হয়তো সমাজের চাকা আজ এমন উল্টো গতিতে ঘোরার কারণই ভই কান না দেওয়া। যাঁরা ক্ষমতার আসনে বসেছেন, গদির অধিকার পেয়েছেন, তারা এই অস্ফুট ধ্বনির দিকে কান দেওয়ার প্রয়োজন বিবেচনা করেননি। তারা আপন অধিকারের সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকেননি, অস্ফুটকে দাবিয়ে রেখে শাসনকাৰ্য চালিয়ে যাওয়ার নীতি বলবৎ রেখেছেন, আজ আর তাই সেই অস্ফুটের ভূমিকা কোথাও নেই। আজ সর্বত্র প্রচণ্ড কল্লোল। সেই কল্পোলে, সেই তরঙ্গে ভেসে গেছে উপরওলাদের গদি, ভেসে গেছে তাঁদের শাসনদণ্ড। নির্বাক অসহায় দৃষ্টি মেলে সেই কল্লোলের দিকে তাকিয়ে আছেন এখন উপরওলারা। হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধারের আশা আর নেই। শুধু যে কেবলমাত্র গুরুজন, এই পদমর্যাদায় যা খুশি করা আর চলবে না তাই নয়, যারা এসে বসলো গদিতে, সেই লঘুজনদের কাছে মৌন হয়ে থাকতে হবে। ইতিহাসের শিক্ষা হয়তো এই নিয়মেই চলে। কিন্তু নির্মলের মায়ের দল নিহত হলো মধ্যবতী যুদ্ধে।
অতএব তখন তার ক্ষমতায় ওই দিদি ডাকটুকু ছাড়া আর কিছু কুলোতো না। আর এখন-নাঃ, এখনের কথা থাক।
তখন দিদি সেদিকে তাকালেন না।
দিদি বললেন, দুধ চড়িয়ে আসোনি তো ছোটবৌ?
ছোটবৌ মাথা নাড়লেন।
ছোটবৌ পারুলের দিকে তাকাতে পারছিলেন না বলে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
পারুল বললে, আমারই ভুল হয়েছিল জেঠাইমা, এভাবে বললে আপনি খেয়াল করতে পারবেন না সেটা খেয়াল করতে পারিনি। স্পষ্ট করেই বলি-নির্মলদার সঙ্গে বকুলের বিয়ের কথা বলতেই আমার আসা। অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে বকুল। নির্মলদাও তো কাজকর্ম করছে——
জেঠাইমা পারুলকে সব কথাগুলো বলে নেবার সময় দিয়েছিলেন। তারপর সবটা শোনার পর মুখে একটি কুটিল হাসি ফুটিয়ে বলেছিলেন, আমার বিশ্বাস ছিল তোমার একটু বুদ্ধিসুদ্ধি আছে, তা দেখছি সে বিশ্বাস ভুল। সাহেব বরের ঘর করে মেমসাহেব বনে গিয়েছ। নির্মলের সঙ্গে বকুলের বিয়ে? পাগল ছাড়া এ প্রস্তাব আর কেউ করবে না পারু!
কিন্তু কেন বলুন তো? পারুল শেষ চেষ্টাটা করেছিল, হেসে বলেছিল, আপনাদের ওই রাঢ়ী-বারেন্দ্ৰ গাইগোত্র? ওসব আর আজকাল ততো মানে না।
জেঠাইমা সংক্ষেপে বলেছিলেন, আমরা আজকালের নই পারু।
নির্মলের মা এই সময় একটা কথা বলে ফেলেছিলেন। অস্ফুটেই বলেছিলেন অবশ্য, পারুর বাবাদের ঘর তো আমাদের উঁচু দিদি!
জেঠাইমা ছোট জায়ের দিকে একটি কঠোর ভর্তসনার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলেছিলেন, তুমি থাম ছোটবৌ! উঁচু -নীচুর কথা নয়, কথাটা রীতিনীতির। যাকগে, অলীক কথা নিয়ে বৃথা গালগল্প করবার সময় আমাদের নেই পারু। তাছাড়া তোমার ওই ধিঙ্গী অবতার বোনটি স্বঘরের হলেও আমি ঘরের বৌ করতাম না বাছা, তা বলে রাখছি। একটা পরপুরুষ বেটাছেলের সঙ্গে যখন তখন ফুসফুস গুজগুজ, তাকে আকর্ষণ করার চেষ্টা, এসব মেয়েকে আমরা ভাল বলি না।
পারুলের মুখটা যে টকটকে লাল হয়ে উঠেছে, সেটা পারুল নিজে নিজেই অনুভব করেছিল, এবং আর একটি কথাও যে বলবার ক্ষমতা ছিল না তার তখন তাও বুঝেছিল। পারুল নিঃশব্দে উঠে এসেছিল।
তবু বেচারা পারুল তার একান্ত মোহপাত্রটির জন্যে আরও কষ্ট করেছিল। গলির মোড়ে নির্মলকে ধরেছিল। বলেছিল, তোমার সঙ্গে কথা আছে নির্মলদা!
নির্মল খতমত নেয় বললে, কী কথা?
পথে দাঁড়িয়ে হবে না সে-কথা, এসো একবার।
আচ্ছা আগে দেখ, আমাদের জানলায় কেউ আছে কিনা?
পারুল নিষ্পলকে ওর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেছিল, থাকলে কী হয়?
ওই দৃষ্টিতে বোধ করি অপ্রতিভ হয়েছিল নির্মল। বলেছিল, না, হবে আর কি! তবে জেঠিমাকে তো জানো। দেখতে পেলেই এখুনি জিজ্ঞেস করতে বসবেন, কেন, কী বৃত্তান্ত, ওখানে কী কাজ তোর?
পারুলের মুখে একটু হাসি ছড়িয়ে পড়েছিল। পারুল আস্তে আস্তে বলেছিল, থাক, আর কোন কথা নেই তোমার সঙ্গে। কথা আমার হয়ে গেছে।
নির্মল কোঁচার খুঁটে মুখ মুছতে মুছতে অবাক গলায় বলেছিল, কথা হয়ে গেছে? কোন কথা?
পারুল একটু বিচিত্ৰ হাসি হেসে বলেছিল, তুমিও দেখছি তোমার জেঠাইমার মত। বিশদ করে না বললে একটুও বুঝতে পারো না। যাক-তাই বলি-বলছিলাম, বাঁড়ির অমতে বিয়ে করবার সাহস আছে তোমার? অথবা বাড়ির অমতকে স্বমতে আনবার শক্তি?
নির্মল মাথা নীচু করেছিল।
নির্মল অকারণেই আধার কপালের ঘাম মুছেছিল। তারপর অস্ফুট বলেছিল, তা কী করে হয়?
হয় না, না?
নির্মল আবেগরুদ্ধ গলায় বলে উঠেছিল, শুধু মা-বাবা হলে হয়তো আটকাতো না পারুল, কিন্তু জেঠাইমা–? ওঃ, ওঁকে রাজী করানো অসম্ভব?
তা অসম্ভবই যখন, তখন আর বলবাঁর কি আছে? পারুল হেসে উঠে বলেছিল, যাও, আর তোমায় আটকাবো না। জেঠাইমা হয়তো তোমার দুধ গরম করে নিয়ে বসে আছেন!
নির্মলের মুখটাও লাল হয়ে উঠেছিল।
আর বড় বেশী ফর্সা রং বলে খুব বেশী প্রকট হয়ে উঠেছিল।
নির্মল বলেছিল, তুমি আমায় ঠাট্টা করছ পারুল, কিন্তু ওদের অবাধ্য হব, এ আমি কল্পনাও করতে পারি না।
ওঁদৈর বলছে কেন? তোমার মা-বাবার তো অমত নেই!
তাতে কোন ফল নেই পারুল। জেঠাইমার ওপর কথা কইবার ক্ষমতা কারুর নেই।
ওরে বাবা, তাহলে তো আমারও কোনো কথাই নেই।–, পারুল হঠাৎ খুব কৌতুকের গলায় হেসে উঠেছিল।
বলেছিল, কিন্তু একটা বড় ভুল করে ফেলেছিলে ভাই, জেঠাইমার কাছে অনুমতি না নিয়ে পাড়ার মেয়ের সঙ্গে প্ৰেম-ট্রেম করা ঠিক হয়নি। তাহলে সে মেয়েটা মরতো না।
