ব্যাপারটা তখন খুলে বললেন নির্মলের বাবা।
নির্মলের মা বকুলের কাছে আবেদন জানিয়েছে, বকুল যেন তাঁর ছেলের বিয়েতে তাঁর নামে একটি প্রীতি উপহার লিখে দেয়।
বকুলের বাবার কপাল কুঁচকে গিয়ে আর সোজা হতে চায় না, কী লিখে দেবো?
প্রীতি উপহার, মানে আর কি পদ্য! বিয়েতে পদার্টদ্য ছাপায় না? সেই আর কি।
বকুলের বাবা ভুরু কুঁচকে বিস্ময়-বিরস কণ্ঠে বলেন, বকুল আবার পদ্য লিখতে শিখলো কবে?
নির্মলের বাবা বিগলিত হাস্যে বলেন, কবে। ছেলেবেলা থেকেই তো লেখে। কেন, ওর পদ্য তো ম্যাগাজিনে ছাপাও হয়েছে, দেখেননি। আপনি? লজ্জা করে দেখায়নি বোধ হয়। ওর ও–বাড়ির খুড়ি দেখেছে। বলে তো খুব ভালো। তা সেই জন্যেই একটি প্রীতি উপহারের অর্ডার দিতে আসা। ডাকুন একবার, নিজে মুখে বলে যাই।
ওষুধ-গেলা মুখে মেয়েকে ডেকে পাঠান প্ৰবোধচন্দ্ৰ। বলেন, তুমি নাকি পদ্য লেখো?
বকুল শঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকায়।
ও-বাড়ির কাকাই বা এ-বাড়িতে কেন, আর তার সামনে এ কথাই বা কেন?
তা কেন যে সেটা টের পেতে দেরি হল না। নির্মলের বাবা তড়বড় করে তার বক্তব্য পেশ করলেন।
বকুল নভেলের নায়িকা নয়, তবু বকুলের পায়ের তলার মাটি সরে যায়নি কি? বকুলের কি মনে হয়নি, কাকীমা কি সত্যিই অবোধ, না নিতান্তই নিষ্ঠুর? বকুলের সমন্ত সত্তা কি একবার বিদ্রোহী হয়ে উঠতে চায়নি এই নির্মম চক্রান্তের বিরুদ্ধে?
কেন? কেন? কেন তাকে যেতে হবে নির্মলের বিয়ে দেখতে? কেন তাকে নির্মলের বিয়ের পদ্য লিখতে হবে? উপন্যাসের নায়িকা না হলেও, একথা কি ভাবেনি বকুল? মানুষের এই নিষ্ঠুরতায় বকুল কি ফেটে পড়তে চায়নি?
হয়তো সবই হয়েছিল, তবু বকুল অস্ফুটে বললে, আচ্ছা।
আপনার বকুলের মত মেয়ে এ যুগে হয় না দাদা, নির্মলের বাবা হৃষ্টচিত্তে বলেন, ওর খুড়ি তো সুখ্যাতি করতে করতে-
বকুলের ইচ্ছে হল চেঁচিয়ে বলে ওঠে, আপনি থামবেন?
কিন্তু বকুলের শরীরের ভিতরটা থরথর করা ছাড়া আর কিছু হল না।
নির্মলের বাবা হৃষ্টচিত্তে চলে গেলেন আরো একবার সবাই মিলে নেমন্তন্ন খাবার জন্যে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানিয়ে। হয়তো ওই মানুষটা সত্যিই অজ্ঞ অবোধ। কারণ নির্মলের মা পারুলের প্রস্তাবের কথাটুকু ছাড়া আর কিছুই বলেননি তাঁকে। কী-ই বা বলবেন? বকুল আর নির্মলের ভালবাসার কথা? তাই কি বলা যায়?
চলে যাবার পর ফেটে পড়েছিলেন প্ৰবোধচন্দ্ৰ। বলেছিলেন, অমনি বলে দিলি আচ্ছা! লজ্জা করলো না তোর হারামজাদি?
বকুল বলেছিল, ওঁদের যদি চাইতে লজ্জা না করে থাকে, আমার কেন দিতে লজ্জা করবে বাবা?
এই সেদিন অত বড় অপমানটা করলো ওরা—
অপমান মনে করলেই অপমান–, বকুল সে-যুগের মেয়ে হলেও বাপের সঙ্গে খোলাখুলি কথা কয়েছিল, বিয়ের মত মেয়ে-ছেলে থাকলেই লোকে সম্বন্ধ করতে চেষ্টা করে, করলেই কি সব জায়গায় হয়? তা বলে সেটা না হলে তারা শত্রু হয়ে যাবে?
প্ৰবোধচন্দ্র এই রকম উন্মুক্ত কথায় থতমত খেয়ে বলেছিলেন, তুমি পারলেই হল! পারুলবালা তো অনেক রকম কথা বলে গেলেন কিনা–।
সেজদির কথা বাদ দিন। বলে সব কথায় পূর্ণচ্ছেদ টেনে দিয়েছিল বকুল।
হাঁ, তারপর স্নেহের সুনির্মলের শুভ বিবাহে স্নেহ উপহার লিখে দিয়েছিল বকুল নির্মলের মার নাম দিয়ে। সে পদ্য পড়ে ধন্যি ধন্যি করেছিল সবাই। নির্মলের মা বলেছিলেন, আমি তো তোকে কিছু বলে দিইনি। বাছা, তবু আমার মনের কথাগুলি সব কি করে বুঝে নিলি মা? কি করেই বা অমন মনের মত লিখলি?
বকুল শুধু হেসেছিল।
নির্মলের মার চোখ দিয়ে হঠাৎ জল পড়েছিল, তিনি অন্য দিকে চোথা ফিরিয়ে বলেছিলেন, ভগবানের কাছে তোর জন্যে প্রার্থনা করি মা, তোরা যেন রাজা বর হয়।
শুনে বকুল আর একটু হেসেছিল।
সেই হাসিটাকে স্মরণ করে অনামিকা দেবীও এতোদিন পরে একটু হাসলেন। নির্মলের মারা সেই আশীর্বাদটা স্রেফ অকেজো হয়ে পড়ে থেকেছে।
নির্মলের মা ছলছল চোখে আবারও বলেছিলেন, তোর জন্য ভগবান অনেক ভাল রেখেছেন, অনেক ভাল।
তা এ ভবিষ্যদ্বাণীটি হয়ত ভুল হয়নি তাঁর। বকুল হয়তো অনেক ভালোই পেয়েছে, অনেক ভালো-, ভাবলেন অনামিকা দেবী।
বকুল বৌ দেখতে তিনতলায় উঠে গিয়েছিল। বকুল আর সেদিন জেঠাইমার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিকে গ্রাহ্য করেনি। বকুল বৌ দেখেছিল, নেমন্তন্ন খেয়েছিল, মেয়েদের দিকে পরিবেশনও করেছিল। আবার পরদিন নির্মলের মার কাছে বসে বউয়ের মুখ-দেখানি গহনা টাকা জিনিসপত্রের হিসাব লিখে দিয়েছিল।
সেই সূত্রে অদ্ভুত একটা হৃদ্যতা হয়ে গেল নির্মলের বৌয়ের সঙ্গে। ব্যাপারটা অদ্ভুত বৈকি। এমন ঘটে না! তবু কিছু কিছু অদ্ভুত ঘটনাও ঘটে জগতে মাঝে মাঝে।
হিসেব মেলানোর কাজ হচ্ছিল, বৌ অদূরে ঘোমটা ঢাকা হয়ে বসে বসে ঘামছিল, শাশুড়ীর উপস্থিতিতে কোন কথা বলেনি। কি একটা কাজে তিনি উঠে যেতে, ঘোমটা নামিয়ে মৃদু অথচ পরিষ্কার গলায় বলে উঠলো, নেমন্তন্ন খেতে এসে এতো খাটছো কেন?
বকুল এ প্রশ্নের জন্যে প্রস্তুত ছিল না, তাই একটু চমকালো। ভাবলো–বৌ আমায় চিনলে কি করে? তারপর আবার ভাবলো, এ প্রশ্নের অর্থ কি? বড় জেঠির কাছে তালিম নিয়ে যুদ্ধে নামলো নাকি বকুলের সঙ্গে?
হ্যাঁ, এই ধরনের একটা সন্দেহ মুহূর্তে কঠিন করে তুলেছিল বকুলকে। বকুল তাই নিজেও যুদ্ধে নামতে চাইল। স্থির আর শক্ত গলায় বললো, আমার সঙ্গে যে শুধু নেমন্তন্ন খাওয়ারই সম্পর্ক এ কথা আপনাকে কে বললো?
