বৌ চোখ তুলে তাকিয়েছিল।
দীর্ঘ পল্লবাচ্ছাদিত গভীর কালো দুটি চোখ।
নির্মলের বৌ খুব সুন্দরী হচ্ছে এ কথা আগে থেকেই শুনেছিল বকুল। বৌ আসার পর দেখে বুঝেও ছিল। ধন্যি-ধন্যিটাও কানে এসেছিল, তবু ঠিক ওই মুহূর্তটার আগে বুঝি অনুধাবন করতে পারেনি সেই সৌন্দর্যটি কী মোহময়! ওই গভীর চোখের ব্যঞ্জনাময় চাহনির মধ্যে যেন অনেক কিছু লুকানো ছিল, ছিল অনেকখানি হৃদয়। যে দিকটায় কথা এ পর্যন্ত আদৌ চিন্তা করেনি বকুল।
নির্মলের বৌ শব্দটাকে বকুল যেন অবজ্ঞা করার প্রতিজ্ঞা নিয়েই বসেছিল। চেতনে না হোক। অবচেতনে।
কিন্তু বৌ বকুলের দিকে ভালবাসার ভর্ৎসনায় ভরা দুটি চোখ তুলে ধরলো। বকুল প্ৰতিজ্ঞার জোরটা যেন হারাতে বসলো।
বৌ মাধুরী সেই চোখের দৃষ্টি স্থির রেখে বললো, আমি তো তোমায় তুমি করে বললাম ভাই, তুমি কেন আপনি করছো?
খুড়িমা ঘরে নেই, মুখোমুখি শুধু তারা দুজনে-বকুল লজ্জা ত্যাগ করলো। বললো, তা করবো না? বাবা! আমি হলাম তুচ্ছ একটা পাড়ার মেয়ে, আর আপনি হচ্ছেন একজন মান্যগণ্য মহিলা! এ বাড়ির বড় বৌ!
বকুলের কণ্ঠস্বরে কি ক্ষোভ ছিল?
অথবা তিক্ততা?
হয়তো ছিল।
কিন্তু বৌ তার পাল্ট জবাব দিল না। সে এ কথার উত্তরে হাত বাড়িয়ে বকুলের একটা হাত চেপে ধরে ভালবাসার গলায় বলে উঠলো, যতই চেষ্টা কর না কেন, তুমি আমায় দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে না ভাই। আমি জানি তুমি খুব কাছের মানুষ, খুব নিকটজন!
বকুল একটু অবাক হয়েছিল বৈকি।
এটা তো ঠিক জেঠিমার তালিম বলে মনে হচ্ছে না? তবে কী এটা?
বকুলের গলার স্বর থেকে বোধ করি তার অজ্ঞাতসারেই ক্ষোভ আর তিক্ততাটা ঝরে পড়ে গিয়েছিল। বকুল যেন ঈষৎ কৌতুকের গলায় বলেছিল, বেশনা হয় তুমিই বললাম, কিন্তু আমি খুব নিকটজন, এমন অদ্ভুত খবরটি তোমায় দিল কে?
মাধুরী-বৌ খুব মিষ্টি একটা হেসে বলেছিল, যে দেবার সে-ই দিয়েছে। সব কথাই বলেছে কাল আমায়।
মুহূর্তে আবার কঠিন হয়ে উঠেছিল বকুল রাগে, আপাদমন্তক জ্বলে গিয়েছিল তার।
ওঃ, ফুলশয্যার রাত্রেই বৌয়ের কাছে হৃদয় উজাড় করা হয়েছে! না জানি নিজের গা বাঁচিয়ে আর বকুলকে অপমানের সমুদ্রে ড়ুবিয়ে কতো কৌশলেই করা হয়েছে সেটি!
নির্মল এমন!
নির্মল এতো নীচ, অসার, ক্ষুদ্র! অথবা তা নয়, একেবারে নির্বোধ মুখ্যু!
ভেবেছে কানাঘুষোয় কিছু যদি শুনে ফেলে বৌ, আগে থেকে সাফাই হয়ে থাকি। সেটা যে হয় না, সে জ্ঞান পর্যন্ত নেই।
বকুল অতএব কঠিন হয়েছিল।
রুক্ষ গলায় বলেছিল, সব কথাই বলেছে? এক রাত্তিরেই এতো ভাব? তা কি কি বলেছে? আমি তোমার বরের প্রেমে হাবুড়ুবু খেয়ে মরে পড়ে আছি? তার জন্যে আমার জীবন ব্যর্থ পৃথিবী অর্থহীন? এই সব? তাই করুণা করছো?
বলেছিল।
আশ্চর্য! বকুলের মুখ থেকেও এমন কুশ্রী কথাগুলো বেরিয়েছিল সেদিন। বকুলের মাথার মধ্যে আগুন জ্বলে উঠেছিল যেন।
কিন্তু মাধুরী-বৌ এই রুক্ষতার, এই কটুক্তির উচিত জবাব দিল না। সে শুধু তার সেই বড় বড় চোখ দুটিতে গভীরতা ভরে উত্তর দিল, না, তা বলবে কেন? সে নিজেই ভালবাসায় মরে আছে, সেই কথাই বলেছে।
বা চমৎকার! বকুল কড়া গলায় হেসে উঠেছিল, সত্যসন্ধ যুধিষ্ঠির! তা যাক, তুমি সেই মরা মানুষটাকে বাঁচাবার প্রতিজ্ঞা নিয়েছ অবিশ্যি? অতএব নিশ্চিন্দি!
কথাগুলো কে বলেছিল?
বকুল, না বকুলের ঘাড়ে হঠাৎ ভর-করা কোনো ভূত? হয়তো তাই। নইলে জীবনে আর কবে বকুল অমন অসভ্য কথা বলেছে? তার আগে? তার পরে?
মাধুরী-বৌ তবুও শান্ত গলায় বলেছিল, আমি তো পাগল নই যে তেমন প্ৰতিজ্ঞা নেবো। তোমাকে ও কখনো ভুলতে পারবে না।
বৌয়ের মুখে এমন একটা নিশ্চিত প্রত্যয়ের আভা ছিল যে, তাকে ব্যঙ্গ করা যায় না।
বকুল অবাক হয়েছিল।
মেয়েটা কি?
অবোধ? না শিশু?
ন্যাকা ভাবপ্রবণ বরের ওই গদগদ স্বীকারোক্তি হজম করে এমন অমলিন মুখে আলোচনা করছে সেই প্রসঙ্গ? তবে কি সাংঘাতিক ধড়িবাজ? কথা ফেলে কথা আদায় করতে চায়? এই সরলতা সেই কথার রুই টেনে তোলবার চার?
ঠিক এই ভাষাভঙ্গীতে না হলেও, এই ভাবের কিছু একটা ভেবেছিল বকুল সেদিন প্রথমটায়।
কিন্তু তারপর বকুল সেই দেবীর মত মুখের দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখেছিল, তাকিয়ে দেখেছিল সেই দীর্ঘ পল্লবাচ্ছাদিত কালো কালো বড় বড় চোখের দিকে, আর দেখো যেন লজ্জায় মরে গিয়েছিল। বকুল বুঝেছিল, এ এক অন্য জাতের মেয়ে, সংসারের ধারণ মাপকাঠিতে মাপা যাবে না একে।
বকুলের ভিতর একটা বোবা দাহ বকুলকে ভয়ানক যন্ত্রণা দিচ্ছিল, বাইরে ভদ্রতা আর অহঙ্কার বজায় রাখতে রাখতে বকুল কষ্টে মরে যাচ্ছিল, কিন্তু মাধুরী-বৌয়ের ওই জ্বালাহীন ঈর্ষাহীন পবিত্র সরলতার ঐশ্বর্যের দিকে তাকিয়ে বকুল নিজের চিত্তদৈন্যে মরমে মরলো।
বকুলের সেই দাহটাও বুঝি কিছুটা স্নিগ্ধ হয়ে গেল। বকুল সহজ কৌতুকের গলায় বললো, তুমি তো আচ্ছা বোকা মেয়ে! তোমার বর এমন একখানা পরমা সুন্দরী বৌকে ঘরে এনে পাড়ার একটা কালো-কোলো মেয়েকে হৃদয়ে চিরস্মরণীয় করে দেবে, আর তুমি সে ঘটনা সহ্য করবে?
কালো-কোলো? বৌ একটু হাসে, তোমার খুব বিনয়!। তারপর হাসিমুখেই বলে, বাইরের রূপটাই তো সব নয়!
বকুলই এবার হাত বাড়িয়ে ওর হাতটা ধরে। যাকে বলে করপল্লব। যেমন কোমল তেমনি মসৃণ; নির্মলটা জিতেছে সন্দেহ নেই। এ মেয়েকে দেখে বকুলই মুগ্ধ হচ্ছে।
