ওকে যেন একটা অহঙ্কারী মেয়ের মতো দেখতে লাগছে।
অনামিকা দেবীর হঠাৎ তার মায়ের মুখটা মনে পড়ে গেল।
অনেক চুল ছিল মার। আর গরমের দুপুরে যখন চুড়ো করে মাথার ওপর বেঁধে রাখতেন, অনেকটা এই রকম দেখাতো। অহঙ্কারী-অহঙ্কারী।
শম্পার মুখে অনামিকা দেবীর মায়ের মুখের আদল আছে। অথচ শম্পার বাবার মুখে তার ছায়ামাত্র নেই। আর শম্পার মা তো সম্পূৰ্ণ আলাদা এক পরিবারের মেয়ে। প্রকৃতির এ এক আশ্চর্য রহস্য! সে যে কতো রহস্যের সিন্দুক আগলে বসে নিঃশব্দে আপন কাজ চালিয়ে যায়! হঠাৎ আবার মায়ের মুখের আদল দেখে কি নতুন করে ওকে ভালো লাগলো অনামিকা দেবীর? আর ওকে এই অহেতুক প্রশ্রয় দেবার ওটাও একটা কারণ?
মায়ের মতো মুখ!
মাকে ভাবলেই মার জন্যে ভয়ানক একটা কষ্ট হয় অনামিকা দেবীর।
এখনো হলো।
মনে পড়লো বহির্জগতের জন্যে কী আকুতি ছিল মার! কী আকুলতা ছিল একটু আলোর জগতের টিকিটের জন্যে!
অথচ এরা–
সিগারেটের সেই প্ৰসিদ্ধ বিজ্ঞাপনটিার কথা মনে পড়লো অনামিকা দেবীর.. আপনি জানেন না আপনি কী হারাইতেছেন।
এরা জানে না। এরা কী পাইতেছে।
এদের হাতে যথেচ্ছ বিহারের ছাড়পত্র, এদের হাতে সব দরজার চাবি, সব জগতের টিকিট। এরা ভাবতেও পারে না, সুবৰ্ণলতা কতো শক্ত দেওয়ালের মধ্যে আটকা থেকেছে আর বকুলকে কতো দেওয়াল ভাঙতে হয়েছে, কতো ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে দিয়ে।
এদের কোনোদিন সে পরীক্ষা দিতে হয়নি।…মহাকাল এগিয়ে চলেছে আপনি নিয়মে, সমন্ত প্রতিকূল চিত্র সে প্রবাহে ভাসতে ভাসতে আপনিই অনুকূল হয়ে যাচ্ছে।
বকুলের যে বড়দা তার ছোট বোনকে একবার পাড়ার ছেলের মুখোমুখি দাঁড়াতে দেখলে সৃষ্টি রসাতলে যাচ্ছে ভেবে রাগে দিশেহারা হতেন, সেই দাদার ছেলে আঠারো বছরের মেয়েকে তার বয়-ফ্রেণ্ডদের সঙ্গে পিকনিক করতে ছেড়ে দেয় দীঘায়, পুরীতে, রাঁচিতে, কোলাঘাটে, নেতারহাটে।
সেই মেয়েটা অনামিকা দেবীর নাতনী সম্পর্ক হল না? তা তারই তো উচিত ছিল অনামিকা দেবীর কাছে এসে হেসে হেসে তার বয়-ফ্রেণ্ডদের গল্প করা।
কিন্তু তা সে করে না।
সে মেয়েটা এদিকও মাড়ায় না।
তার মাতৃদেবী আপন পরিমণ্ডলে আত্মস্থ, তুচ্ছ লেখিকা-টেখিকাকে সে ধর্তব্যের মধ্যে আনে না। তার পিতৃকুলের দিকে-দিগন্তে সকলেই পদস্থ ব্যক্তি, সরকারের উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত। সেই সমাজটাকেই সে বোঝে ভালো, সেই সমাজের উপযুক্ত করে মানুষ করে তুলছে সে মেয়েকে। মেয়েকে নাচিয়ে মেয়ে করে তুলতে অনেক কাঠখড় পুড়োচ্ছে।
সাহিত্য-টাহিত্য ওদের কাছে একটা অবান্তৱ বস্তু।
সেই মেয়েটা, যার ভালো নাম নাকি সত্যভামা, আর ডাকনাম কৃষ্ণা (মহাভারতের নামগুলিই তো এযুগে লেটেস্ট ফ্যাশান। আর চট করে বোঝাও যায় না বাঙালী কি অবাঙালী), সে যখন গায়ে টানটান শালোয়ার কামিজ চাপিয়ে আর পুরু করে পেণ্ট করা লালচে-লালচে মুখে মোমপালিশ লাগিয়ে হি হি করতে করতে তার একপাল বয়ফ্রেণ্ডের সঙ্গে বেড়াতে বেরিয়ে যায়, তখন সে দৃশ্য চোখে পড়লে অনামিকা দেবীর অজ্ঞাতসারেই তাঁর বড়দার মুখটা মনে পড়ে যায়।
সেই বাড়ি, সদর দরজাটাও একই আছে। যে দরজার সামনে ভীম মনোভাব নিয়ে পাহারা দিতো বড়দা, আর বকুল পাশের বাড়ি থেকে বেড়িয়ে ফিরলেই চাপা গৰ্জনে প্রশ্ন করতো, কোথায় গিয়েছিলি?
পাশের ওই বাড়িটা ছাড়া যে বকুলের যাবার আর কোনো জায়গা ছিল না, সে কথা জানা সত্ত্বেও বকুলের বড়দা ওই বৃথা প্রশ্নটাই করতেন।
সত্যভামার মা, অলকাদের সেই বড়দার অনেক যত্নে খুঁজে আনা বৌমাটি কি ওই সেকেলে শ্বশুরটিকে উচিত জবাব দেবার জন্যেই ছোট্ট থেকে মেয়েকে হাতিয়ার বানিয়েছেন!
এখন অবশ্য বড়দা মরে বেঁচেছেন। কিন্তু ওই সযত্নে শান দেওয়া হাতিয়ারটি আবার তার নিজের মা-বাপের জন্যেই আরো শাণিত হচ্ছে কিনা কে জানে! সংসারের নিয়মই তো তাই!
সত্যভামা আর শম্পার বয়সের পার্থক্য সামান্যই, এক বাড়িতেই বাস, তবু ওদের মধ্যে ভাব নেই। শম্পা সত্যভামাকে কৃপার দৃষ্টিতে দেখে, সত্যভামা শম্পাকে কৃপার দৃষ্টিতে দেখে।
শম্পার একমাত্র প্রিয় বান্ধবী পিসি।
তাই শম্পা অবলীলায় বলে বসতে পারে, চেষ্টায় লেগে গেলাম!
অনামিকার কড়া গলাকে অবশ্য শম্পা গ্রাহ্য করে না, তবু অনামিকা কড়া গলায় বলে ওঠেন, চেষ্টায় লেগে গেলাম মানে?
এই সেরেছে, তোমায় আবার মানে বোঝাবো কি? কী না জানো তুমি! আর কী না লেখো! চেষ্টায় লেগে গেলাম মানে-কটমট করে তাকিয়ে বললাম, সাহস থাকে তো একসঙ্গে নেমে পড়ুন, জবাব দিচ্ছি!.ব্যস, যেই আমি নেমে পড়লাম, অমনি সেও দুম করে নেমে পড়লো!
নেমে পড়লো?
পড়বে না? শম্পা একটু বিজয়-গৌরবের হাসি হেসে বলে, অলরেডি তো জালে পা আটকে গেছে ততক্ষণে! রাস্তায় নেমে আমি প্রথম বললাম, আপনার কথার জবাব হচ্ছে, চিড়িয়াখানার জীবকে খোলা রাস্তায় ছাড়া দেখলে তাকাবেই মানুষ। কিন্তু আপনি ড্যাবডেবিয়ে তাকাচ্ছিলেন কী করতে শুনি? পাজীটা বললো কিনা, আপনাদের মতো উদ্ভট সাজ করা হাস্যকর জীবদের দেখলেও তাকাবেই মানুষ…তারপর এইরকম কথাবার্তা হলো-আমি বললাম, জানেন এতে আমি অপমানিত বোধ করছি!
ও বললে, তার মানে আপনাদের গায়ের চামড়া আঙুরের খোসার মতো! সত্যি কথা শুনলেই ফোঁসকা পড়ে!
