বকুল সেই ধরা হাতটায় একটা গভীর চাপ দিয়ে বলে, তোমার বাইরের রূপও অতুলনীয়, ভেতরের রূপও অতুলনীয়।
মাধুরী-বৌ একটুক্ষণ চুপ করে থেকে আস্তে বলে, প্রথম ভালবাসার কাছে কোনো কিছুই লাগে না।
বকুলের বুকটা কেঁপে ওঠে, বকুলের মাথাটা যেন ঝিমঝিম করে আসে, নিজের সম্বন্ধে ভালবাসা শব্দটা অপরের মুখে এমন স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হতে এর আগে কি কোনোদিন শোনেনি বকুল? পারুল তো বলেছে কতো!
কিন্তু এ যেন অন্য কিছু, আর কিছু।
নির্মলের বিয়ের ব্যাপারের গোড়া থেকে নিজেকে কেবলই অপমানিত মনে হয়েছে বকুলের, এখন হঠাৎ নিজেকে যেন অপরাধী মনে হলো। যেন বকুল নির্লজ্জের মত কারো ন্যায্য প্ৰাপ্যে ভাগ বসিয়ে রেখেছে। এখন বকুল নিজেকে সেই দাবিদারের থেকে অনেক তুচ্ছ ভাবছে।
ওই মেয়েটার কাছে বকুল শুধু রূপেই তুচ্ছ নয়, মহিমাতেও অনেক খাটো।
বকুল নিজেকে সেই তুচ্ছর দরেই দেখতে চেষ্টা করলো।
মাধুরী-বৌয়ের কথায় হেসে উঠে বললো, ওরে বাস! খুব লম্বা-চওড়া কথা বলে নির্মলদা তো দেখছি তোমার কাছে নিজের দর বাড়িয়ে ফেলেছে! ওসব হচ্ছে স্রেফ কল্পিত কল্পনার ব্যাপার, বুঝলে?
এটা তুমি লজ্জা করে বলছো—, মাধুরী-বৌ মৃদু হেসে বলে, মেয়েরা তো সহজে হার মানে না। পুরুষমানুষ মনের ব্যাপারে অতো শক্ত হতে পারে না। তা ছাড়া ও তো একেবারে–
মাধুরী-বৌ নিজেই বোধ করি লজ্জায় চুপ করে গিয়েছিল।
বকুল সেই পরম সুন্দর মুখটার দিকে যেন মোহগ্রস্তের মত তাকিয়ে রইল। এই ঐশ্বর্যের মালিক হয়েছে নির্মল নামের ছেলেটা?
বকুল কি নির্মলকে হিংসে করবে?
এ-যুগের কাছে কী হাস্যকরই ছিল সেকালের সেই জোলো-জোলো প্ৰেম ভালবাসা!
অনামিকা দেবী সেই বহু যুগের ওপর থেকে ভেসে আসা আষাঢ়ের দিকে তাকিয়ে প্রায় হেসে উঠলেন।
এখনকার মেয়েরা যদি বকুলের কাহিনী শোনে, স্রেফ বলবে, শ্ৰীমতী বকুলমালা, তোমাকে ফ্রেমে বাঁধিয়ে দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখা উচিত!
তুমি কিনা তোমার প্ৰেমপাত্তরের প্রিয়ার রূপে গুণে মুগ্ধ হয়ে তার প্রেমে পড়ে বসলে?
তার সেই রূপসী প্রিয়া যখন বললো, তোমার ওপর ঈর্ষা কেন হবে ভাই? ও তোমায় এতো ভালবাসে বলেই তো আমারও তোমাকে ভালবাসতে ইচ্ছে করছে। তোমার সঙ্গে আমি বন্ধু পাতালাম আজ থেকে।
তুমি তখন একেবারে বিগলিত হয়ে বন্ধুত্বের শপথ নিয়ে বসলে! নির্মল নামের সেই ভাবপ্রবণ ছেলেটা না হয় প্রথম ঝোঁকে নতুন বৌয়ের কাছে অনেস্ট হয়েছে, প্রথম ভালবাসার বড়াই করে কাব্যি করেছে, কিন্তু তুমি সেই ফাঁদে ধরা দিলে কী বলে?
বেশ তো বলছিলে, বেশী গল্প উপন্যাস পড়েই এই ঢং হয়েছে নির্মলদার, দেবদাস হতে ইচ্ছে হচ্ছে, শেখর হতে ইচ্ছে হচ্ছে, তিলকে তাল করে তোমার কাছে হীরো হয়েছে!
বেশ তো বলছিলে, এই সব আজেবাজে কতকগুলো কথা তোমার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়ে নির্মালদার কী ইষ্টসিদ্ধি হল জানিনে বাবা! বাজে কথায় কান দিও না।
বলেছিলে, সংসার জায়গাটা স্রেফ বাস্তব, বুঝলে বৌঠাকরুণ! ওসব কাব্যিটাব্যি চলে না। বিশেষ করে যেটা প্রবল প্ৰতাপ শ্ৰীমতী জেঠিমার সংসার।–
তারপর-হঠাৎ তবে ওই মেয়েটার কোমল করপল্লবখানা হাতে ধরে স্তন্ধ হয়ে বসে রইলে কেন অনেকখানি সময়? কেন তারপর আস্তে নিঃশ্বাস ফেলে বললে, আচ্ছা, বন্ধুত্বই পাতালাম।
তার মানে তোমার সব গর্ব ধূলিসাৎ হল, তুমি ধরা দিলে!
একটি সরল পবিত্রতা, একটি ভালবাসার হৃদয়, একটি হিংসাশূন্য, অহঙ্কারশূন্য, নির্মল মন অনেক কিছুই বদলে দিতে পারে বৈকি। সকল গর্ব চুৰ্ণ করে দিয়ে একেবারে জয় করে নিতে পারে সে।
বকুলও বিজিত হল।
মাধুরী নামের মেয়েটার ওই অদ্ভুত জীবনদর্শন বকুলকে আকৃষ্ট করলো, আবিষ্ট করলো।
তোমার আর আমার দুজনেরই ভালবাসার পাত্র যখন একই লোক, তখন আমাদের মতো আপনজন আর কে আছে বল ভাই? তুমিও ওর মঙ্গল চাইবে, আমিও ওর মঙ্গল চাইবো, বিরোধ তবে আসবে কোনখান দিয়ে?
এই হচ্ছে মাধুরী-বৌয়ের জীবনদর্শন!
ষোল আনা অধিকারের দাবি নিয়ে রাজরাজেশ্বরী হয়ে এসে ঢুকেছিল সে, তবু বলেছিল, তোমার কাছে যে ভাই আমার অপরাধের শেষ নেই। সর্বদাই মনে হবে-বিনা দাবিতে জোর করে দখল করে বসে আছি আমি।
বকুল হেসেছিল।
বলেছিল, তোমার মতন এরকম ধর্মনিষ্ঠ মহামানবী সংসারে দুচারটে থাকলে–সংসার স্বৰ্গ হয়ে যেতো ভাই বৌঠকরুণ। নেই, তাই মর্ত্যভূমি হয়ে পড়ে আছে!
অবশ্য ঠিক সেই দিনই এত কথা হয়নি। সেদিন শুধু স্তব্ধতার পালা ছিল।
দিনে দিনে কথা উঠেছে জমে।
তুচ্ছতার গ্লানি, বঞ্চনার দাহ, সব দূর হয়ে গিয়ে মন উঠেছে অন্য এক অনুভূতিতে কানায় কানায় ভরে! আর সেই ভরা মনে নির্মল নামের মেরুদণ্ডহীন ছেলেটার উপর আর রাগবিরক্তি পুষে রাখতে পারেনি। খাড়া রাখতে পারেনি নিজের মধ্যেকার সেই ঔদাসীন্যের বোবা দেওয়ালটাকে, যেটাকে বকুল নির্মলের সামনে থেকে নিজেকে আড়াল করতে চেষ্টা করে গেঁথেছিল। পারেনি, বরং মগ্নতাই জমা হয়েছে তার জন্যে।
তবে সেদিন নয়।
যেদিন সেই মাধুরী-বৌয়ের হাতে হাত বেথে বন্ধুত্বের সংকল্প নিচ্ছিল, সেদিন দেওয়ালটাকে বরং বেশী মজবুত করার চেষ্টা করেছিল।
কাকীমা কোথায় যেন কোন কাজে ভেসে গিয়েছিলেন, একটু পরে নির্মল এসে দরজায় দাঁড়িয়েছিল। নিজে থেকে আসবার সাহস হত না নির্মলের, কারণ এ ঘরে তার দু-দুটা অপরাধের বোঝাঁ। অথবা দু-দুটো আতঙ্কের বস্তু। তাই ঘরে ঢুকতে ইতস্তত করছিল।
