রাগে ব্ৰহ্মাণ্ড জ্বলে গিয়েছিল প্ৰবোধচন্দ্রের। উঃ, সেই মিটমিটে পাজী চরিত্রহীন শয়তানটা এখনো আমার মেয়েটার মাথা খাচ্ছে! বিয়ে করেছিস, বিদেশ চলে গেছিস, তবু দুষ্প্রবৃত্তি যাচ্ছে না?…এনভেলাপে চিঠি লিখছিস? এতো আসপদ্দা যে, কেয়ার অবটা পর্যন্ত দেবার সৌজন্য নেই!
প্রবোধচন্দ্রের অভিভাবক-সত্তা গৃহকর্তা-সত্তা, দুটো একসঞগে চাড়া দিয়ে উঠেছিল।
প্ৰবোধচন্দ্ৰ ধমকে উঠেছিলেন, খোলো চিঠি, দেখতে চাই আমি।
দেখতে চান সে তো দেখতেই পাচ্ছি—, বকুল খামখানা আবার বাপের টেবিলেই ফেলে দিয়ে বলেছিল, জলে ভিজিয়ে আড়ালে খোলবার চেষ্টা না করে এই অনামিকা দেবীর চিঠি এলে আপনি খুলেই দেখবেন বাবা।
তারপর চলে গিয়েছিল ঘর থেকে।
বাপের অবস্থার দিকে আর তাকিয়ে দেখে যায়নি।
অথচ এই কিছুদিন আগেও বকুল বাপের মুখের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারতো না। হঠাৎ এই সাহসটা তাকে দিল কে? এই অনামিকা দেবী? যার নামে কোনো এক কাগজের সম্পাদক চিঠি পাঠিয়েছে, আপনার গল্পটি আমাদের মনোনীত হয়েছে। আগামী সংখ্যার জন্য আর একটি গল্প পাঠালে বাধিত হবো।
নাকি নির্মলের বিয়ে উপলক্ষ করে যে-বকুল উদঘাটিত হয়ে গিয়েছিল, সেই বকুল স্থির করেছিল পায়ের তলার মাটিটা কোথায় সেটা খুঁজে দেখতে হবে। হয়তো সেটা খুঁজেও পেয়েছিল বকুল। তাই বকুল তার খাতার একটা কোণায় কবে যেন লিখে রেখেছিল, ভয় করতে করতে এমন অদ্ভূত অভ্যাস হয়ে যায় যে, মনেই পড়ে না ভয় করার কোনো কারণ নেই। অভ্যাসটা ছাড়া দরকার।
আর মনের মধ্যে কোনখানে যে লিখেছিল, নির্মলকে সেজদি ধিক্কার দেয়, কিন্তু আমি ওকে ধন্যবাদই দিই। ওর কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। ও আমার নৌকোখানাকে দাঁড় বেয়ে খেয়া পার করে দিতে পারেনি বলেই না সেটা স্রোতের টানে সাগরে এসে পড়েছে।
তা এই সাগরটি উপমা মাত্র হলেও প্ৰবোধচন্দ্রের অনামিকা দেবী একটা বিস্ময়ের ঘটনা, বৈকি।
অনামিকা দেবীর নামের সেই চিঠিখানা প্ৰেমপত্র না হলেও, সেটা নিয়ে বাড়িতে কথা উঠেছিল কিছু। বকুলের বড়দা সেই না-দেখা সম্পাদকের উদ্দেশে মুচকি হেসে বলেছিল, শালুক চিনেছে গোপাল ঠাকুর!
বকুলের ছোড়দা যার ডাকনাম মানু-বকুল পারুল ওকেই ছোড়দা বলে। সুবল ছিল শুধু সুবল! সে তো এখন শুধু একটা নাম, দেয়ালের একটা ছবি। সে থাকলে হয়তো ইতিহাস একটু অন্যরকম হতো। তা সেই ছোড়দা হেসে বলেছিল, মেয়ে বলেই তাই লেখা ছেপে দিয়েছে!..শুনতে পাস না ইউনিভাসিটিতে পর্যন্ত গোবর মাথা মেয়েগুলোকে কি রকম পাস করিয়ে দিচ্ছে? ওই লেখা একটা বেটা ছেলের নাম দিয়ে পাঠালে, দেখতে স্রেফ ওয়েস্টপেপার বাস্কেটে চলে গেছে!
আর বকুলের বড়বৌদি অবাক-অবাক গলায় বলেছিল, নামডাক হবার জন্যেই তো লোকে বই লেখে বাবা, ইচ্ছে করে নাম বদলে লেখে, এ তো কখনো শুনিনি! লেখাটা যে তোমারই তা প্রমাণ হবে কী করে ভাই? এই আমিই যদি এখন বলি, আমিই অনামিকা দেবী?
বলো না, আপত্তি কি? বলে হেসে চলে গিয়েছিল বকুল।
বৌদি যে রীতিমত অবিশ্বাস করছে তা বকুল বুঝতে পেরেছিল।
ইতিপূর্বেও তার লেখা ছাপা হয়েছিল, কিন্তু সে খবরটা নিতান্তই বকুলের নিজের আর নির্মলের বাড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, এ বাড়িতে ধাক্কা দেয়নি।
এবার ধাক্কা দিল বলেই ধাক্কা উঠলো।
আরও একটা ধাক্কার খবর পাঠিয়েছিল সেজদি পারুল।
লিখেছিল.এদিকে তো দিব্যি এক কাণ্ড বাধিয়ে বসেছিস। তোর গল্প নিয়ে তো এখানে পুরুষমহলে বেজায় সাড়া উঠেছে। নবীন ভারত পত্রিকাখানা এখানে খুব চালু কিনা।…তা ওনারা বলেছেন, নিরুপমা দেবী, অনুরূপ দেবী, প্রভাবতী দেবী এসব তো জানি, এই নতুন দেবীটি আবার কে? এ নির্ঘাত কোনো মহিলার ছদ্মনামে পুরুষ।…লেখার ধরন যে রকম বলিষ্ঠ—…অর্থাৎ বলিষ্ঠ হওয়াটা পুরুষেরই একচেটে!
তোর বুদ্ধিমান ভগ্নীপতিটি অবশ্য লেখিকার আসল পরিচয়টা কারো কাছে ফাস করে বসেননি, কিন্তু নিজে তো জানেন। তিনি বিষম অপমানের জ্বালায় জ্বলছেন। কেন জানিস? তিনি নাকি ওই গল্পের ভিলেন নায়কের মধ্যে নিজের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন।
যত বোঝাচ্ছি, গল্পটার নাম যখন আয়না, তখন ওর মুখোমুখি হলে তো নিজের ছায়া দেখা যাবেই, কিন্তু নিজেকে কেন তুমি–তা কে শোনে এসব সুযুক্তির কথা। বলছেন, ওনার শালী নাকী ওনাকে অপমান করতেই এমন একখানা মর্মান্তিক চরিত্র সৃষ্টি করেছে। তখন হেসে বলতেই হলো, শালী তাহলে শালীর মতই ব্যবহার করেছে। দেখ, তোদের অমলবাবুর সামনে গ্ৰাম্য ভাষা ব্যবহার করেছি বলে ছিছি করিস নে। বাংলা ভাষা মেয়েদের সম্পর্কে যে কত উদাসীন তা প্রতি পদেই টের পাবি। মানে লিখতে যখন বসেছিস, লক্ষ্য পড়বেই…শালার সম্পর্কে সম্বন্ধী বড় কুটুম্ব দুএকটা কথা তবু আছে, কিন্তু শালী? বড় জোর শ্যালিকা! ছিঃ! কোনো গুণবাচক শব্দ খোঁজ, নেই, মেয়েদের জন্যে কিছু নেই। অতএব বলতে হবে মহিলা কবি মহিলা সাহিত্যিক, মহিলা ডাক্তার ইত্যাদি ইত্যাদি, দেখিস মিলিয়ে মিলিয়ে। কাজে কাজেই শালী ছাড়া উপায় কি? তা লোকটা বলে কিনা ঠিক বলেছি, যা সম্পর্ক তেমনি ব্যবহার করেছে তোমার বোন!
এ কথাও বললাম, তোমার ছায়াই বা দেখছো কেন? তুমি কি অত নিষ্ঠুর?
সে সাত্ত্বনায় কিছু হচ্ছে না।
১২. সান্ত্বনায় কিছু হয় না
হয় না। তেমন সান্ত্বনায় কিছু হয় না।
