এই মুক্তির মধ্যে মাধুরী-বৌ যেন বকুলকে এক নিবিড় বন্ধনে বেঁধে ফেললো। আর সেই সূত্রে নির্মলের সঙ্গে সম্পর্কটা হঠাৎ আশ্চর্য রকমের সহজ হয়ে গেল।
বকুল যেন মাধুরীরই বেশী আপন হয়ে উঠলো। বকুল যেন নির্মলের সঙ্গে ব্যবহারে শ্যালিকার ভূমিকা নিলো। প্রখর কৌতুকময়ী মুখরা শ্যালিকা।
হ্যাঁ, ওই সময়টা থেকেই একেবারে বদলে গিয়েছিল বকুল। এই কিছুদিন আগেও কী ভীরু আর লাজুক ছিল সে। সেই ভীরু কুণ্ঠিত লাজুক কিশোরীর খোলস ভেঙে যেন আর একজন বেরিয়ে এসেছে। প্রখরা পূর্ণযৌবনা, অসমসাহসিকা।
নির্মল তার অসমসাহসিক কথাবার্তায় ভয় পেতো, অবাক হত আর বোধ করি আরও বেশী আকৃষ্ট হত। বকুল তখন ওকে ব্যঙ্গ-কৌতুকের ছুরিতে বিধতো। মাধুরী-বৌ সেই কৌতুকে হাসতো, কৌতুক বোধ করতো।
কেদার-বদরী ঘুরে এসে জেঠাইমা দেখলেন সংসারের যে জায়গাটি থেকে তিনি সরে গিয়েছিলেন, সে জায়গাটি যেন আর নেই। যেন কে কখন তার শূন্য সিংহাসনটা কোন দিকে ঠেলে সরিয়ে রেখে নিজেদের আসর বসিয়েছে। হয়তো এমনই হয় সংসারে।
কোনো শূন্য স্থানই শূন্য থাকে না।
সেখানে অন্য কিছু এসে দখল করে।
নির্মলের বৌ যেন জেঠশাশুড়ীর থেকে নিজের শাশুড়ীকেই প্রাধান্য দেয় বেশী, পুরনো ঝি চাকারগুলো পর্যন্ত যেন আর বড়মার ভয়ে তটস্থ হয় না। কেবলমাত্র নির্মলই ছিল আগের মূর্তিতে।
বড়মা এ দৃশ্য দর্শনে কোমর বেঁধে আবার নতুন করে লাগছিলেন, দুবাড়ির শ্ৰীক্ষেত্র ভাবটা দূর করতে চেষ্টিত হচ্ছিলেন, এই সময় মোতিহারিতে বদলি হয়ে গেল নির্মল।
মাধুরী-বৌ চলে গেল বরের সঙ্গে।
হয়তো সেটাই বকুলের প্রতি তার বিধাতার আশীর্বাদ। জেঠাইমা আবার নতুন করে কি কলঙ্ক তুলতেন বকুলের নামে কে জানে! কারণ একদিন বাড়ি বয়ে এসে ঝগড়া করে গেলেন তিনি। বললেন, এ যুগে আর জাত যায় না বলে কি মেয়ের বিয়ে দেবে না ঠাকুরপো? মেয়েকে বসিয়ে রাখবো?
প্ৰবোধচন্দ্র মাথা নীচু করে ছিলেন।
প্ৰবোধচন্দ্ৰ কিছু বলতে পারেননি। তারপর উনি চলে যাওয়ার পর সব ঝাল ঝেড়েছিলেন বকুলের উপর।
যাক ওসব কথা।
এখন আর ও নিয়ে ভাববার কিছু নেই। নির্মল তারপর অনেক দূরে চলে গেল।
মোতিহারীর মতো নয়, অনেক অনেক দূরে।
কিন্তু সে কবে?
বকুল তখন কোথায়?
তখন কি তার ওই বকুল নামের খোলসটার মধ্যেই আবৃত ছিল সে?
না, তখন আর বকুল নামের পরিচয়টুকুর মধ্যেই নিমগ্ন ছিল না সে। ছড়িয়ে পড়েছিল আর এক নতুন নামের স্বাক্ষরে। সেই নতুন নামটার ভেলায় চড়ে বেরিয়ে এসেছিল নালা থেকে নদীতে, ডোবা থেকে সমুদ্রে।
.
ক্রমশঃ সেই নতুন নামটাই পুরনো হয়ে গেছে, পরিচয়ের উপর শক্ত খোলসের মত এটে বসেছে। কিন্তু তখনো ততোটা বসেনি। তখন ওই নতুন নামটার ভেলাখানা যেন নিঃশব্দে ঘাটে এসে দাঁড়িয়েছে। ও যে বকুল নামের নেহাত তুচ্ছ প্ৰাণীটাকে নাম খ্যাতি পরিচিতির ঘাটে ঘাটে পৌঁছে দিয়ে যাবে, এমন কোনো প্ৰতিশ্রুতিও বহন করে আনেনি। বরং বেশ কিছু অপ্রীতিকর অথচ কৌতুকাবহ ঘটনাই ঘটিয়েছিল।
তার মধ্যে সর্বপ্ৰথম ঘটনা হচ্ছে সেই নামে একটা খামের চিঠি আসা।
চিঠিখানা পড়েছিল প্ৰবোধচন্দ্রের হাতে। কারণ প্ৰবোধচন্দ্র সর্বদাই বাইরের দিকের ঘরে সমাসীন থাকেন, রাত্রে ছাড়া দোতলায় ওঠেন না। সিড়ি ভাঙতে কষ্ট হয়। পথে বেরোনোও তো প্রায় বন্ধ।
রোগী সেজে-সেজেও আরো নিজের পথে নিজে কাঁটা দিয়ে রেখেছেন প্ৰবোধচন্দ্ৰ। ছেলেমেয়েয়া যদি কোনো সময় বলেছে, বাবা, সর্বদা আপনি এই একতলার চাপা ঘরখানায় বসে থাকেন, একটুখানি বাইরে বেড়িয়ে আসতেও তো পারেন–
প্ৰবোধচন্দ্ৰ ক্ষুব্ধ ভর্ৎসনায় তাদের ধিকৃত করেছেন, বেড়িয়ে? বেড়িয়ে আসবার ক্ষমতা থাকলে আমি সর্বদা এই কুয়োর ব্যাঙের মত এখানে পড়ে থাকতাম? …তোমরা বলবে তবে বেরবো এই অপেক্ষায়? আমার প্রাণ হাঁপায় না?…কী করবো, ভগবান যে সব ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে! তোমরা বিশ্বাস না করো, ভগবান জানছে আমার দেহের মধ্যে কী হচ্ছে! হাত-পা তুলতে কাঁপে, চোখে অন্ধকার দেখি,ইত্যাদি ইত্যাদি…
অতএব প্ৰবোধচন্দ্র ওই কুয়োর ব্যাঙের মতই মলিন শতরঞ্চি পাতা একখানা চৌকিতেই দেহভার অর্পণ করে বসে বসে হিসেব রাখেন, কে কখন বেরোয়, কে কখন ফেরে, গোয়ালা কতটা দুধ দিয়ে যায়, ধোবা ককুড়ি কাপড়ের মোটের লেনদেন করে, পিয়ন কার কার নামে কখানা চিঠি আনে।
চিঠিগুলি অবশ্য সব থেকে আকর্ষণীয়।
পিয়নের হাত থেকে সাগ্রহে প্রায় টেনে নিয়ে প্ৰবোধচন্দ্র সেগুলি বেশ কিছুক্ষণের জন্য নিজের কাছেই রাখেন, চাটু করে যার জিনিস তাকে ডেকে দিয়ে দেন না। এমন কি সে ব্যক্তি কোনো কারণে ঘরে এসে পড়লেও, তখনকার মত চাটু করে বালিশের তলায় গুঁজে রেখে দেন।
কেন?
তা প্ৰবোধচন্দ্র নিজেও বলতে পারবেন কিনা সন্দেহ। হয়তো তার সৃষ্টিকর্তা বললেও বলতে পারেন। তবে প্ৰবোধচন্দ্ৰ জানেন যে, চিঠি যার নামেই আসুক, পোস্টকার্ডগুলি পড়ে ফেলা তার কর্তব্য, এবং খামের চিঠির নাম ঠিকানার অংশটুকু বার বার পড়ে পড়ে আন্দাজ করে নেওয়া কার কাছ থেকে এসেছে। এটা তিনি রীতিমত দরকার মনে করে থাকেন।
বেশীর ভাগ চিঠিই অবশ্য বৌমাদের বাপের বাড়ি থেকে আসে, হাতের লেখাটা অনুমান করতে ভুরু কুঁচকে কুঁচকে বার বার দেখতে থাকেন প্ৰবোধচন্দ্র, এবং স্মরণ করতে থাকেন এই হস্তাক্ষরের চিঠি শেষ কবে এসেছিল।
