বকুল যদি দেখে নির্মল বৌয়ের ধারে-কাছে ঘুরঘুর করছে, নিশ্চয় বকুল ঘৃণায় ধিক্কারে ব্যঙ্গ হাসি হেসে উঠবে। আর জেঠাইমা যদি দেখেন-হতভাগা গাধাটা বিয়ের পরও ওই পাজি মেয়েটোর আনাচে-কানাচে ঘুরছে, রসাতল করে ছাড়বেন।
বৌয়ের কাছে?
না, বৌয়ের জন্যে ভয় নেই নির্মলের! বৌয়ের কাছে তো নিজেকে উদঘাটিত করেছে সে।
বলেছে তার কাছে আবাল্যের ব্যাকুলতার ইতিহাস।
বলেছে, ওকে ভুলতে আমার সময় লাগবে, তুমি আমায় ক্ষমা কোরো।
বৌ তখন অদ্ভুত আশ্চর্য একটা কথা বলেছিল। বলেছিল, তুমি যদি ওকে ভুলে যাও, তাহলেই বরং তোমাকে কখনো ক্ষমা করতে পারবো না। মনে করবো তুমি একটা অসার মানুষ।
তুমি আমার দুঃখ বুঝতে পারছে মাধুরী?
চোখ দিয়ে জল পড়েছিল ওর।
মাধুরী বলেছিল, মানুষের প্রাণ থাকলেই মানুষের দুঃখ বোঝা যায়। তা আমাকে কি তোমার সেই রকম মনপ্রাণহীন পাষাণী মনে হচ্ছে?
তারপর নির্মল কি বলেছিল, সে কথা অবশ্য বকুল জানে না।
কিন্তু এতো কথাই বা জানলো কি করে বকুল? বকুল কি আড়ি পাততে গিয়েছিল নির্মলের ঘরে? না, তেমন অসম্ভব ঘটনা ঘটেনি।
বলেছিল নির্মলই স্নান বিষণ্ণ মুখে। নির্মলের মুখে তখন চাঁদের আলোর মত একটা স্নিগ্ধ আলোর আভাস ফুটে উঠেছিল। নির্মল তার ওই দেবীর মত মেয়ে বৌয়ের মহিমান্বিত হৃদয়ের পরিচয়ে বিমুগ্ধ হতে শুরু করেছে, নির্মল আস্তে আস্তে তার প্রেমে পড়তে শুরু করেছে তখন। আর নির্মল যেন তাই ব্যাকুল হয়ে বকুলকে বোঝাতে চেষ্টা করেছে নির্মল কতো নিরুপায়!
এর থেকে যদি খুব দুষ্ট পাজি ঝগড়াটে একটা মেয়ে আমার বৌ হত!
নিঃশ্বাস ফেলে বলেছিল নির্মল।
বকুল হেসে ফেলেছিল।
বকুল যেন তখন অনেক বড় হয়ে গিয়েছিল নির্মলের চেয়ে।
নির্মলের বিয়েটাকে ঘিরে যতো সব ঘটনা ঘটেছিল, সেই ঘটনাগুলো যেন বকুলকে ঠেলে হঠাৎ একদিনে একটা দশক পার করে দিয়েছিল।
বকুলের বৌদিরা বলেছিল, ঢের বেহায়া মেয়ে দেখেছি বাবা, ছোট ঠাকুর ঝির মত এমনটি আর দেখলাম না! নইলে ওই বিয়েতে নেমন্তন্ন যায়, পদ্য লিখে দেয়!
বকুলের বাবা বলেছিলেন, যেতেই হবে? এতো কিসের চক্ষুলজা? বলি এতো কিসের চক্ষুলজ্জা? বেশ তাই যদি হয়, অসুখ করেছে বলে বাড়িতে থাকলেই হত? অসুখের তো কথা নেই!
বকুলের দাদারা বলেছিল, কি করবো, ও-বাড়ির কাকা নিজে এলেন তাই, তা নয়তো এক প্ৰাণীও যেতাম না। তবে ধারণা করিনি বকুল যাবে!
বকুলের ভালবাসার ইতিহাস আন্দাজে অনুমানে সকলেই জানতো এবং রাগে ফুলতো, আর কেবলমাত্র বড় হওয়ার অজুহাতটাকেই বড় করে তুলে ধরে তাকে শাসন করতো, কিন্তু উদঘাটন করেনি কেউ। খোলাখুলি বলেনি কেউ। পারুলের ব্যর্থ চেষ্টাই সব উদঘাটিত করে বসলো। পারুলের ব্যর্থতার পর সে চলে গেলে জেঠাইমা একদিন এ বাড়িতে এসে মিষ্ট মধুর বচনে অনেক যাচ্ছেতাই করে গেলেন, এবং বৌদের ওপর ভার দিয়ে গেলেন পরিবারের সুনাম রক্ষার।
বলে গেলেন, শাশুড়ী নেই, তোমাদেরই দায়। যতোদিন না বিয়ে দিতে পারছ, ননদকে চোখে চোখে রাখবার দায়িত্ব তোমাদেরই, আর স্বামী-শ্বশুরকে বলে বলে বিয়েটা দিয়ে ফেল চটপট! বয়সের তো গাছপাথর নেই আর!
সে-কথা বকুলের কানো যায়নি তা নয়।
সেই কথার পর যে আবার কোনো মেয়ে সে বাড়িতে যায়, এ বৌদিরা ভাবতেই পারেনি।
অথচ বকুল গিয়েছিল।
হয়তো বকুল ওই জেঠাইমাকে ওদের বাড়ির প্রকৃত মালিক মনে করতো না অথবা বকুল না গিয়ে থাকতে পারেনি।
বিয়ে করে ফিরে নির্মলের মুখটা কেমন দেখায় দেখতে বড় বেশী বাসনা হয়েছিল। কিন্তু বকুল উদাসীন থেকেছিল, বকুল নিষ্ঠুর হয়েছিল।
নির্মল যখন সেই ভোজবাড়ির গোলমালে একবার বকুলের নিতান্ত নিকটে এসে বদ্ধগম্ভীর গলায় ডেকেছিল, বকুল!
বকুল তখন ব্যন্ত হয়ে বলেছিল, ওমা তুমি এখানে? দেখা গে তোমার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা এসে গেছে বোধ হয়। যাও যাও।
নির্মল আরো সন্নিকটে এসে বলেছিল, বকুল, তুমি আমায় কী ভাবছো জানি না—
বকুল কথা শেষ করতে দেয়নি।
বলে উঠেছিল, হঠাৎ আমি তোমায় কী ভাবছি, এ নিয়ে মাথা ঘামাতে বসছো কেন? আর তোমার কথা নিয়ে আমিই বা ভাবতে বসবো কেন?
বকুল—
সব কিছুরই একটা সীমা আছে নির্মলদা। বলে চলে গিয়েছিল বকুল।
আর তারপর থেকে যতোবারই নির্মল নিকটে আসবার চেষ্টা করেছে, বকুল সরে গেছে।
কিন্তু সেদিন ঘরে নতুন বৌ ছিল।
নির্মল ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে যেন দেয়ালকে উদ্দেশ করে বলেছিল, মা বললেন, মা এখন আর আসতে পারবেন না, সব কিছু দেরাজে তুলে রাখতে।
বকুল হাতের জিনিসগুলো নামিয়ে রেখে বলেছিলো, শুনলে তো বৌ হুকুম? তা হলে রাখো তুলে, বরের একটু সাহায্য নিও বরং। বলে নির্মলের পাশ কাটিয়ে চলে গিয়েছিল।
বকুলের সেই নিষ্ঠুরতা ভেবে আশ্চর্য লাগে অনামিকা দেবীর। অতো নির্মম হয়েছিল কি করে সেদিন বকুল? কোন পদগৌরবেই বা? নির্মলের বৌ তো বকুলের থেকে দশগুণ বেশী সুন্দরী, তার ওপর আবার অবস্থাপন্ন ঘরের মেয়ে!
আর বকুল? কিছু না। বকুল তো শুধু নির্মলের দেওয়া মৰ্যাদাতেই এতোখানি মূল্যবান। অথচ বকুল—
.
কিন্তু তারপর বদলে গেল বকুল।
নির্মলের বিয়ের পর জেঠাইমা বোধ করি নিশ্চিন্ত হয়েই কেদারবদরী গেলেন কিছু বান্ধবী জুটিয়ে। সেই পরম সুযোগে নির্মলের মা আর বৌ এ-বাড়ি ও-বাড়ি এক করে তুললো। মাধুরী-বৌয়ের তো এই বাড়িটাই একটা বেড়াতে আসার জায়গা হল। নির্মলের মাও যেন একটা ভারী জাঁতার তলা থেকে বেরিয়ে এসে বেঁচেছিলেন দুদিনের জন্যে।
