আমিও বেঁচে নেই পারুল-, হঠাৎ নির্মলের চোখ দিয়ে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়েছিল। কোঁচার কাপড় দিয়ে সেই জলটুকু মুছতে মুছতে চলে গিয়েছিল নির্মল, আমার মনের অবস্থা বোঝাবার ক্ষমতা তোমাদের কারুরই নেই পারুল।
পারুলের কি সেই দিকে তাকিয়ে মমতা হয়েছিল?
না।
পারুল বড় নির্মম!
পারুলের ঘৃণা হয়েছিল। পারুল বলেছিল, মাটির পুতুল।
কিন্তু বকুলের মনে ওই মাটির পুতুলটার জন্যে অনেকখানি মমতা ছিল। সুষমায় মোড়া সেই মমতাটুকু ৰকুলের কোনো একখানে রয়ে গেছে।
১১. পারুল বরের কাছে যাবার সময়
পারুল বরের কাছে যাবার সময় বলে গিয়েছিল, বুঝতে পারিনি, স্রেফ একটা মাটির পুতুলকে হৃদয় দান করে বসে আছিস তুই! না বুঝে তোর ভাল করতে গিয়ে শুধু ছোটই করলাম তোকে!
বকুল বলেছিল, ‘ছোট হলাম না’ ভাবলে আর কে ছোট করতে পারে সেজদি?
পারুল বললো, ওটা তত্ত্বকথা। ও দিয়ে শুধু মনকে চোখ ঠারা যায়। ভেবে দুঃখ হচ্ছে, এমন ছাই প্রেম করলি যে একটা মাটির গণেশকে তার জেঠির আঁচলতলা থেকে টেনে বার করে আনতে পারলি না!
বকুল বলেছিল, থাম সেজদি! বাবার মতই বলি, জিবনটা নাটক নভেল নয়!
কিন্তু কথাটা কি বকুল সত্যি প্ৰাণ থেকে বলেছিল? বকুলের সেই অপাত্রে দান করে বসা হৃদয়টা কি নাটক-নভেলের নায়িকাদের মতই বেদনায় নীল হয়ে যায়নি? যায়নি যন্ত্রণায় জর্জরিত হয়ে?
গভীর রাত্রিতে সারা বাড়ি যখন ঘুমিয়ে অভেতন হয়ে যেত, তখন বকুল জেগে জানলায় দাঁড়িয়ে দেখতে চেষ্টা করতো না কি ও-বাড়ির তিনতলার ঘরটায় এখনো আলো জ্বলছে, না অন্ধকার?
না, ওই আলো-অন্ধকারের মধ্যে কোনো লাভ-লোকসান ছিল না বকুলের, তবু বকুলের ওই আলোটা ভালো লাগতো। বকুলের ভাবতে ভালো লাগতো, ওই তিনতলার মানুষটাও ঘুমোতে পারছে না, ও জেগে জেগে বকুলের কথা ভাবছে। এ ভাবনাটা নভেলের নায়িকাদের মতই নয় কি?
এ ছাড়াও অনেক সব অবাস্তব কল্পনা করতো বকুল।
যেমন হঠাৎ একদিন বিনা অসুখে মারা গেল বকুল, বাড়িতে কান্নাকাটি শোরগোল। ওবাড়ি এই আকস্মিকতায় বিমূঢ় হয়ে নিষেধবাণী ভুলে ছুটে চলে এলো এ-বাড়িতে, এসে শুনলো ডাক্তার বলেছে মানসিক আঘাতে হার্ট দুর্বল হয়ে গিয়ে হার্তফেল করেছে–
সেই কথা শুনে মাটির পুতুলের মধ্যে উঠতো দুরন্ত প্ৰাণের চেতনা, শূন্যে মাথা ঠুকে ঠুকে ভাবতো সে, কী মূর্খ আমি, কী মূঢ়!
হ্যাঁ, বিনিদ্র রাত্রির দুর্বলতায় এই রকম এক-একটা নেহাৎ কাঁচা লেখকের লেখা গল্পের মত গল্প রচনা করতো বকুল, কিন্তু বেশী দিন নয়, খুব তাড়াতাড়ির মধ্যেই ও-বাড়িতে অনেক আলো জ্বললো একদিন-ওই তিনতলার ঘরটায় সারারাত্রি ধরে অনেক আলো ঝলসালো, সেই আলোয় আত্মস্থ হয়ে গেল বকুল।
আর —আর ওই কাঁচা গল্পগুলো দেখে নিজেরই দারুণ হাসি পেলো তার। ভাবলো ভাগ্যিস মনে মনে লেখা গল্পের খবর কেউ জানতে পারে না!
কিন্তু বকুল কি ওই আলোটা শুধু নিজের ঘরে বসেই দেখলো? বকুল ওই আলোর নদীতে একবার ঘট ডোবাতে গেল না? তা তাও গেল বৈকি! বকুল তো নাটক-নভেলের নায়িকা নয়!
নির্মলের বাবা নিজে এসেছিলেন লাল চিঠি হাতে করে। সনির্বন্ধ অনুরোধ জানালেন বকুলের বাবার কাছে, আমার এই প্রথম কাজ দাদা, সবাইকে যেতে হবে, দাঁড়িয়ে থেকে তদ্বির করে কাজটি সম্পন্ন করতে হবে। না না, শরীর খারাপ বলে এড়াতে চাইলে চলবে না। কোনো ওজর-আপত্তি শুনবো না। বৌমাদের ডেকে আমার হয়ে বলুন, ও-বাড়ির কাকা বলে যাচ্ছেন, গায়েহলুদের দিন আর বৌভাতের দিন, এই দুটি দিন এ বাড়িতে উনুন জ্বলবে না। ছেলেপুলে সবাই ও-বাড়িতেই চা-জলখাবার, খাওয়াদাওয়া–
বকুলের বাবা বলেছিলেন, যাবে যাবে, ছেলেরা বৌমারা যাবে।
শুধু ছেলেরা বৌমারা নয় দাদা, নির্মলের বাবা নিৰ্বেদ সহকারে বলেছিলেন, নাতিনাতনী সবাইকে নিয়ে আপনাকেও যেতে হবে। আর নির্মলের মা বিশেষ করে বলে দিয়েছেন। বকুল যেন নিশ্চয় যায়। তার ওপর তিনি অনেক কাজের ভরসা রাখেন।
হয়তো বকুলের যাওয়া সম্পর্কে ওঁদের একটা সন্দেহ ছিল, তাই এভাবে বিশেষ করে বলেছিলেন বকুলকে।
বকুলের বাবা প্ৰবোধবাবু এই সময় তাঁর বাতের ব্যথা ভুলে সোজা হয়ে বসে বলেছিলেন, বৌমাকে বোলো ভাই, বকুলের কথা আমি বলতে পারছি না, বয়স্থ কুমারী মেয়ে, বুঝতেই পারছে পাঁচজনের সামনে একটা লজ্জা,–
তা বকুলদের আমলে বান্তবিকই ওতে লজ্জা ছিল। বয়স্থা কুমায়ী মেয়েকে চোরের অধিক লুকিয়ে থাকতে হত। প্ৰবোধবাবু বাহুল্য কিছু বলেননি। কিন্তু নির্মলের বাবা সেটা উড়িয়ে দিলেন। হয়তো মেয়েটাকে তাঁরা বিশেষ একটু স্নেহদৃষ্টিতে দেখতেন বলেই মমতার বশে সঙ্গেকার সম্পর্কটা সহজ করে নিতে চাইলেন। বললেন, এ তো একই বাড়ি দাদা, বাড়িতে বিয়ে হলে কী করতো বলুন!
বকুলের বাবা অনিচ্ছের গলায় বললেন, আচ্ছা বলবো।
নির্মলের বাবা বললেন, তাছাড়া ওর খুড়ির আর একটি আবদার আছে, সেটিও বলে যাবো। ওর খুড়ি কাজকর্মে বেরতে পারছে না, পরে আসবে, তবে সময় থাকতে বলে রাখতে বলেছে। ডাকুন না একবার বকুলকে। অনেকদিন দেখাটেখা হয়নি, নইলে আরো আগেই বলতেন। তা ছাড়া-বিয়েটা তো হঠাৎ ঠিক হয়ে গেল!
বকুলের বাবা এতো আত্মীয়তাতেও খুব বেশী বিগলিত হলেন না, প্ৰায় অনমনীয় গলায় বললেন, বাড়ির মধ্যে কাজকর্মে আছে বোধ হয়, ব্যাপারটা কী?
