এই হতভাগা মেয়েটার সামনে কিছুতেই যে কেন গাম্ভীর্য বজায় রাখতে পারেন না অনামিকা দেবী! মেয়েটার প্রতি বিশেষ একটা স্নেহ আছে বলে? তা হলে তো স্নেহান্ধর দশা ঘটেছে বলতে হয়।
কিন্তু তাই কি?
না, ওর ওই লজ্জাহীনতার মধ্যে কোথায় যেন একটা অমলিন সততা আছে বলে? যে বস্তু ইহসংসারে প্রায় দুর্লভ। তবুও তিনি গাম্ভীর্ঘ বজায় রাখবার চেষ্টায় চোখ পাকিয়ে বলেন, নতুন শিকার জালে ফেলেছি মানে? ও আবার কী অসভ্য কথা?
শম্পা কিন্তু কিছুমাত্র না দমে জোর গলায় বলে ওঠে, হতে পারে অসভ্য, কিন্তু জগতের কোন সত্যি কথাটাই বা সভ্য পিসি? সভ্য মাত্রেই অ-সভ্য, মানে সংসাবী লোকেরা যাকে অসভ্য বলে!
তা সংসারে বাস করতে হলে সংসারী লোকের রীতিনীতির মাপকাঠিতেই চলতে হবে।
শম্পা চেয়ারে বসেছিল, এখন বেশ জোরে জোরে পা দোলাতে দোলাতে বলে, ও কথা আমার পরমারাধ্যা মাতৃদেবী বলতে পারেন, তোমার মুখে মানায় না।
অনামিকা দেবী চেষ্টাটা আরো জোরালো করতে বলেন, না মানাবার কী আছে? মা পিসি কি আলাদা? মা যা বলবে, পিসিও তাই বলবে।
শম্পা হঠাৎ তড়াক করে লাফিয়ে উঠে, দুই কোমরে হাত দিয়ে বলে ওঠে, এ কথা তোমার সত্যি মনের কথা?
এই সরাসরি আক্রমণে অনামিকা দেবী হেসে ফেলেন, মেয়েটার মাথায় একটা থাবড়া মেরে বলেন, এইখানটিতে আছে কেবল দুষ্টবুদ্ধির পাহাড়! কিন্তু ওই সব শিকার-টিকার কী ভালো কথা?
ভালোমন্দ জানি না বাবা, ওই কথাটাই বেশ লাগসই মনে হলো, তাই বললাম, একটা করে ধরি আর মেরে ছেড়ে দিই যখন, তখন শিকার ছাড়া আর কি!
আমি তোর গুরুজন কি না?
হাজার বার।
তবে? আমার সামনে এই সব বেহায়া কথা বলতে তোর লজ্জা করে না?
বলে অনামিকা দেবীও হঠাৎ অন্যমনস্ক ভাবে ওর মতই পা দোলাতে থাকেন।
শম্পা সেই দিকে একবার কটাক্ষপাত করে বলে, দেখো পিসি, লজ্জা-ফজ্জা বলে আমার কিছু নেই, একথা আমি বাবাকেও বলতে পারি, কিন্তু বলতে প্ৰবৃত্তি হয় না। কথাটার মানেই বুঝবে না। তুমি সাহিত্যিক, মনন্তত্ত্ব-টত্ত্ব বোঝ, তাই তোমাকে বলি। কই বড় মেজ সেজ পিসিকে তো বলতে যাই না!
তাদের পাচ্ছিস কোথায়?
আহা ইচ্ছে করলে তো পেতে পারি। একজন তো এই কলকাতা শহরেই বাস করছেন, আর দুজনও আশেপাশে। কথা তো তা নয়, আশা করি যে তুমি অন্ততঃ বুঝবে আমায়।
অনামিকা দেবী ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেন। ভাবেন, ও আমার ওপর এ বিশ্বাস রাখে আমি ওকে বুঝবো? যদিও এ সংসারে ওইটাই হচ্ছে সব চেয়ে শক্ত কাজ। কে কাকে বোঝে? কে কাকে বুঝতে চায়?
আমি ওকে বুঝতে চেষ্টা করি, ও সেটা বুঝতে পারে। তাই ও আমার কাছেই মনের কথা বলতে আসে। কিন্তু নিত্য নতুন এই প্রেমিকই বা ও জোটায় কোথা থেকে?
সেই প্রশ্নই করেন অনামিকা দেবী।
শম্পা একগাল হেসে বলে, ও ঠিক জুটে যায়। একসঙ্গে দুটো তিনটে এসেই ভিড় করে কত সময়, আর এ তো এখন আমার ভেকেন্সি চলছিল! তোমরা সেই যে বল না, রতনে রতন চেনে, সেই রকম আর কি!।
অনামিকা দেবী হেসে ফেলে বলেন, তা নতুন রতনটি বোধ হয় কারখানার কুটিটুলি হবে?
শম্পা ভুরু কুঁচকে বলে, হঠাৎ এ সন্দেহ করলে যে? শুনেছো বুঝি কিছু?
শুনতে যাবো কোথায়, অনুমান করছি। পছন্দর ক্রমোন্নতি দেখছি কিনা।
শম্পা আরো একগাল হেসে বলে, তোমার অনুমান সত্য। হবেই তো। লেখিকা যে! সত্যি, কারখানাতেই কাজ করে। এণ্টালিতে একটা লোহার যন্ত্রপাতির কারখানা আছে, তারই অ্যাসিসটেন্ট ফোরম্যান। বেশ একখানা কংক্রাট চেহারা, দিব্যি একটি বন্য-বর্বর বন্য-বর্বর ভাব আছে–
বন্য-বর্বর বন্য-বর্বর ভাব আছে!
বাঃ, অবাক হচ্ছ কেন? থাকে না কারো কারো?
অনামিকা দেবী হতাশ গলায় বলেন, থাকতে পারে, কিন্তু—
কিন্তুর কিছু নেই পিসি। পুরুষমানুষের পক্ষে ওটাই তো সৌন্দর্য। দেখলে মনে হয় রেগে গেলে দুঘা মেরেও দিতে পারবে। নিদেনপক্ষে বাসন ভাঙবে বিছানা ছিড়বে, বইপত্তরকে ফুটবল করে স্যুট করবে, হয়তো আমাকেও–।
চমৎকার! শুনে মোহিত হয়ে যাচ্ছি! এ নিধিটিকে পেলে কোথায়?
সে এক নাটক, বুঝলে পিসি শম্পা চেয়ারের মধ্যে নড়েচড়ে বসে, তাহলে শোনো বুলি—বেগবাগানের ওই মোড়টায় বাস চেঞ্জ করতে নেমেছি, দেখি ওটাও এসে কাছাকাছি দাঁড়ালো। কালিঝুলি মাখা নীল প্যান্ট আর খাকি শার্ট পরা, মাথার চুল স্রেফ কদমছাট, মুখটা নিগ্রো প্যাটার্নের, বেঁটেখাটো মুণ্ডবা-মুগুর গড়ন, রংটা ছাতার কাপড়ের কাছাকাছি। ভারী ইণ্টারেস্টিং লাগলো। অনিমেষ নয়নে তাকিয়েই থাকলাম যতক্ষণ না বাস এলো। আর দেখি না আমার ওই তাকানো দেখে সে পাজীটাও ড্যাবড্যাব করে তাকাতে শুরু করেছে। ওমা তারপর কিনা একই বাসে উঠলো! বোঝ ফন্দী। উঠে একেবারে কাছে দাঁড়িয়ে বলে কিনা, অমন ভাবে তাকাচ্ছিলেন যে? চিড়িয়াখানার জন্তু দেখছিলেন নাকি?…শুনে মনটা যেন আহ্লাদে লাফিয়ে উঠলো। গলার আওয়াজ কী! যেন সত্যি চিড়িয়াখানার বন্দী বাঘের হুঙ্কার! ওই একটি কথা শুনেই মনে হলো এমন একখানা প্রাণীকে লটকে সুখ আছে।…ব্যস, চেষ্টায় লেগে গেলাম!
চেষ্টায় লেগে গেলাম!
অনামিকা দেবী ওর মুখের দিকে তাকান। ছলা-কলার মুখ নয়, নির্ভেজাল মুখ অথচ অবলীলায় কী না বলে চলেছে! এযাবৎকাল ওর চুলগুলো খাটো করে ছাঁটা ছিল, কিন্তু সম্প্রতি সেই চুল দিয়েই, কোন অলৌকিক উপায়ে কে জানে, মাথার মাঝখানে চুড়ো করে খোঁপা বেঁধেছে, আর সেই খোঁপাটার জন্যে ওর চেহারাটা একদম বদলে গেছে।
