বাস করা চলে না।
শম্পা বললে, কী গো পিসি, তোমায় সম্বর্ধনা দিতে চায়?
সেই রকম বাসনাই তো জানাচ্ছে। হ্যাঁ, মনে হয় মরবার আগেই শ্রাদ্ধের মন্ত্র পাঠ করে শেষকৃত্য করে দিচ্ছে।
অথচ বেড়েই চলেছে ব্যাপারটা। রোজই তো শুনি এর সম্বর্ধনা তার সম্বর্ধনা।
বাড়বেই তো। দেশকে যে ফাংশানের নেশায় পেয়ে বসেছে। এ নেশা কাটাতে পারে এমন আর কোনো নতুন নেশা না আসা পর্যন্ত চলবে। উত্তরোত্তর বাড়বে।
মুখে বলবেন ওইটুকু, মনে মনে বলবেন, শুধু তো নেশাই নয়, ওই ফাংশানের পিছনে যে অনেক মধুও থাকে। নেশাটা সেই মধুরই। দেশের লোকের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করা, সরকারের ঘর থেকে এড বার করা, নিদেনপক্ষে নিজেকে পাদপ্রদীপের সামনে তুলে ধরা, সব কিছুর মাধ্যমেই তো ওই ফাংশান। যখন যে উপলক্ষটা পাওয়া যায়।.
আশ্চর্য আগে কী মূল্যবানই মনে হতে এই সব জিনিসগুলো! প্রথম প্রথম যখন তেরোরদুই রাজেন্দ্রলাল স্ট্রীটের চৌকাট পার হয়ে বাইরের পৃথিবীর আসরে গিয়ে বসেছেন অনামিকা দেবী, যখন ওই অভিসন্ধি নামের লুকনো জন্তুটার গোঁফের ডগাটি দেখে চিনে ফেলবার মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি লাভ হয়নি, তখন সব কিছুই কী ভালোই লাগতো। ভাল ভাল কথাগুলো যে কেবলমাত্র কথা একথা বুঝতে বেশ কিছুদিন লেগেছে তার।
তাই বলে কি খাঁটি মানুষ দেখেননি অনামিকা দেবী? ছিছি, একথা বললে পাপ হবে।
উদার দেবোপম চরিত্র সেই মানুষটিকে কি আজও প্রতিদিন প্রণতি জানান না অনামিকা দেবী? যে মানুষটি বকুল নামের মেয়েটাকে হাত ধরে খোলা আকাশের নীচে ডেকে এনেছিলেন, যে মানুষটির স্নেহ অনামিকার একটি পরম সঞ্চয়?
সেই খোলা গলার উদাত্ত স্বর এখনো কানে বাজে, বাবা আপত্তি করবেন? রাগ করবেন? করেন তো চারটি ভাত বেশী করে খাবেন। তুমি আমার সঙ্গে চলো তো। দেখি তোমায় কে কী বলে!..কী আশ্চর্য! অন্যায় কাজ নয়, অন্যের অনিষ্টকর কাজ নয়, কবিকে দেখতে যাবে। এতে এতো ভয়? কতো লোক যাচ্ছে, সমন্ত পৃথিবীর মানুষ আসছে। অথচ দেশের মধ্যে থেকে দেখবে না? দেব-দর্শনে যায় না লোকে? তীর্থস্থানে যায় না? মনে করো তাই যাচ্ছ। আর তাই-ই তো বোলপুর শান্তিনিকেতন আজ ভারতবর্ষের একটি তীর্থ। তাছাড়া তুমি এখন লেখিকা-টেখিকা হচ্ছ, তোমাদের কাছে তো বটেই।
