সেটা অনেক সময় টের পেয়েছেন অনামিকা দেবী। তার এই দীর্ঘকালের লেখিকা জীবনে অনেকবার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে তাঁকে। তিনি নাকি তাঁর সব পরিচিত জনেদের মধ্যে থেকে বেছে বেছে কাউকে কাউকে অপদস্থ করতে তাঁর গল্পের নায়ক-নায়িকা সৃষ্টি করেছেন।
অবশ্য কাহিনীর মধ্যেকার মহৎ চরিত্রগুলি সম্পর্কে এ ধরনের দাবি কেউ করে না। হাস্যকর অথবা ক্ষুদ্রতা তুচ্ছতার মধ্যে নিমজ্জিত চরিত্রগুলিতেই নাকি অনামিকা দেবীর কুটিল প্রচেষ্টা দেখতে পায় পরিচিত জনেরা। তাই মুখ কালো করে বলে, এ তো আমাকে নিয়েই লেখা।…বলে, তোমার মনের মধ্যে এই সব ছিল তা জানতাম না। তা এতোটা অপদস্থ না করলেও পারতে।
তারা নিজেরা ধরতে না পারলেও বন্ধু-বান্ধবেরা নাকি চোখে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দেয়, এই দেখো তোমার অমুক দেবী এবার তোমাকে একহাত নিয়েছেন!
তা অমলবাবুর ক্ষেত্রেও নাকি ওই বন্ধুরাই জ্ঞানাঞ্জনশলাকার কাজ করেছিলেন।
বন্ধুর শলাকার পর তো আর কোন শলাকাই কাজ করে না। কাজেই সেজদির যুক্তি মাঠে মারা গেছে। আমায় নিয়ে লিখেছে ভেবে খাপপা হয়েছিলেন অমলবাবু!
আবার এমন অনুরোধও বার বার আসে-আমায় নিয়ে লেখো-
না লিখলে ভাবে অবহেলা করলো।
কিন্তু আসলে যে সত্যিকারের কোনো একজনকে নিয়ে কোনো একটা সত্যিকার চরিত্র সৃষ্টি করা যায় না, এ সত্যটা কেউ ভেবেও দেখে না।
হয়তো জানেই না!
জানে না অথবা মানে না যে ওটার নিয়ম অনেকটা বৃষ্টির মত।
পৃথিবীর মাটি থেকে ওঠা জলটাই আবার জল হয়ে পৃথিবীতে এসে পড়ে বটে, তবু দুটোই এক নয়। সে জলকে আগে বাষ্প হতে হয়, তারপর মেঘ হতে হয়, তবেই তার আবার বৃষ্টি হয়ে পড়ার লীলা।
তেমনি নিয়মেই প্রায় বহু চরিত্রের, আর বহু বৈচিত্র্যের সংস্পর্শে আসা অনুভূতির বাষ্পও মনের আকাশে উঠে জমা হয়ে থাকে চিন্তা হয়ে। তারপর কোনো এক সময় চরিত্রে রূপায়িত হয়ে কলমে এসে নামে।
কিন্তু এত কথা বোঝানো যায় কাকে? বুঝতে চায় কে? তার থেকে তো রাগ করা অনেক সোজা। অনেক সোজা ভুল বুঝে অভিমান করা।
যাকে নিয়ে লেখা হল না, সে-ও আহত। আর আয়নায় যে নিজেকে দেখতে পেলো সে-ও আহত। অতএব তারা দূরে সরতে থাকে।
অবশ্য এ সমস্যা কেবলমাত্র পরিচিত জন্যেদের নিয়ে।
যারা দূরের, তারা তো আবার ওই আয়নায় মুখ দেখতে পাওয়ার সূত্রেই কাছে এসে দাঁড়ায়। আনন্দের অভিব্যক্তি নিয়ে বলে, ইস, কী করে লিখেছেন! মনে হচ্ছে ঠিক আমাদের কথা!
অনামিকা দেবীও হাসেন।
বলেন, আপনাদের কথা ছাড়া আর কোথায় কথা পাবো বলুন? আমি তো আপনাদেরই একজন। আকাশ-পাতাল এক করে কথা খুঁজতে যাই এমন ক্ষমতা নেই আমার। আপনারাই যদি আমার ফসল তো, আপনারাই আমার সার। পাঠক পাঠিকাই আমার নায়ক নায়িকা।
কিন্তু অমলবাবুকে এসব কথা বোঝানো যায়নি। অমলবাবু তদবধি সেজদিকে আসতেই দেয়নি এ বাড়িতে।
আশ্চর্য অভিমান মানুষকে কী নির্বোধ করে তোলে! অথবা মানুষজাতটাই নির্বোধ!
বকুলের কথা লেখবার দায়িত্ব নিয়ে বকুলকে ভাবতে ভাবতে, বকুলের সঙ্গে কখন যেন একাত্মা হয়ে যান অনামিকা দেবী। ওই বানানো নামের খোলস খুলে পড়ে, আর সেদিন অনেকদিন আগে বকুল যে-কথা ভেবেছিল, সেই কথাই ভাবতে বসেন তিনি, সত্যি মানুষ কি নির্বোধ!
শুধু দুটো মাত্ৰ হাত দিয়ে শতদিক সামলাবার কী দুঃসহ প্ৰয়াস তার! শুধু দুটো মুঠোর মধ্যে সমন্ত পৃথিবীটাকে পুরে ফেলবার চেষ্টায় কী তার জীবন-পণ! কতো তাব দুশ্চিস্তা, কতো তার ষড়যন্ত্ৰ!
অথচ মুহূর্তে সে মুঠি আলগা করে ফেলে চলে যেতে হয় পৃথিবী ছেড়ে! হাত দুখানা সব কিছু সামলানোর দায়িত্ব থেকে কী সহজেই না মুক্তি পায়!
অমলবাবু তার চাকরিতে অধিক উন্নতি করবার জন্যে কী আপ্রাণ চেষ্টাই না করছিলেন, অমলবাবু তার স্ত্রীকে মুঠোর মধ্যে ভরে রাখতে কী দুঃসহ ক্লেশই না। স্বীকার করেছেন, স্ত্রীর শুধু দৈহিক মঙ্গলই নয়-ঐহিক, পারিত্রিক, নৈতিক, চারিত্রিক, সববিধ মঙ্গলের দায় নিয়ে ভদ্রলোক দিশেহারা হয়ে যেতেন, কিন্তু কতো কম নোটিশে চলে যেতে হল তাকে! কত অস্বস্তি বুকে নিয়ে!
সেজদি বলেছিল, দেখ বকুল, স্বৰ্গ জায়গাটা সত্যিই যদি কোথাও থাকে, আর সেখান থেকে এই মর্ত্যলোককে দেখতে পাওয়া যায়, তাহলে তো অবিশ্যিই আমায় দেখতে পাচ্ছে। বেচারা মরেও কী যমযন্ত্রণা পাচ্ছে তাই ভেবে দুঃখিত হচ্ছি।
বকুল বলতো, তোর মতো দজ্জাল বেপরোয়া স্ত্রীকে মনে রাখতে তার দায় পড়েছে।
সেজদি বলতো, দজ্জাল বেপরোয়াদেরই তো মনে রাখে মানুষ। দেখিস না-স্বয়ং ভগবান ও সাধুসজনদের মনে না রেখে, অহরহ জগাই-মাধাইকে মনে রাখেন, মনে রাখেন কংস, জরাসন্ধ, হিরণ্যকশিপুদের।…এই যে লোকটি আমায় চোখের আড়াল করতো না, সেও তো ওই আমি দজ্জাল আর বেপরোয়া বলেই। শিষ্ট শান্ত সাধ্বী নারী হলে কবে আমায় ভুলে মেরে দিয়ে ভাঁড়ার ঘরের এককোণে ফেলে রেখে দিতো।…তাই ভাবছি কী ছট্ফট করছে ও, যদি সত্যি দেখতে পায়।
কিন্তু নাঃ, দেখতে পাওয়া যায় না। মানুষ বড় অসহায়।
সৰ্ব্বস্ব নামিয়ে রেখে সর্বহারা হয়ে চলে যেতে হয় তাকে।
তারপর আর কিচ্ছু করার নেই।
করার থাকলে আজ প্ৰবোধচন্দ্রের পৌত্রী প্ৰবোধচন্দ্রের ভিটেয় বসেই প্ৰেম করাটাকে মস্ত একটা বাহাদুরি মনে করে মহোল্লাসে তার পিসির কাছে এসে বলতে পারে, পিসি, বললে তুমি বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, আবার একটা নতুন শিকার জালে ফেলেছিা!
